***
শোবক ও কার্ক দুর্গ থেকে বেশ দূরের বিস্তীর্ণ একটি ভূখণ্ড। মাটি ও বালির পর্বত এবং উঁচু-নীচু টিলাবেষ্টিত এই ভূখণ্ডটি অন্তত দেড় মাইল দীর্ঘ, দেড় মাইল চওড়া। ভূখণ্ডটির বিপুল এলাকা বালুকাময় মরুপ্রান্তর। কোথাও ছোট-বড় অনেক গর্ত, কোথাওবা পাথরখণ্ড ছড়ানো।
খৃস্টান শাসকবর্গ ও সেনা কমান্ডারগণ যে সময়ে বসে বসে ইসলামের মূলোৎপাটনের পরিকল্পনা আঁটছিল এবং অতি ভয়াবহ পন্থা-পদ্ধতি ঠিক করছিল, সে সময়ে মরুভূমির এ ভূখণ্ডে চলছিল যুদ্ধের মহড়া। হাজার হাজার পদাতিক সৈন্য, ঘোড়সওয়ার ও উটসওয়ার দৌঁড়াদৌঁড়ি-ছুটাছুটি করছিল। চকমক করছিল তরবারী ও বর্শা। উট-ঘোড়ার ছুটাছুটিতে কালো মেঘের ন্যায় আকাশ ছেয়ে গিয়েছিল মরুদ্যানের ধুলোবালিতে। অশ্বগতিকে হার মানাবার বাসনায় তীরবেগে দৌড়াবার চেষ্টা করছে পদাতিক বাহিনী। খানা-খন্দক ও গর্ত লাফিয়ে পার হচ্ছে অশ্বারোহীরা। পার্শ্ববর্তী পর্বতচূড়ায় শান্ত মনে ঘোরাফেরা করছে দুজন সৈনিক। এক পাহাড়ের পাদদেশ থেকে জ্বলন্ত অগ্নিশিখা ছুটে এসে আরেক পাহাড়ের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে নিভে যাচ্ছে। হৈ চৈ-কলরোলে কেঁপে উঠেছে আকাশ।
উঁচু এক টিলার উপর ঘোড়ার পিঠে বসে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী গভীর মনোযোগ সহকারে অবলোকন করছেন এ দৃশ্য। দীর্ঘক্ষণ ধরে এ মাঠের আশপাশের পাহাড়-পর্বতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। সঙ্গে তাঁর দুজন নায়েব।
যেরূপ দ্রুতগতিতে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে, তাতে আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, নতুন সৈনিকরা অল্প কদিনের মধ্যেই অভিজ্ঞ সৈনিকরূপে গড়ে উঠবে। যে অশ্বরোহীদের আপনি এত চওড়া গর্ত লাফিয়ে অতিক্রম করতে দেখলেন, তারা সকলেই কার্ক থেকে আগত নওজোয়ান। আমি তাদেরকে আনাড়ী ভেবেছিলাম। তীরন্দাজদের মানও দিন দিন উন্নত হচ্ছে। বলল এক নায়েব।
শুধু অস্ত্র চালনা আর সুস্থ-সবল দেহ দিয়ে অভিজ্ঞ সৈনিক হওয়া যায় না। অভিজ্ঞ সৈনিক হতে হলে বুদ্ধি-বিচক্ষণতা এবং আদর্শিক চেতনাও অনিবার্য। আমার এমন সৈনিকের প্রয়োজন নেই, যারা এলোপাতাড়ি দুশমনের উপর আঘাত হানবে আর শুধুই ধ্বংস করবে। প্রয়োজন আমার এমন সৈনিকের, যাদের জানা থাকবে যে, তাদের শত্রু কে এবং তাদের লক্ষ্য কি। আমার সৈনিকদের জানা থাকতে হবে যে, তারা আল্লাহর বাহিনী এবং তারা আল্লাহর পথে লড়াই করছে। যে জোশ ও চেতনা আমি প্রত্যক্ষ করছি, তা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু লক্ষ্য যদি স্পষ্ট না হয়, নিজেদের অবস্থান-মর্যাদা যদি পরিস্কার না হয়, তাহলে এই জোশ যে কোন মুহূর্তে ঠাণ্ডা হয়ে যেতে পারে। তাদের মন-মগজে এ কথাটা বদ্ধমূল করে দাও যে, ফিলিস্তীন আমাদের কেন উদ্ধার করতে হবে। তাদের জানিয়ে দাও, গাদ্দারী, কত বড় অপরাধ। তাদের বুঝাও যে, তোমরা শুধু ফিলিস্তীনের জন্যই নয়- বরং ইসলামের সুরক্ষা ও বিস্তারের জন্য লড়াই করছ। তোমরা যুদ্ধ করছ ভবিষ্যত প্রজন্মের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য। সমর প্রশিক্ষণের পর তাদের ওয়াজ কর, স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দাও তাদের জাতীয় মর্যাদার প্রকৃত স্বরূপ। বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।
প্রতি সন্ধ্যায় তাদেরকে নসীহত করা হয় মহামান্য সালারে আজম! আমরা তাদেরকে আদর্শ বিবর্জিত শুধু হায়েনা বানাচ্ছি না। বলল এক নায়েব।
তাদের হৃদয়ে জাতির সেই কন্যাদের কথাও স্মরণ করিয়ে দাও, যারা কাফেরদের হাতে অপহৃত ও অপমানিত হয়েছে ও হচ্ছে। তাদের স্মরণ করিয়ে দাও সেই কুরআনের কথা, যা খৃস্টানদের পায়ের তলায় দলিত হয়েছে। তাদের স্মরণ করিয়ে দাও আল্লাহর ঘর মসজিদের কথা, যাকে আল্লাহর দুশমনরা পরিণত করেছে ঘোড়ার আস্তাবলে। মনে রেখো, নারীর ইজ্জত আর মসজিদের সম্মান মুসলমানদের জাতীয় মর্যাদার প্রতীক। আমাদের সৈনিকদের জানিয়ে দাও, যেদিন তোমরা নারীর সম্ভ্রম আর মসজিদের সম্মানের কথা ভুলে যাবে, সেদিন মনে করবে পৃথিবীটা তোমাদের জন্য জাহান্নামে পরিণত হয়ে গেছে। আর আখেরাতের শাস্তি কত ভয়াবহ হবে, তা তোমরা কল্পনাও করতে পারবে না। বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।
.
পাহাড়ের উপর দুচারজন করে যে সৈনিক ঘোরাফেরা করছিল, ওরা প্রহরী। খৃস্টানদের জবাবী হামলার আশংকা আছে। তাই এই প্রহরার আয়োজন।
পাহাড়ের চূড়ায় আরোহন করছিল তাদের দুপ্রহরী। হঠাৎ তারা দাঁড়িয়ে যায়। তারা দেখতে পায় নীচে একখণ্ড পাথরের উপর দাঁড়িয়ে সালাহুদ্দীন আইউবী। তাঁর পিঠটা তাদের দিকে। দূরত্ব দুআড়াইশ গজ মাত্র। এক প্রহরী বলল, বেটার পিঠটা ষোলআনা আমাদের সামনে। এখান থেকে তীর ছুঁড়ে বেটার হৃদপিণ্ড পার করিয়ে দিতে পারি। তুমি কি বলো?
তারপর পালাবে কোথায়? জিজ্ঞেস করে অপরজন।
তা ঠিক, এরা যদি আমাদের ধরে নিয়ে মেরে ফেলতো, তাহলে তো ল্যাঠা চুকে যেতো। কিন্তু তাতো করবে না। ধরতে পারলে পিঞ্জিরায় আবদ্ধ করে এমন শাস্তি দেবে যে, আমরা আমাদের সাথীদের নাম বলে দিতে বাধ্য হবো। বলল প্রথমজন।
এ কাজটা তারই রক্ষীদের জন্য ছেড়ে দাও। সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করা যদি এতই সহজ হত, তাহলে এখনো তিনি জীবিত থাকতেন না। বলল একজন।
কাজটা এখন হয়ে যাওয়া প্রয়োজন। শুনেছি, ফাতেমীরা বলাবলি করছে, তোমরা আমাদের থেকে দেদারছে অর্থ নিচ্ছ আর কাজ করছ না কিছুই। বলল দ্বিতীয়জন।
