বক্তব্য শেষ হয় না হরমুনের
কিন্তু একজন সৈনিককে গাদ্দার বানানো অতটা সহজ নয়, যতটা সহজ একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে দলে ভেড়ানো। প্রশাসনের সব কর্মকর্তাই ক্ষমতালিন্দু। সকলেরই চেষ্টা, কি করে মন্ত্রী-গবর্নর হওয়া যায়। মুসলমানদের ইতিহাস দেখুন। দেখতে পাবেন, তাদের রাসূলের পর সব শাসকই ক্ষমতার লড়াইয়ে লিপ্ত। কিন্তু তাদের খলীফারা যখনই দেখলেন যে, অমুক সেনাপতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে ফেলল, রাজ্যজয়ের বদৌলতে জাতি তাকে খলীফা অপেক্ষা বেশী মর্যাদা দিতে শুরু করল, তখন খলীফা ও তার সাঙ্গরা সেই সেনাপতিকে ভুল নিদের্শনা দিয়ে অপদস্ত করেছে। এই ক্ষমতালিন্দু মুসলিম শাসকদের জাতি-ধর্ম বিধ্বংসী আচরণের ফলেই আমরা আজ আরব রাজ্যে পা রাখতে পেরেছি। সালাহুদ্দীন আইউবী সেইসব সেনানায়কদেরই একজন, যারা সালতানাতকে সেই সীমান্তরেখা পর্যন্ত নিয়ে যেতে চান, যে পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল প্রথম যুগের সেনানায়করা। এই লোকটির বিশেষ একটি গুণ হল, ইনি প্রশাসন ও খেলাফতের তোয়াক্কা করেন না। যখনই ইনি মিসরের খেলাফতকে নিজের চলার পথের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে দেখলেন, সাথে সাথে খলীফাকেই ক্ষমতাচ্যুত করে দিলেন। নিজের সামরিক শক্তি ও বিচক্ষণতার কারণেই ইনি এমন সাহসী পদক্ষেপ হাতে নিতে পেরেছেন।
হরমুন বলে যাচ্ছেন আর গভীর মনোযোগ সহকারে শুনছে খৃস্টান কমান্ডার। হরমুন বলছিলেন- সালাহুদ্দীন আইউবী তার জাতির এই দুর্বলতাটা বুঝে ফেলেছেন যে, অসামরিক নেতৃত্ব ক্ষমতালোভী। আর এটি এমনি এক লোভ, যা মানুষের মধ্যে সম্পদের মোহ ও মদ-নারীর নেশার জন্ম দেয়। আমি শুধু সেই সেনা অফিসারদেরই হাত করতে পেরেছি, যাদের মধ্যে ক্ষমতার লোভ আছে। এ কারণে আমরা বেশী প্রভাব ফেলছি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উপর। সামরিক বাহিনীকে দুর্বল করার পন্থা হল, জনমনে তাদেরকে হেয়প্রতিপন্ন করতে হবে। এটি আমার দায়িত্ব, যা আমি পালন করে যাচ্ছি। আপনি হয়ত বা আমার সাথে একমত হবেন না, তবু আমি আপনাকে অবহিত করতে চাই যে, সালাহুদ্দীন আইউবীকে সহজে আপনি যুদ্ধের ময়দানে পরাজিত করতে পারবেন না। আইউবী শুধু লড়াই করার জন্য লড়ে না। তার প্রত্যয়ভিত্তি এমন এক পরিকল্পনার উপর প্রতিষ্ঠিত, যা তার সকল সৈনিকের কাছে স্পষ্ট। তার একটি মৌলিক গুণ হল, তিনি তার খলীফা কিংবা অসামরিক নেতৃত্বে থেকে নির্দেশ নেন না। তিনি একজন কট্টর মুসলমান। তিনি বলেন, আমি নির্দেশ গ্রহণ করি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল থেকে। আমার যেসব গুপ্তচর বাগদাদে অবস্থান করছে, তারা আমায় তথ্য দিয়েছে যে, আইউবী নূরুদ্দীন জঙ্গীর যোগসাজশে এখান থেকে বৈপ্লবিক কর্মসূচী প্রেরণ করেছেন, যার বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে। তার একটি হল, আমীরুল ওলামা থেকে ফতুয়া নিয়ে প্রচার করা হয়েছে যে, খেলাফত হবে মাত্র একটি আর তা হবে বাগদাদের খেলাফত। এই খেলাফত অন্য দেশ সম্পর্কে কোন নির্দেশ জারি করতে হলে আগে সামরিক কর্মকর্তাদের অনুমোদন নিতে হবে। যুদ্ধ বিগ্রহের ব্যাপারে সামরিক কর্মকর্তাদের ছাড়া অন্য কারো হাত থাকবে না। দূরদূরান্ত অঞ্চলে লড়াইরত সেনাপতিদের কাছে খলীফার কোন নির্দেশ পাঠাতে পারবেন না। তৃতীয়তঃ খোতবায় খলীফার নাম উল্লেখ করা যাবে না। তাছাড়া খেলাফতের প্রভাব নিঃশেষ করার জন্য আইউবী নির্দেশ জারী করেছেন যে, খলীফা, খলীফার নায়েব বা অন্য কেউ পরিদর্শন-পর্যবেক্ষণ কিংবা অন্য কোন উদ্দেশ্যে যখন বাইরে বের হবেন, তখন জনগণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না, স্লোগান দিতে পারবে না, এমনকি সালাম পর্যন্ত করতে পারবে না।
সালাহুদ্দীন আইউবী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি করেছেন, তাহল, তিনি শিয়া-সুন্নী বিভেদ মিটিয়ে দিয়েছেন। তিনি শিয়াদেরকে প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে সুন্নীদের সমান মর্যাদা প্রদান করেছেন এবং অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে শিয়া পণ্ডিতদের সম্মতি আদায় করে নিয়েছেন যে, তারা ইসলামের পরিপন্থী আচার-অনুষ্ঠান বর্জন করে চলবে। সালাহুদ্দীন আইউবীর এমন পদক্ষেপ আমাদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এখন আমাদের উচিত মুসলমানদের প্রশাসনকে সালাহুদ্দীন আইউবী ও তার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা। অবশ্য এ মিশনের উপর কাজ চলছেও বটে।
আমাদের শত্রুতা সালাহুদ্দীন আইউবীর সাথে নয়- আমাদের শত্রু ইসলাম। আমাদের যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে। আমাদের চেষ্টা করা দরকার, আইউবীর মৃত্যুর পর এ জাতি যেন আর কোন আইউবী জন্ম দিতে না পারে। এ জাতিটাকে ভুল ও ভিত্তিহীন বিশ্বাসের অস্ত্র দ্বারা শেষ করে দাও। তাদের মধ্যে ক্ষমতার মোহ ও রাজা হওয়ার উন্মাদনা সৃষ্টি করে বিলাসী বানাও এবং এমন রীতির প্রবর্তন কর, যাতে এরা মসনদের নেশায় পরস্পর খুনাখুনীতে লিপ্ত থাকে। তারপর এই খেলাফতকে তাদের সেনাবাহিনীর ঘাড়ে সাওয়ার করে দাও। আমি নিশ্চিত বলতে পারি, এরা একদিন না একদিন ক্রুশের গোলামে পরিণত হবে। এদের সভ্যতা-সংস্কৃতি, এদের দ্বীন-ধর্ম ক্রুশের রঙে রঙিন হবে। এরা রাজত্ব ও খেলাফত লাভ করার জন্য পরস্পর সংঘাতে লিপ্ত হয়ে পড়বে এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ প্রতিপক্ষকে দমন করার জন্য আমাদের শরণাপন্ন হবে। এখন এখানে আমরা যারা উপস্থিত আছি, সে সময়ে হয়তো কেউ জীবিত থাকব না। আমাদের আত্মা দেখবে, আমি যে ভবিষ্যদ্বাণী করলাম, তা অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ইসলামকে নির্মূল করার জন্য ইহুদীরা তোমাদেরকে তাদের মেয়েদের উপহার দিচ্ছে। এদেরকে তোমরা কাজে লাগাও। ইহুদীদেরকে তোমরা শুধু এজন্য শত্রু মনে কর যে, তারা জেরুজালেমকে তাদের পবিত্র ভূমি এবং ফিলিস্তীনকে তাদের আবাস মনে করে। তাদের বলে দাও যে, হ্যাঁ, ফিলিস্তীন তোমাদেরই। এ ভূখণ্ডটি আমরা তোমাদেরই দিয়ে দেব। এখন আমাদের সঙ্গ দাও, সহযোগিতা কর। তবে সাবধান! ইহুদীরা কিন্তু অতি চতুর জাতি। তোমাদের পক্ষ থেকে কোন আশংকা দেখা দিলে তখন কিন্তু তারা মোড় ঘুরিয়ে দাঁড়াবে, তোমাদের বিপক্ষে চলে যাবে। তাদের সম্পদ ও মেয়েদের ব্যবহার কর, বিনিময়ে তাদেরকে ফিলিস্তীনের মুলো দেখাও।
