ক্ষীণ কণ্ঠে নিজের অবস্থার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয় আম্মাদের পিতা। কিন্তু আম্মাদ চলে যায় ষোল বছর পিছনে। চোখের সামনে ধরে আনে সে সময়কার পিতার চেহারা। সেকি নাদুস-নুদুস স্বাস্থ্যবান এক বলিষ্ঠ পুরুষ। আর এখন? তবু এই হাড্ডিসার কংকাল চেহারাও পিতাকে চিনতে পারে আম্মাদ।
আম্মাদ একবার ভাবে, নিজের পরিচয় দিয়ে বলি, আমি আপনার পালিয়ে যাওয়া সেই পুত্র আম্মাদ। আবার ভাবে- না এত বড় শুভ সংবাদের ধাক্কা তিনি হয়ত সামলাতে পারবেন না। পারলেও তিনি আমার কর্তব্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন। বড় কষ্টে নিজেকে সংযত রেখে পিতার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফিরে আসে সে।
বিশ্রামাগারে শুয়ে আছে আম্মাদ। আগামী দিন ভোর পর্যন্ত ছুটি আছে তার। তারপর চলে যেতে হবে ময়দানে। কিন্তু হঠাৎ কেন্দ্র থেকে নির্দেশ আসে, পরবর্তী আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত তাকে এখানেই থাকতে হবে। সর্বদা বিশ্রামাগারে উপস্থিত থাকতে হবে। বিস্মিত হয় আম্মাদ। ঘটনা কি? তার সঙ্গে কেন্দ্রীয় কমান্ডের এমন কি কাজ থাকতে পারে, বুঝতে পারছে না সে। আইওনার ব্যাপারে তদন্ত নেয়ার জন্য আলী বিন সুফিয়ান এ নির্দেশ পাঠিয়েছেন। মেয়েটির কাহিনী কতটুকু সত্য, তা যাচাই করে দেখতে চান আলী।
ক্যাম্পে যান আলী। আইওনার বলা নামের লোকটিকে খুঁজে বের করেন। প্রাথমিক কুশল বিনিময়ের পর ছেলে-মেয়ে আছে কিনা বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করেন তিনি। জবাবে বৃদ্ধ জানান।
দুটি ছেলে আর একটি মেয়ে ছিল। ষোল বছর আগে আমার এই ক্যাম্পে নিক্ষিপ্ত হওয়ার প্রাক্কালে খৃষ্টান দস্যুদের হাতে নিজ ঘরে মায়ের সঙ্গে খুন হয় বড় ছেলে। ছোট ছেলে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেয় পাশের এক বাড়িতে। এই ক্যাম্পে বসে শুনেছিলাম, ওকে নাকি পরে সিরিয়া পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। এখন বেঁচে আছে কিনা জানিনা। আর- আর মেয়েটিকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে বদমাশরা। মেয়ের কথা বলতে গিয়ে সংযম হারিয়ে ফেলেন বৃদ্ধ। কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে করুণ কণ্ঠে ভাঙ্গা গলায় বৃদ্ধ আবার বলেন, হায়! আমার সাত বছরের ফুটফুটে দুরন্ত মেয়েটিকে তুলে নিয়ে গেল ওরা! আহ! জানি না মেয়েটির আমার পরিণতি কি হয়েছে! অশ্রুতে ভিজে গেছে বৃদ্ধের দুচোখের পাতা। ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে তার কপোল বেয়ে।
.
মধ্যরাত। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায় আইওনা। ঘুম আসছে না তার। এ পর্যন্ত কেবল এপাশ-ওপাশ করে ছটফট করে কাটিয়েছে সে। আলী বিন সুফিয়ানের আচরণে আইওনা আন্দাজ করেছে যে, তাকে তারা এখনো বিশ্বাস করতে পারেনি। না জানি এখন পরিণতি কি ঘটে! আলীর মনে কিভাবে বিশ্বাস জন্মানো যায়, তা তাবছে আইওনা।
পাশাপাশি প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে তার মনে। আম্মাদের সঙ্গে নিজ বাড়িতে ঢুকে শৈশবের অনেক স্মৃতি-ই খুঁজে পেয়েছে সে। অপহরণের পর সীমাহীন আদর-যত্ন, আমোদ-আহ্লাদ আর উন্নত খাবার দিয়ে দেহে তার রূপের এই যে জোয়ার সৃষ্টি করা হয়েছিল, তারপর সেই জোয়ারে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল তার অতীত, তার পরিচয়, তার সতীত্ব-সম্ভ্রম। তাকে পরিণত করা হয়েছে পাপের এক কালিমূর্তিতে, স্মৃতিপটে সব ভেসে উঠে আইওনার। এর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য উথাল-পাথাল করছে তার মন। ত্বরা সইছে না এক মুহূর্তও। আবার পিতার সঙ্গে সাক্ষাত করার ইচ্ছাও তার প্রবলতর হচ্ছে ধীরে ধীরে।
কিন্তু কক্ষ থেকে বের হওয়ার পথ কি? বাইরে দুজন প্রহরী টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। কিছুই ভেবে পায়না আইওনা। কোন বুদ্ধি আসল না তার মাথায়।
গাত্রোত্থান করে উঠে দাঁড়ায় আইওনা। কক্ষের দরজাটা ঈষৎ ফাঁক করে উঁকি দেয় বাইরে। কারো কথা বলার শব্দ কানে আসে তার। ডান দিকে গজ বিশেক দূরে সান্ত্রী দুজনকে ছায়ার মত চোখে পড়ে। ওরাই ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। দরজার দুই কপাটের ফাঁক দিয়ে মাথা বের করে ওদের প্রতি তাকিয়ে থাকে আইওনা। কেন যেন আরো খানিকটা দূরে অন্ধকারে সরে যায় সান্ত্রীদ্বয়।
বেরিয়ে পড়ে আইওনা। পা টিপে টিপে অতি সাবধানে-সন্তর্পণে ভবনের আড়ালে প্রহরীদের দৃষ্টির বাইরে চলে যায় সে।
বেগার ক্যাম্পের অবস্থা আইওনার পূর্ব থেকেই জানা। এই ক্যাম্প যে এখন কারাগার নয়- অতিথিশালা, তাও তার অবিদিত নয়। কাজেই ক্যাম্পে গিয়ে সান্ত্রীর হাতে ধরা পড়ার আশংকা তার নেই।
দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে আইওনা। হঠাৎ পিছনে কারো পায়ের আওয়াজ শুনতে পায় সে। পিছনে ফিরে তাকায় মেয়েটি। কিন্তু দেখতে পায় না কিছুই। ভ্রম মনে করে আবার হাঁটা শুরু করে। পিছনে আবারো সেই পদশব্দ। কে যেন লম্বা পায়ে এগিয়ে আসছে তার দিকে।
কেউ আসছে কিনা পিছনে ফিরে তাকায় আইওনা। চলার গতি থামিয়ে এই পিছন পানে দৃষ্টি দিবে বলে, হঠাৎ তার মাথা ও মুখমন্ডলে এসে পড়ে একটি মোটা বস্ত্র। চোখের পলকে বস্ত্রটি জড়িয়ে ধরে আইওনাকে। দুটি শক্ত বাহু ঝাঁপটে ধরে তুলে নিয়ে যাচ্ছে তাকে।
কেঁপে উঠে আইওনা। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত সর্বাঙ্গ কাঁটা দিয়ে উঠে তার। ঝাঁপটা দিয়ে নিজেকে মুক্ত করে নেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় সে।
অন্ধকার রাত। জনমানবহীন অনাবাদী এলাকা। কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর একটি কম্বলে পেঁচিয়ে গাঠুরীর মত করে কাঁধে তুলে নেয়া হয় মেয়েটিকে। তারা ছিল দুজন।
