মুসলমানদের সাথে যখন যে আচরণ করা হচ্ছে, সবই যথারীতি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর কানে পৌঁছে যাচ্ছে। আপনারা আইউবীকে দ্রুত কার্ক আক্রমণে বাধ্য করছেন। আপনারা হয়তো ভুলে গেছেন যে, এক্ষুণি কোন আক্রমণ হলে আমাদের সৈন্যরা সে হামলার সামনে দাঁড়াবার শক্তি রাখে না। বললেন গোয়েন্দা প্রধান হরমুন।
তার সমাধান, এই নয় যে, আমরা এখানকার মুসলমানদেরকে মাথায় তুলে নাচবো। আপনারা এখনো মুসলমান বন্দীদের খাইয়ে-পরিয়ে পুষছেন। ওদেরকে হত্যা করে ফেলছেন না কেন? ঝাঝালো কণ্ঠে বললেন ফিলিপ অগাস্টাস।
করছি না, তার কারণ আইউবী আমাদের বন্দীদের হত্যা করে ফেলবে। আমাদের হাতে মুসলমান বন্দীর সংখ্যা সর্বমোট ৩৬১ জন। আর মুসলমানদের হাতে আমাদের বন্দীর সংখ্যা ১২৭৫ জন। জবাব দেন গাই অফ লুজিনান।
একজন মুসলমান খুন করার জন্য কি আমরা চারজন খৃস্টানের জীবন বিসর্জন দিতে পারি না? আমাদের যারা এখন সালাহুদ্দীনের হাতে বন্দী, তারা কাপুরুষ। যুদ্ধের পরিবর্তে বন্দীত্ববরণ করে নিয়েছে ওরা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওরা যুদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিল না বলেই শক্রর হাতে ধরা পড়েছে। ওরা মুসলমানদের হাতে মরে গেলেই বরং ভাল। তোমরা নিশ্চিন্তে মুসলমান বন্দীদের হত্যা করে ফেল। বললেন অগাস্টাস।
মুসলমান বন্দীদের সাথে পশুর ন্যায় আচরণ করে এবং মুসলিম বন্দী সৈনিকদের হত্যা করে কি তুমি সালাহুদ্দীন আইউবীকে পরাজিত করতে পারবে? এ মুহূর্তে আমাদের সামনে বড় সমস্যা হল, আইউবী যদি তার অগ্রাভিযান অব্যাহত রাখেন, তাহলে আমরা কিভাবে তাকে প্রতিহত করব এবং কিভাবে তার থেকে শোবক দুর্গ পুনরুদ্ধার করব? আচ্ছা, আমরা যদি কার্কের সব মুসলমানকে হত্যা করে ফেলি, তাহলে কি হবে? আইউবীর ন্যায় তোমরা সেনাসংখ্যা বৃদ্ধি করছে না কেন? হরমুন কী বলতে পারবে, মিসরে তার গোপন তৎপরতার অগ্রগতি কেমন? সাফল্য কতটুকু? বলল সেনাপতি গোছের এক খৃস্টান।
আশার চেয়েও অধিক। আলী বিন সুফিয়ান এখন সালাহুদ্দীন আইউবীর সাথে শোবকে অবস্থান করছেন। কায়রোতে তার অনুপস্থিতি থেকে আমি প্রচুর ফায়দা হাসিল করেছি। কায়রোর নায়েবে নাজেম মুসলেহুদ্দীনকে ফাতেমীরা দলে ভিড়িয়ে নিয়েছে। মুসলেহুদ্দীন আইউবীর একান্ত বিশ্বস্ত। কিন্তু এখন সে আমাদের অফাদার। ফাতেমীরা তলে তলে একজন খলীফা ঠিক করে রেখেছে। তিনি কায়রোর ভেতর থেকে বিদ্রোহ এবং সুদানীদের আক্রমণের অপেক্ষা করছেন। আমাদের সেনা অফিসার সুদানে সুদানীদের জন্য সৈন্য প্রস্তুত করছে। কায়রোতে সালাহুদ্দীন আইউবী যে ফৌজ রেখে এসেছেন, তার দুজন নায়েব সালার এখন আমাদের হাতের পুতুল। ওদিক থেকে সুদানীরা হামলা চালাবে। কায়রোতে বিদ্রোহ হবে এবং ফাতেমীরা তাদের খেলাফত ঘোষণা করবে। জবাব দেন গোয়েন্দা প্রধান হরমুন।
তোমরা বোধ হয় ভুলে গেছ যে, সালাহুদ্দীন আইউবী এতই চতুর ও বিচক্ষণ লোক যে, প্রয়োজনবোধে কার্ক আক্রমণ মুলতবী রেখে হঠাৎ করে তিনি কায়রো চলে যাবেন। আমাদের উচিত, জ্বালাতন করে করে তাকে শোবকেই অবস্থান করতে বাধ্য করা। তার জন্য আমরা একটি কাজ এই করতে পারি যে, আমরা তার পথ আগলে রাখব এবং তার একজন সৈন্যকেও কায়রো যেতে দেব না। রেমন্ড বললেন।
আমার শতভাগ আশা, কায়রোতে এখন আইউবীর যেসব সৈন্য আছে, তারা আর তার কোন কাজে আসবে না। আমার লোকেরা আইউবীর সেনাবাহিনীতে এ সংশয়, ঢুকিয়ে দিয়েছে যে, কায়রোতে রেখে গিয়ে সুলতান তাদেরকে গনীমত থেকে বঞ্চিত করেছেন এবং শোবকে হাজার হাজার খৃস্টান যুবতী তার হাতে এসে গেছে, যাদেরকে তিনি সেনাদের মাঝে বন্টন করে দিয়েছেন। আমার বড় সফলতা এই যে, আমি মুসলমান সেনা কর্মকর্তাদেরই মুখে সাধারণ সৈন্যদের মধ্যে এই গুজব ছড়িয়ে দিয়েছি। আমি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছি যে, কায়রোর সকল ফৌজী সুদানীদের সঙ্গ দেবে এবং সালাহুদ্দীন আইউবী বিদ্রোহ দমন করার জন্য শোবক থেকে তার সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হবেন। কিন্তু এরা যখন গিয়ে কায়রো পৌঁছুবে, ততক্ষণে কায়রোতে ফাতেমী খেলাফতের পতাকা উডডীন হয়ে যাবে এবং সুদানী বাহিনী দেশের ক্ষমতা হাতে নিয়ে ফেলবে। আক্রমণ করে সালাহুদ্দীন আইউবীকে শোবকে আটকে রাখা আমাদের নিষ্প্রয়োজন। মুসলমানদেরই হাতে আমরা তাকে শেষ করে দেব। বললেন খৃস্টান গোয়েন্দা প্রধান হরমুন।
হরমুন আরো বললেন- আপনি মুসলমানদের মতিগতি এখনো বুঝে উঠতে পারেননি। সে কারণেই আপনি আমার অনেক কার্যকর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দিচ্ছেন। মুসলমান যদি সৈনিক হয় আর প্রশিক্ষণের সময় যদি তার মাথায় একথা ঢুকিয়ে দেয়া হয় যে, তুমি দেশ ও জাতির মোহাফেজ, তাহলে সে দেশ-জাতির স্বার্থে নিজের জীবন কুরবান করতে কুণ্ঠিত হয় না। আপনি পৃথিবীর রাজত্ব তাদের পায়ের উপর রেখে দেখুন, তারা একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে কাজ করাই বেশী পছন্দ করবে। প্রকৃত মুসলমান জাতির সাথে গাদ্দারী করে না। তবে সেই মুসলমানদেরই মাঝে যদি যৌনতা, মদ, নারী আর ক্ষমতার লিঙ্গ সৃষ্টি করে দেয়া যায়, তাহলে তারা নিজেদের দ্বীন-ধর্মকে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলতেও এতটুকু ভাববে না। আমি যেসব মুসলমান শাসককে দলে ভিড়িয়েছি, তাদের মধ্যে ঐ দুর্বলতাগুলো সৃষ্টি করেছি এবং করে চলেছি।
