সুলতান আইউবী কায়রোর ন্যায় শোবকের প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্যও তাঁর সেনাবাহিনীকে তিন ভাগে ভাগ করে নেন। এক ভাগ নিয়োজিত করেন সীমান্ত অঞ্চলে। এক ভাগ তাবু ফেলে সীমান্তে বাহিনীর পাঁচ-ছয় মাইল পিছনে। তৃতীয় ভাগকে রাখা হয় পেট্রোল ডিউটির জন্য।
যেসব খৃষ্টান সৈন্য জীবনে রক্ষা পেয়ে কার্কে এসে পৌঁছেছে, এক্ষুণি আবার অভিযান পরিচালনা করবে, এমন শক্তি তাদের নেই। যুদ্ধ করার শক্তি-সাহস সব হারিয়ে ফেলেছে তারা।
এদিকে সুলতান আইউবী সেনাভর্তির গতি আরো জোরদার করে দেন। মরুভূমির খোলা ময়দানে নয়া ভর্তি হওয়া সেনাদের প্রশিক্ষণের আয়োজন চলছে। কার্কে গুপ্তচর প্রেরণের জন্য তিনি আলীকে নির্দেশ দেন, যেন তারা খৃষ্টানদের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সেখানকার মুসলিম যুবকদেরকে কার্ক থেকে বেরিয়ে ময়দানে এসে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে।
২.৩ বিদ্রোহ
বিদ্রোহ
খৃস্টানদের পায়ের তলায় কাতরাচ্ছে ফিলিস্তীন। ক্রুশের মাথায় ঝুলছে জেরুজালেম। ফিকি দিয়ে রক্ত ঝরছে এই নগরীর পবিত্র দেহ থেকে। খৃস্টান হায়েনাদের লোমশ থাবায় পিষ্ট হচ্ছে এখানকার মুসলমানরা। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর অপেক্ষায় দিন গুণছে তারা। জেরুজালেমের নির্যাতিত মুসলমানরা সংবাদ পেয়ে গেছে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ফিলিস্তীনের ভূখণ্ডে ঢুকে পড়েছেন এবং শোবক দুর্গ এখন মুসলমানদের দখলে।
জেরুজালেমের মুসলমানদের জন্য এটি এক সুসংবাদ। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই এই সুসংবাদ পরিণত হয়ে যায় মৃত্যুর পরোয়ানায়। জেরুজালেম ও অন্যান্য নগর পল্লীর মুসলমানদের থেকে শোবকের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে শুরু করে খৃস্টানরা। বেশী অত্যাচার চলছে কার্কের মুসলমানদের উপর।
শোবকের পর কার্ক বিশাল এক দুর্গ। খৃস্টানদের অতি গর্বের ধন। শোবক নিয়েও ছিল তাদের এমনি গৌরব। কিন্তু সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর সূক্ষ্ম কৌশল ও তাঁর মুজাহিদদের বীরত্ব ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে তাদের সেই অহংকার।
কার্ককে আরো দুর্ভেদ্য- শক্ত করে তুলছে খৃস্টানরা। নির্যাতন চালিয়ে অথর্ব করে তুলছে মুসলমানদের। তাদের ধারণা, জেরুজালেমের মুসলমানরা গুপ্তচরবৃত্তি করছে। খৃস্টানদের গোপন তথ্য পৌঁছিয়ে দিচ্ছে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর কাছে। তাই শোবকের ন্যায় এখানেও তারা সন্দেহভাজন মুসলমানদের ধরে ধরে নিক্ষেপ করছে। বেগার ক্যাম্পে।
ফিলিস্তীন জয় করা আমাদের এক মহান লক্ষ্য। কিন্তু কার্ক থেকে মুসলমানদের বের করে আনা তদপেক্ষা মহত্তর লক্ষ্য হওয়া উচিত। গোয়েন্দা বিভাগের এক তুর্কী কর্মকর্তা সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে বলল একথা। নাম তার তলআত চেঙ্গীস। চেঙ্গীস ছয়জন গুপ্তচর নিয়ে শোবকের নির্যাতিত খৃস্টানের বেশে কার্কে প্রবেশ করেছিল। তিন মাস পর ফিরে এসে এখন আলী বিন সুফিয়ানের উপস্থিতিতে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট রিপোর্ট পেশ করছে।
যেসব খৃস্টান সৈন্য পালিয়ে কার্ক পৌঁছে গিয়েছিল, চেঙ্গীস জানায়, তাদের অবস্থা বড় শোচনীয়। সহসা যুদ্ধ করার শক্তি-সাহস তাদের নেই। এই পরাজিত খৃস্টান সৈন্যরা কার্ক পৌঁছামাত্র অত্যাচারের ঝড় নেমে আসে সেখানকার মুসলমানদের উপর। মুসলিম মহিলাদের ঘরের বাইরে বের হওয়ার সাধ্য নেই। সামান্যতম সন্দেহ সৃষ্টি হওয়ামাত্র তারা একজন মুসলমানকে অমনি নিক্ষেপ করছে বেগার ক্যাম্পে, যেখানে তাদের পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট জীবনযাপন করতে হয়। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাদের খাটতে হয় গাধার মত।
আমরা সেখানে গোপন তৎপরতা শুরু করেছি। সেখানকার যুবক মুসলমানদের বের করে আনার চেষ্টা করছি, যাতে শোবক এসে তারা সেনাবাহিনীতে ভর্তি হতে পারে। কারো সাহায্যের অপেক্ষা না করেই যাতে আমরা কার্ক আক্রমণ করতে পারি, আমি সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের সেখানে থাকা অবস্থাতেই বেশকিছু যুবক সেখান থেকে পালিয়ে এসেছে। কিন্তু কাজটি বড় দুরুহ। কারণ, খৃস্টান সৈন্যরা চারদিকে গিজ গিজ করছে। তাছাড়া আত্মীয়-স্বজন, বিশেষত মহিলাদেরকে খৃস্টানদের দয়ার উপর ফেলে আসতে পারে না। তাই কালক্ষেপণ না করে কার্ক আক্রমণ করে সেখান থেকে মুসলমানদের উদ্ধার করা প্রয়োজন। বলল চেঙ্গীস তুর্কী।
এর আগে অপর এক গুপ্তচর তথ্য দিয়েছিল যে, খৃস্টানদের বর্তমান পরিকল্পনা হল, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী কার্ক অবরোধ করলে তাদের একটি বাহিনী পেছন দিক থেকে আক্রমণ চালাবে। তবে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী আগেই তার সেনা কর্মকর্তাদের এরূপ একটি ধারণা দিয়ে রেখেছেন। এ পরিস্থিতির মোকাবেলার জন্য তার অতিরিক্ত সৈন্যের প্রয়োজন।
চেঙ্গীস তুর্কীকে বিদায় দিয়ে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী আলী বিন সুফিয়ানকে বললেন, আবেগের দাবী অনুসারে এই মুহূর্তে কার্ক আক্রমণ করাই উচিত। সেখানকার মুসলমানরা কোন্ জাহান্নামে পড়ে আছে, আমি তা ভাল করেই বুঝতে পারছি। কিন্তু বাস্তবতার দাবী হল, পূর্ণ প্রস্তুতি ব্যতীত এক পা-ও অগ্রসর হয়ো না। আঘাত হানো তখন, যখন তুমি নিশ্চিত হবে যে অভিযান ষোল আনা সফল হবে। যেসব নারী ও শিশু দুশমনের হাতে অপদস্ত, নিগৃহীত ও নিহত হচ্ছে, আমরা তাদের ভুলে থাকতে পারি না। তাদের-ই জীবন-সম্ভ্রমের খাতিরে আমি ফিলিস্তীন উদ্ধার করতে চাই। এই যদি আমার লক্ষ্য না হয়, তাহলে যুদ্ধের উদ্দেশ্য লুটতরাজ ছাড়া আর কিছু থাকে না। যে জাতি দুশমনের হাতে নিগৃহীত শিশু ও নারীদের কথা ভুলে থাকে, তারা দস্যু-ডাকাতদেরই দলভুক্ত হয়ে যায়। সে জাতির জনগণ দুশমন থেকে প্রতিশোধ নেয়ার পরিবর্তে একে অপরকে প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে, সে জাতির শাসকগোষ্ঠী জনগণকে শোষণ করে বিলাসিতায় দিন কাটায়। অবশেষে দুর্বলতার সুযোগে দুশমন যখন মাথার উপর এসে পড়ে, ফাঁকা স্লোগান তুলে জনগণকে বোকা ঠাওরায় আর তলে তলে দুশমনের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে।
