জবাবে খিজরুল হায়াত বললেন, আপনি কি ভুলে গেছেন যে, আমীরে মেসের সৈন্যদের মাঝে গনীমত বন্টন করার প্রথা বিলুপ্ত করে দিয়েছেন? তার এ ফয়সালা অতি প্রশংসনীয়। যেসব সৈন্য গনীমতের লোভে যুদ্ধ করে, তাদের কোন আদর্শ এবং দেশপ্রেম থাকে না।
বিষয়টি নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে মোসলেহুদ্দীন বলেই ফেললেন যে, আমীরে মেসের শামী ও তুর্কী সৈন্যদের সাথে যতটুকু সদ্ব্যবহার দেখান, মিসরীয়দের সাথে ততটুকু দেখান না। উত্তেজিত কণ্ঠে তিনি আরো আপত্তিকর কিছু কথা বলেন। জবাবে খিজির বললেন, মোসলেহুদ্দীন! আমি অনুভব করছি, তোমার কণ্ঠে ক্রুসেডার ও ফাতেমী কথা বলছে। মোসলেহুদ্দীনের উত্তেজনা আরো বেড়ে যায় এবং সে অবস্থায়ই বৈঠক মুলতবী হয়ে যায়।
খিজরুল হায়াতের নায়েব জানায়, বৈঠকের পর মোসলেহুদ্দীন খিজরুল হায়াতের দফতরে আসেন। সেখানেও দুজনের মধ্যে চটাচটি-বাকবিতণ্ডা হয়। মোসলেহুদ্দীন খিজরুল হায়াতের একথার উপর সম্মতি নিতে চেষ্টা করছিল যে, মিসরী বাহিনী আইউবীর প্রতি সন্তুষ্ট নয়। তিনি বৈঠকে বলা কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করেন। খিজরুল হায়াত বললেন, বিষয়টা যদি এমনই হয়, তা হলে তোমার পক্ষ থেকে আমি সমস্যাটা আমীরে মেসেরের নিকট লিখে পাঠাব। তবে আমি এ কথাটা অবশ্যই লিখব যে, তুমি বৈঠকে সভাসদদের বুঝাবার চেষ্টা করেছ যে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী সৈন্যদের মধ্যে বৈষম্যমূলক আচরণ করছেন। আমি আরো লিখব, তুমি আমাদের মনে এ বিশ্বাস জন্মাবারও চেষ্টা করেছ যে, সুলতান অইউবী শোবকের সব গনীমত শামী,ও তুর্কীদের মধ্যে বন্টন করে দিয়ে মিসরীয়দের বঞ্চিত করেছেন। পত্রে আমি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে এ কথাও অবহিত করব যে, তুমি তোমার অভিযোগগুলোর পক্ষে মত দেয়ার জন্য আমাদের উপর চাপ সৃষ্টি করেছ এবং সৈন্যদের প্রচারিত গুজব সম্পর্কে বলেছ, এসব গুজব নয় বাস্তব সত্য।
খিজরুল হায়াতের নায়েব আরো জানায়, মোসলেহুদ্দীন যখন খিজিরের কক্ষ থেকে বের হন, তখন তাকে এ কথাও বলতে শোনা গিয়েছিল যে, ঠিক আছে, যদি জীবনে বেঁচে থাকতে পার, তাহলে এসব লিখে সুলতানকে পত্র দিও।
গিয়াস বিলবিস তৎক্ষণাৎ মোসলেহুদ্দীনকে কিছু জিজ্ঞাসা করা সমীচীন মনে করলেন না। তার কারণ, প্রথমত পদমর্যাদায় তিনি তার বড়। দ্বিতীয়ত এর পক্ষে তিনি আরো তথ্য সংগ্রহ করতে চান। তিনি আশংকা করছিলেন, সুস্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া যদি মোসলেহুদ্দীনের প্রতি হাত বাড়ান, তবে উল্টো তিনি নিজেই বিপদে পড়তে পারেন। সুলতান আইউবী যদি কায়রো উপস্থিত থাকতেন, তাহলে বিলবিস তার পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করতে পারতেন। বিলবিস বুঝতে পেরেছিলেন যে, এ হত্যাকাণ্ড ব্যক্তি আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ নয়। এর পিছনে রয়েছে জাতিবিধ্বংসী সুদূরপ্রসারী ষড়ষন্ত্র। যা হোক, রাতে তিনি আরো কয়েকজনের দরজায় করাঘাত করেন। কিন্তু আর কোন তথ্য পেলেন না।
পরবর্তী সাক্ষ্য-প্রমাণে যা পাওয়া গিয়েছিল, তার সারমর্ম হল, হত্যাকাণ্ডের পরের রাত মোসলেহুদ্দীন যখন ঘরে ফিরেন, তখন তার প্রথমা স্ত্রী তাকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে যায়। স্ত্রী বিশটি স্বর্ণমুদ্রা মোসলেহুদ্দীনের সামনে রেখে বলল, খিজরুল হায়াতের ঘাতক এই মুদ্রাগুলো ফেরত দিয়েছে এবং বলে গেছে, তোমার সাথে নাকি তার পঞ্চাশ আশরাফী এবং দুটুকরো সোনার চুক্তি ছিল। সে তার দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু তুমি তাকে দিয়েছ মাত্র বিশ আশরাফী। তার ভাষায় তুমি তাকে ধোঁকা দিয়েছ! এখন সে তোমার থেকে একশত আশরাফী এবং দুটুকরো সোনা আদায় করে ছাড়বে। দুদিনের মধ্যে না পৌঁছুলে খিজরুল হায়াতের ন্যায় তোমারও একই পরিণতি ঘটবে বলে সে হুমকি দিয়ে গেছে।
শোনামাত্র মোসলেহুদ্দীনের মুখমন্ডল বিবর্ণ হয়ে যায়। বিস্ফারিত নয়নে খানিক নীরব থেকে নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি বললেন, এসব তুমি কি বলছ? কার কথা বলছ? কই আমি তো খিজরুল হায়াতকে হত্যা করার বিনিময়ে কাউকে অর্থ দেইনি!
না, তুমিই খিজরুল হায়াতের ঘাতক। জানি না, কেন তুমি তাকে হত্যা করেছ। আমি এতটুকু জানি, তার হত্যাকারী তুমিই। বলল স্ত্রী।
মোসলেহুদ্দীনের প্রথমা স্ত্রী। নাম ফাতেমা। বয়স বড়জোর ত্রিশ বছর। অতিশয় রূপসী। মাস কয়েক হল মোসলেহুদ্দীনের ঘরে আগমন ঘটেছে আরেক অপরূপ এক সুন্দরী যুবতীর। সে যুগে একাধিক স্ত্রী রাখা ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। এক স্ত্রী অপর স্ত্রীকে হিংসা করত না। কিন্তু মোসলেহুদ্দীন দ্বিতীয় স্ত্রীকে ঘরে এনে প্রথমা স্ত্রীর কথা একেবারেই ভুলে যান। নতুন স্ত্রীর আগমনের পর ফাতেমার কক্ষে যাওয়া ছেড়েই দেন মোসলেহুদ্দীন। মহিলা বেশ কবার ডেকেও পাঠিয়েছিল তাকে। কিন্তু তিনি যাননি একবারও। ফলে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে প্রথমা স্ত্রী। এই যে লোকটি আশরাফীগুলো ফেরত দিয়ে গেল, বোধ হয় মোসলেহুদ্দীন থেকে বড় রকমের প্রতিশোধ নিতে চায় সে। তাই লোকটি মোসলেহুদ্দীনের ক্ষুদ্ধ স্ত্রীকে জানিয়ে দিল যে, মোসলেহুদ্দীনই খিজরুল হায়াতকে খুন করিয়েছে।
এ ব্যাপারে তুমি কোন কথা বলতে পারবে না। এটি আমার কোন দুশমনের ষড়যন্ত্র হবে নিশ্চয়। আমার ও তোমার মাঝে শত্রুতা সৃষ্টি করতে চাচ্ছে কেউ। কঠোর ভাষার বলল মোসলেহুদ্দীন।
