আঁধা ঘন্টা পর কাঁধ থেকে নামিয়ে পুটুলি থেকে বের করা হয় আইওনাকে। আইওনা নিজেকে একটি কক্ষে আবিষ্কার করে। টি টিম্ করে দুটি প্রদীপ জ্বলছে কক্ষে।
চারজন লোক তাকিয়ে আছে তার প্রতি। বিস্ময়াভিভূ নেত্রে এক এক করে সকলের প্রতি দৃষ্টিপাত করে আইওনা। বলে, তোমরা এখনো এখানে? একি, মিঃ জেরাল্ড আপনি? আপনিও এখানে?
আমরা গিয়ে আবার এসেছি তোমাকে বের করে নেয়ার জন্য। ভালো-ই হল যে, তোমাকে পেয়ে গেছি!
দুর্গ দখলের পর যেসব খৃষ্টান গোয়েন্দা মেয়ে মুসলমানদের হাতে ধরা পড়েছে, তাদেরকে বের করে নেয়ার জন্য এবং যারা শোবকে আত্মগোপন করে আছে, তাদের সংগঠিত করে সম্ভব হলে তাদের দ্বারা নাশকতামূলক কাজ করানোর উদ্দেশ্যে কার্ক। থেকে চল্লিশ সদস্যের একটি কমান্ডো বাহিনীকে শোবকে প্রেরণ করা হয়েছিল। এ চারজন সে বাহিনীর সদস্য।
আস্তাবলে ঢুকে ঘোড়ার খাদ্যে ও লঙ্গরখানায় মানুষের খাবারে বিষ মেশানো আর আগুন লাগানো এদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের প্রধান অংশ গ্রুপ কমান্ডার জেরাল্ড এ। কাজে বেশ পারদর্শী। আইওনা তার শিষ্য। গলায় গলায় ভাব ছিল দুজনের।
কিন্তু এখন? লোকটিকে দেখামাত্র প্রবল ঘৃণা ও প্রতিশোধ-স্পৃহায় মাথায় খুন চড়ে যায় আইওনার। কিন্তু তৎক্ষণাৎ সামলে নেয় সে নিজেকে। এটা ঘৃণার বহিঃপ্রকাশের জায়গা নয়। এখানে বসে প্রতিশোধ নেয়া যাবে না। কিন্তু আইওনা যে সম্পূর্ণ বদলে গেছে, জেরাল্ড তা জানবে কি করে?
কোথায় যাচ্ছিলে তুমি? আইওনাকে জিজ্ঞেস করে জেরাল্ড।
সুযোগ পেয়ে পালাতে চেয়েছিলাম। জবাব দেয় আইওনা।
মিঃ জেরাল্ড আইওনাকে জানায়, নির্যাতিত মুসলমানের ছদ্মবেশে চল্লিশজনের কমান্ডো গুপ্তচর নিয়ে আমি এখানে এসেছি। সেদিন শোবকের প্রধান ফটকে তেমন। কোন কড়াকড়ি ছিল না। যুদ্ধের কারণে মুসলিম সৈনিকরা হরদম যাওয়া-আসা। করছিল। আশপাশের পল্লী অঞ্চলের মুসলমানরাও দলে দলে শহরে প্রবেশ করছিল। এ সুযোগে আমরাও বিনা বাধায় ভিতরে ঢুকে পড়ি।
জেরাল্ড আইওনাকে আরও জানায়, যে বাড়িটিতে আমাদের গোয়েন্দা মেয়েরা বন্দী হয়ে আছে, দুদিন ধরে তার উপর আমরা সতর্ক দৃষ্টি রাখছি। প্রহরীদের গতিবিধির প্রতিও আমাদের বেশ কড়া নজর। সৌভাগ্যবশত আমরা তোমাকে পেয়ে গেলাম। অন্যদেরও বের করে আনা যায় কি করে বল। আইওনা বলে, ওদেরকে বের করে আনা দুরুহ হলেও অসম্ভব নয়। কৌশলে চেষ্টা করলে সফলতা আশা করা যায়।
রাতে-ই পরিকল্পনা প্রস্তুত হয়ে যায়। আইওনা জেরাল্ডকে জানায়, মেয়েরা যেখানে থাকে, সেটি জেলখানা নয়- উন্মুক্ত কটি কক্ষ মাত্র। প্রহরী মাত্র দুজন। এ জাতীয় আরো অনেক তথ্য দেয় আইওনা।
মেয়েদের বের করে আনার জন্য কয়েকজন লোক সেখানে যাবে বলে সিদ্ধান্ত হল। অন্যরা থাকবে অমুক বাড়িতে।
সিদ্ধান্তের পর আইওনা বলে, আমার ফিরে যাওয়া দরকার। কারণ, আমার পলায়নের সংবাদ জানাজানি হয়ে গেলে মেয়েদের প্রহরা কঠোর হয়ে যাবে। ফলে আমাদের এ অভিযান ব্যর্থ হবে।
আইওনার প্রস্তাবটি জেরাল্ডের মনঃপূত হল। সঙ্গে করে রাতারাতি আইওনাকে তার কক্ষের নিকটে পৌঁছে দিয়ে যায় সে। আইওনাকে বাইরে থেকে আসতে দেখে প্রহরীরা জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে, সে কোথায় গিয়েছিল, কেন গিয়েছিল, কি আশয় বিষয় ইত্যাদি। আইওনা শান্ত কণ্ঠে বলে, বেশী দূরে নয়- ঐ তো ওখানে একটু ঘুরতে গিয়েছিলাম। মনটা ভাল লাগছিল না কিনা তাই।
কক্ষে প্রবেশ করে আইওনা। প্রহরীরাও নিজেদের কর্তব্যে অবহেলার কথা স্মরণ করে চুপসে যায়।
পরদিন।
আইওনা প্রহরীদের বলে, আমাকে তোমরা একটু আলী বিন সুফিয়ানের নিকট নিয়ে চল; তার সঙ্গে আমার জরুরী কথা আছে। প্রহরীরা অসম্মতি জানিয়ে বলে, প্রয়োজন হলে তিনি-ই তোমাকে ডেকে পাঠাবেন, তোমাকে নিয়ে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আইওনা প্রহরীদের প্রয়োজনের গুরুত্ব বুঝাবার চেষ্টা করে। বলে, দেখ, তার সঙ্গে অত্যন্ত জরুরী কথা আছে, দয়া করে আমাকে দিয়ে আস। অন্যথায় কারো মাধ্যমে শুধু এ সংবাদটা পৌঁছিয়ে দাও যে, আমার তাকে বড় প্রয়োজন। আইওনা একথাও বলে, তোমাদের অবহেলায় যদি সংবাদটা না পৌঁছে, তবে এর জন্য যে ক্ষতি হবে, তার মাশুল তোমাদেরও ভোগ করতে হবে বলে দিচ্ছি।
আলী বিন সুফিয়ান তার কক্ষে গুরুত্বপূর্ণ এক কাজে ব্যস্ত। ইত্যবসরে সালাম দিয়ে এক ব্যক্তি কক্ষে প্রবেশ করে। মাথা তুলে তাকান আলী। আগন্তুকের সালামের জবাব দেন। আগন্তুক নিজের পরিচয় দিয়ে বলে, গতকাল আইওনা নামের যে গোয়েন্দা মেয়েটিকে রেখে এসেছিলেন, সে আপনার সঙ্গে সাক্ষাত করতে চায়। আপনার সঙ্গে নাকি তার জরুরী কথা আছে। সংবাদটা আপনাকে না জানালে যে ক্ষতি হবে, তার জন্য প্রহরীদের শাস্তি ভোগ করতে হবে বলেও সে শাসিয়ে দিয়েছে।
সংবাদ পাওয়া মাত্র আলী বিন সুফিয়ান আইওনাকে ডেকে পাঠান। কক্ষ ত্যাগ করে বেরিয়ে আসে আইওনা। সেই কক্ষে আর ফিরে যায়নি সে।
***
নীরব-নিস্তব্ধ গভীর রজনী। শোবকের কোথাও কেউ জেগে নেই। গভীর সুষুপ্তিতে নিমগ্ন সমগ্র নগরী। গোয়েন্দা মেয়েদের বন্দী করে রাখা ভবনটির চারদিকে নড়াচড়া করছে আট-দশটি ছায়ামূর্তি। কোন প্রহরী নেই। অবাক্ হল ওরা। হামাগুড়ি দিয়ে কাছে এগিয়ে যায় লোকগুলো। বন্দী মেয়েরা কোথায় কিভাবে থাকে, সব বলে এসেছিল আইওনা। দুজন ঢুকে পড়ে এক কক্ষে। বাকীরা ঢুকে পড়ে অন্য কক্ষগুলোতে। কোন প্রহরী আছে কি-না, নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি তারা। আইওনা বলেছিল, প্রহরী থাকে মাত্র দুজন। এখন থাকলেও দুজনকে ঘায়েল করা আট-দশজনের পক্ষে কঠিন হবে না। অবলীলায় সব কজন ঢুকে পড়ে মেয়েদের কক্ষগুলোতে। কিন্তু তারপর আর বের হল না একজনও।
