বাড়িটি ঘুরে-ফিরে দেখলাম। মনে আমার প্রচন্ড কৌতূহল। হঠাৎ কে যেন চোখের সামনে মেলে ধরে শৈশব-স্মৃতির আরেকটি পাতা। দৌড়ে গেলাম একটি কক্ষের দরজার কাছে। দরজার একটি পাল্লার উল্টো পিঠ নিরীক্ষা করে দেখলাম। কতগুলো রেখা চোখে পড়ল। মনে পড়ল, বড় ভাইয়ার খঞ্জর দ্বারা ছোটকালে আমি-ই এগুলো এঁকেছিলাম। ছুটে গেলাম আরেকটি দরজার পিছনে। সেখানেও একই রকম আঁকিবুকি খুঁজে পেলাম। তারপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালাম আম্মাদের প্রতি। মুখজোড়া একরাশ ঘন দাড়ি থাকা সত্ত্বেও তার ষোল-সতের বছর আগের আকৃতি মনে পড়ে যায় আমার। বুক ফেটে কান্না আসে। উচ্ছ্বসিত আবেগে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। বহু কষ্টে ধরে রাখলাম নিজেকে। আম্মাদকে বলিনি, আমি যে তার বোন। সাহস পাইনি। কত পূত-পবিত্র চরিত্রবান পুরুষ সে, আর আমি আপাদমস্তক একটি নাপাক মেয়ে! ও কত আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন মানুষ আর আমার মর্যাদাবোধ বলতে কিছু নেই! বললে জানি না ওর প্রতিক্রিয়া কি হত।
থামল আইওনা।
.
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ও আলী বিন সুফিয়ান তন্ময় হয়ে শুনছিলেন আইওনার আবেগঝরা কথাগুলো। এ সময়ে আলী বিন সুফিয়ান বেশ কবার চোখ তুলে তাকান আইউবীর প্রতি। আইওনার প্রতি সন্দেহ তার দূর হয়নি এখনো। কিন্তু মেয়েটির আবেগময় কণ্ঠ, উদগত অশ্রুধারা ও অপ্রতিরোধ্য দীর্ঘশ্বাস দুজনকে প্রভাবিত করে ফেলে, তার প্রতিটি কথা-ই সত্য।
আইওনা বলে, এত কিছুর পরও যদি আমাকে বিশ্বাস করতে আপনাদের কষ্ট হয়, তাহলে বিষয়টি আপনারা তদন্ত করে দেখুন। তাতে যদি আমি মিথ্যুক প্রমাণিত হই, তবে আমার সঙ্গে আপনারা যেমন ইচ্ছা আচরণ করুন। দুনিয়ার প্রতি আমার আর কোন আকর্ষণ নেই; আমি আর একদন্ডও বেঁচে থাকতে চাইনা। তবে আপনাদের অনুমতি পেলে আমি একটা কাজ করে পাপের বোঝা হালকা করে মরতে চাই।
কি করতে চাও তুমি? জিজ্ঞেস করলেন সুলতান আইউবী।
আপনি যদি নিরাপদে আমাকে কার্ক পৌঁছিয়ে দেন, তা হলে খৃষ্টানদের তিন চারজন সম্রাট এবং গোয়েন্দা প্রধান হরমুনকে হত্যা করতে পারি। বলল আইওনা।
আমরা তোমাকে কার্ক পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিতে পারি বটে, কিন্তু কাউকে খুন করার জন্য নয়। ইতিহাসের পাতায় আমি এ অপবাদ লিখিয়ে মরতে চাই না যে, সালাহুদ্দীন আইউবী নিজে শোবকে বসে থেকে একজন নারীকে দিয়ে শত্রু নিধন করেছিল। আমি তো বরং যদি জানতে পাই যে, একজন খৃষ্টান সম্রাট দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে কষ্ট পাচ্ছে, তাহলে তার চিকিৎসার জন্য আমি ডাক্তার পাঠিয়ে দেব। তা ছাড়া তোমার উপর ভরসাও করতে পারি না। তবে তুমি চাইলে ক্ষমা করে তোমাকে নিরাপদে কার্ক পৌঁছিয়ে দেয়া যায় কিনা, ভেবে দেখতে পারি। বললেন সুলতান আইউবী।
না। অন্তরে সেই সুখ আমার নেই। কার্ক আর আমার যেতে হবে না। যেখানে জন্মেছি, সেখানেই আমার মৃত্যু হোক, এই আমার কামনা। আমি যে আম্মাদের হারিয়ে যাওয়া বোন, তা ওকে বলবেন না যেন। ক্যাম্পে বাবার সঙ্গে আমি সাক্ষাত করব, তবে তাকেও জানাব না, আমি তার অপহৃতা কন্যা। এই বলে ফুফিয়ে কাঁদতে শুরু করে আইওনা। অশ্রুতে পরিপূর্ণ হয়ে আসে তার দুচোখ। বড় বড় অশ্রুফোঁটা টপটপ করে ঝরে পড়তে লাগল তার দুগন্ড বেয়ে।
আলী বিন সুফিয়ান প্রয়োজনীয় অনেকগুলো কথা জিজ্ঞেস করেন আইওনাকে। তারপর আইউবীর প্রতি মুখ ফিরিয়ে বলেন, একে কোথায় পাঠাব? কিছুক্ষণ চিন্তা করে সুলতান বললেন, একে সসম্মানে আরামে রাখতে হবে। ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নাও।
আইওনাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে যান আলী। আইউবীর শোবক দখলের আগে খৃষ্টানদের গোয়েন্দা মেয়েরা যে কক্ষে থাকত, তার একটি কক্ষে থাকতে দেন তাকে। কিন্তু এখানে থাকতে অস্বীকৃতি জানায় আইওনা। বলে, এই কক্ষগুলোকে আমি মনেপ্রাণে ঘৃণা করি। আমি যে বাড়িটি থেকে অপহৃত হয়েছিলাম, আমাকে কি সেখানে থাকতে দেয়া যায় না?
না, আবেগের বশবর্তী হয়ে আমি নিয়ম লংঘন করতে পারি না। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
প্রহরী ও চাকর-বাকরদের জরুরী উপদেশ দিয়ে আইওনাকে ওখানেই রেখে আসেন আলী।
সেনা বিশ্রামাগারে গিয়ে গা-গোসল সেরে, খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়ে আম্মাদ। কিন্তু এত ক্লান্তি সত্ত্বেও কিছুক্ষণ পর হঠাৎ চোখ খুলে যায় তার। শত চেষ্টা করেও দুচোখের পাতা এক করতে পারল না আর সে। পিতার সঙ্গে সাক্ষাত করবে কি করবে না- এই একটি প্রশ্ন তোলপাড় করে বেড়াচ্ছে তার মাথায়।
ক্লান্তি ঝেড়ে শয্যা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় আম্মাদ। হাঁটা দেয় ক্যাম্পের দিকে। ক্যাম্পে পৌঁছে পিতার নাম উল্লেখ করে লোকটি কোথায় আছে জিজ্ঞেস করে সে। খুঁজে বের করে পিতাকে।
আম্মাদের সামনে শুয়ে আছেন এক বৃদ্ধ। সালাম করে মাথা নুইয়ে তার সঙ্গে হাত মিলায় আম্মাদ।
ষোলটি বছর পর পিতাকে দেখল আম্মাদ। বৃদ্ধের গায়ে গোত নেই। আছে শুধু হাডিড আর চামড়া যেন পূর্ণাঙ্গ একটি মানব-কংকাল পড়ে আছে তার সামনে। এখন পুষ্টিকর খাদ্য ও ঔষধপত্র চলছে।
নিজের পরিচয় না দিয়ে পিতা কেমন আছেন জানতে চায় আম্মাদ। জবাবে বৃদ্ধ বললেন, কেমন আর থাকব? ষোলটি বছরের নির্মম নির্যাতন, এতদিনের দীর্ঘ বন্দী জীবন আর পুত্র-কন্যার শোক আমাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। এই ধকল বোধ হয় কেটে উঠা আমার সম্ভব হবে না। এত উন্নত খাবার আর উন্নত চিকিৎসা এতটুকু ক্রিয়াও করছে না। আমি সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেছি।
