সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী এরূপ কয়েকটি জাতির নাম উচ্চারণ করে বললেন, ওরা ছিল সম্প্রসারণবাদী। ওদের স্বপ্ন হিল, কিভাবে সমগ্র পৃথিবীকে নিজেদের করতলে নিয়ে আসবে, কিভাবে সরা জগতের সমুদয় সম্পদের অধিকারী হবে। ওরা বিজাতীয় নারীদের সম্ভ্রমে হাত দিয়েছে আর বিজাতীয়দের দ্বারা ওদের বোন-কন্যাদের সম্ভ্রমহানী ঘটিয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহ ওদের নাম-চিহ্ন মুছে দিয়েছেন।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী আরো বললেন, আমরা আক্রমণ পরিকল্পনায় ব্যস্ত। আর দুশমনও আক্রমণোদ্যত। পার্থক্য হল, খৃস্টানরা দূরদেশ থেকে এসেছে আমাদের জাতি-ধর্ম ও কৃষ্টি-কালচারকে নিশ্চিহ্ন করতে। এসেছে আমাদের মুসলিম নারীদের গর্ভে খৃস্টান সন্তান জন্ম দিতে। আর আমরা তাদের প্রতিরোধ করছি মাত্র। কুফরের এই সয়লাবকে যদি আমরা প্রতিরোধ করতে না পারি, তাহলে প্রমাণিত হবে- আমরা অথর্ব, আমরা মুসলামান নই। পক্ষান্তরে যদি এমনটা হয় যে, আমরা দুশমনের অপেক্ষায় ঘরে বসে রইলাম, দুশমন আমাদের সীমানায় প্রবেশ করে আক্রমণ করল আর আমরা নিজ ঘরে বসে প্রতিরোধ করলাম আর মনে মনে ভাবলাম, আহ! আমরা ত্রুর মোকাবেলা করেছি; তাহলে বুঝতে হবে আমরা কাপুরুষ। দুশমনের প্রতিরোধের নিয়ম হল, দুশমন যদি তোমাকে আঘাত করার জন্য তরবারী কোষমুক্ত করতে উদ্যত হয়, তাহলে তোমার তরবারী ততক্ষণে তার মস্তক দ্বিখন্ডিত করে ফেলেছে। দুশমন তোমার উপর হামলা করার প্রস্তুতি নিয়েছে আগামীকাল, তো তুমি আজই তাকে চরম শিক্ষা দিয়ে দাও।
আমার মতে বর্তমান পরিস্থিতিতে সুলতান নূরুদ্দীন জঙ্গীর সাহায্য নিয়ে কার্ক আক্রমণ করা উচিত। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
এটাও হবে ক্ষতিকর। জঙ্গীর কাছে এত পরিমাণ সৈন্য থাকা প্রয়োজন যে, খৃস্টানরা যদি আমাদের উপর পেছন থেকে আক্রমণ করে বসে, তাহলে জঙ্গীও তাদের পেছন থেকে হামলা করতে সক্ষম হবেন। আমি সাহায্য চাওয়ার পক্ষপাতী নই। তার পরিবর্তে আমরা এ-ও করতে পারি যে, কার্কে কমান্ডো বাহিনী প্রেরণ করে খৃস্টানদের আরামের ঘুম হারাম করে দিই। আমার তো দৃঢ় বিশ্বাস আছে যে, আমাদের গুপ্তচররা বৃস্টান কমান্ডোদের শিকড় ইঁদুরের ন্যায় কেটে ফেলতে পারবে। কিন্তু তার পরিণতি ভোগ করতে হবে সেখানকার নিরপরাধ নিরীহ মুসলমানদের। গেরিলারা তো তাদের অভিযান পরিচালনা করে এদিক-ওদিক আত্মগোপন করে থাকবে। পরিণতিতে নির্যাতনের শিকার হবে আমাদের নিরস্ত্র বোন-কন্যাসহ নিরীহ মুসলমানরা। তবে সেখানকার মুসলিম পরিবারগুলোকে বের করে আনার কোন নিরাপদ পন্থা খুঁজে পাওয়া যায় কিনা ভেবে দেখতে পার। কার্ক আক্রমণে এখনো বেশ সময় নিতে হবে। সেনাসংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কার্কের অনেক যুবকও বেরিয়ে এসেছে এবং অনেকে এখনও আসছে। আক্রমণ চালাতে হবে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে।
আমি মনে করি, এখানকার মুসলমান নাগরিকদের ব্যাপারে আমাদের পলিসিতে পরিবর্তন আনা দরকার। বলল, খৃস্টানদের গোয়েন্দা প্রধান হরমুন। কার্ক দুর্গে খৃস্টানদের গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন চলছে। কয়েকজন খৃস্টান সম্রাট, সেনা কমান্ডার ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা বৈঠকে উপস্থিত। পরাজয়ের গ্লানির ছাপ সকলের চোখে-মুখে। প্রতিশোধের আগুনে জ্বলজ্বল করছে সকলের চোখ। শোবকের পরাজয়কে বিজয়ে পরিণত করতে চায় তারা দ্রুত। শুধু গোয়েন্দা প্রধান হরমুন-ই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি কথা বলছেন বুদ্ধিমত্তার সাথে ঠান্ডা মাথায়। কার্কের মুসলমানদের উপর তার খৃস্টান ভাইয়েরা কিরূপ অমানুষিক নির্যাতন চালাচ্ছে, তার চোখের উপর ভাসছে সব। গম্ভীর কণ্ঠে হরমুন বললেন- শোবকের মুসলমানদের সঙ্গেও আপনারা এরূপ আচরণ করেছিলেন। তার পরিণতি আমাদের জন্য কল্যাণকর হয়নি। আমাদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে তারা ক্যাম্প থেকে এমন এক ব্যক্তিকে পালাতে সাহায্য করেছিল, যাকে আমরা ভয়ংকর গুপ্তচর মনে করে আটক করেছিলাম। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ঐ লোকটিকে ওখানকার মুসলমানরাই আশ্রয় দিয়েছিল। লোকটি দুর্গের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য নিয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া সালাহুদ্দীন আইউবী আমাদের দুর্গের যে দেয়াল ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করেছিল, তাতে ভেতরের মুসলমানদেরও হাত ছিল। আমাদের আচরণে তারা এতই অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল যে, তারা জীবনবাজি রেখে মুসলমান সৈন্যদের সহযোগিতা করেছিল।
এ কারণেই তো আমরা কার্কের মুসলমানদের হাড়গোড় ভেঙ্গে দিচ্ছি, শক্তি-সাহস নিঃশেষ করে দিচ্ছি। বলল এক খৃস্টান সেনাপতি।
তা না করে যদি আপনারা তাদেরকে বন্ধুতে পরিণত করে নেন, তাহলে তারা আপনাদের সহযোগিতা করবে। আপনাদের অনুমতি পেলে আমি প্রেম-ভালবাসা দিয়ে ধর্ম, পরিবর্তন না করেও তাদেরকে ক্রুশের ভক্তে পরিণত করতে পারি, মুসলমানদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াতে পারি। বললেন গোয়েন্দা প্রধান হরমুন।
জান না হরমুন! তুমি হয়ত হাতেগোনা কয়েকজন মুসলমানকে লোভ দেখিয়ে গাদ্দারে পরিণত করতে পারবে। কিন্তু প্রত্যেক মুসলমানকে ইসলামী ফৌজের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে পারবে না। গোটা জাতি কখনো বিশ্বাসঘাতক হয় না। শোন হরমুন! ওদের উপর তুমি এত আস্থা রেখো না। আমরা মুসলমানদেরকে বন্ধু বানাতে চাই না। আমরা চাই মুসলমানদের বংশধারা নিঃশেষ করে দিতে। তুমি যখনই একজন অমুসলিমকে কোন মুসলমানের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে দেখবে, বুঝবে লোকটি ইসলামকে ভালোবাসে। অথচ আমাদের উদ্দেশ্য হল, ইসলামের মূলোৎপাটন। কার্ক, জেরুজালেম, আক্কা ও আদীসায় এবং যেখানেই আমাদের কর্তৃত্ব চলছে, সবখানে মুসলমানদের এত অস্থির করে তোল, যাতে তারা হয়তো মৃত্যুমুখে পতিত হয় নতুবা ক্রুশের সামনে মাথানত করতে বাধ্য হয়। বললেন সম্রাট রেমন্ড।
