আশা করি কাজটা দ্রুত হয়ে যাবে। শুনেছি, হাশীশীরা খুব সাহসী। জীবন হাতে নিয়ে তারা একজনকে খুন করতে পারে। এ যাবত তারা কিছুই করে দেখায়নি। আমি এও জানি যে, আইউবীর রক্ষীদের মধ্যে তিনজন হাশীশী আছে। আইউবীর রক্ষী বাহিনীতে ঢুকে যাওয়া তাদের কম যোগ্যতা নয়। তারা কারা কেউ জানে না। কিন্তু তারা আইউবীকে হত্যা করবে কবে? বেটারা ভয় পাচ্ছে মনে হয়। কথা বলতে বলতে সামনের দিকে হেঁটে যায় প্রহরীদ্বয়।
***
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর অবর্তমানে মিসরে বিরোধী পক্ষের গোপন অপতৎপরতা এত বেড়ে গিয়েছিল যে, তা সামাল দেয়া কেবল কোন অলৌকিক শক্তির পক্ষেই সম্ভব ছিল। এই অপতৎপরতার নেপথ্যে ছিল খৃস্টানরা আর বাস্তবায়ন করেছে সেইসব মুসলিম শাসকবর্গ, যারা ছিল সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর একান্ত বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য। খৃস্টানরা বেশকিছু ইহুদী ললনা হাত করে নিয়েছিল, যারা অবলীলায় আরবী-মিসরী ভাষা বলতে পারত এবং যখন যেমন প্রয়োজন তেমন রূপ ধারণ করতে পারত। মিসরের প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারা জাতীয় চেতনা ও মর্যাদাবোধ হারিয়ে ফেলেছিল। ফাতেমীরা তাদেরকে তাদের ক্রীড়নকে পরিণত করে এবং হাসান বিন সাব্বাহর হাশীশীদের সহযোগিতায় দেশে অরাজকতা বিস্তারে মেতে উঠে।
সে যুগের ঐতিহাসিকগণ যাদের মধ্যে আসাদুল আসাদী, ইবনুল আছীর, আবুল ফাররা ও ইবনুল জাওযী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য- লিখেছেন, সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে খৃস্টানরা সুদানীদেরকে মিসর আক্রমণের জন্য প্রস্তুত করেছিল। মিসরে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর যে অল্প কজন সৈন্য অবশিষ্ট ছিল, তারাও বিদ্রোহ করার জন্য তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সালাহুদ্দীন আইউবীর সমর্থকরা চরম উৎকণ্ঠায় পড়ে যায় যে, সুলতান যদি সময় থাকতে এসে না পৌঁছেন, তাহলে মিসর হাতছাড়া হয়ে যাবে নিশ্চিত।
উল্লিখিত ঐতিহাসিকদের অপ্রকাশিত পান্ডুলিপিতে একটি ঘটনার উল্লেখ এভাবে পাওয়া যায় যে, খিজরুল হায়াত নামক এক ব্যক্তি ছিল সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর অর্থমন্ত্রী। তিনি আইউবীর অতি বিশ্বস্ত ও বড় সৎলোক ছিলেন।
একদিনের ঘটনা। খিজরুল হায়াত রাতে বাড়ি ফিরলেন। অন্ধকার রাত। ঘরে প্রবেশ করবেন বলে। এমনি সময়ে রাতের আঁধার ভেদ করে একটি তীর ছুটে আসে তার দিকে। তীরটি তার পিঠ ভেদ করে হৃদপিন্ডে আঘাত হানে। চীৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। চীৎকার শুনে ঘরের লোকেরা ছুটে আসে। দৌড়ে আসে চাকর-বাকররা। পিঠে তীরবিদ্ধ খিজির উপুড় হয়ে পড়ে আছেন মাটিতে। হৃদয়বিদারক এক দৃশ্যের অবতারণা হল। শোকের ছায়া নেমে এলো বাড়িময়।
হঠাৎ একজন দেখতে পেল, খিজরুল হায়াতের ডান হাতের শাহাদাত আঙ্গুলি মাটির উপর রাখা। মাটিতে কি যেন লিখেছেন তিনি। তিনি মৃত। কি লিখেছেন? দেখার জন্য কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে আসে অনেকে। একটি মাত্র শব্দ মোসলেহ। আরবী শব্দ মোসলেহ এর হা বর্ণটিও পুরোপুরি লিখতে পারেননি। ঘাতকের তীর তার প্রাণ ছিনিয়ে নিয়ে গেছে তার আগেই।
লাশ তুলে নেয়া হল। সংরক্ষণ করে রাখা হল খিজরুল হায়াতের মৃত্যুর পূর্বক্ষণে লেখা শব্দটি। ব্যাপক অর্থ লুকিয়ে আছে এই একটি শব্দের মধ্যে। কোতোয়াল গিয়াসকে ডেকে পাঠানো হল। গিয়াস বিলবিস একাধারে কোতোয়াল ও পুলিশ বিভাগের প্রধান। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বিশ্বস্ত আমলা। আলী বিন সুফিয়ানের ন্যায় অভিজ্ঞ গুপ্তচর।
সংবাদ পেয়ে ছুটে এলেন গিয়াস বিলবিস। গভীর দৃষ্টিতে দেখলেন লেখাটি। এমন সময়ে খিজরুল হায়াতের মৃত্যুসংবাদ শুনে এসে উপস্থিত হন নগর প্রশাসক মোসলেহুদ্দীন। তাকে দেখেই পা দ্বারা লেখাটি মুছে ফেললেন গিয়াস বিলবিস। নগর প্রশাসক হওয়ার সুবাদে কোতোয়ালি বিভাগ ছিল তারই অধীনে। তিনি বিলবিসকে আদেশের সুরে বললেন, আগামীকালের সূর্যোদয়ের আগেই আমি ঘাতকের সন্ধান পেতে চাই। এর বেশী এক মুহূর্ত সময়ও আমি দিতে পারবো না। ঘাতককে শীঘ্রই গ্রেফতার করা হবে বলে নিশ্চয়তা দেন গিয়াস বিলবিস। স্থান ত্যাগ করে চলে যান তিনি।
রাতেই বৈঠকে বসেন বিলবিস। খিজরুল হায়াতের নায়েব-সহযোগী ও ঘনিষ্ঠজনদের সাথে কথা বলেন তিনি। জানতে চান, হত্যার দিনে সারাদিন খিজরুল হায়াত কি কি কাজে ব্যস্ত ছিল। তারা জানায়, গতকাল নগর প্রশাসনের উচ্চপদস্ত কর্মকর্তাদের মিটিং বসেছিল। সেনাবাহিনীর কোন প্রতিনিধি তাতে উপস্থিত ছিল না। খিজরুল হায়াতের নায়েব খিজিরের সহযোগিতার জন্য বৈঠকে উপস্থিত ছিল। বৈঠকে সামরিক খাতের ব্যয় প্রসঙ্গে আলোচনা উঠে। খিজির বলল, মিসরের সাধারণ ব্যয়ের পরিমাণ আরো হ্রাস করতে হবে, সামরিক খাতের বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী শোবকে বহু নতুন সৈন্য ভর্তি করেছেন। তাদের জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন।
নগর প্রশাসক মোসলেহুদ্দীন তার এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন এবং বলেন, সামরিক ব্যয় সম্পূর্ণ নিষ্প্রয়োজন। নতুন সৈন্য ভর্তি না করে আমাদের প্রয়োজন সেই সৈন্যদের সমস্যার সমাধান করা, যারা পূর্ব থেকেই দেশের বোঝা হয়ে আছে। তিনি আরো বলেন, মিসরের সৈন্যরা অশান্ত হয়ে উঠেছে। শোবক থেকে যে গনীমত হাতে এসেছিল, এখানকার সৈন্যদেরকে তার ভাগ দেয়া হয়নি।
