কোন রকম জিজ্ঞাসাবাদ করার আগেই আইওনা এমন সব তথ্য বলে দেয়, যা নির্যাতনের মুখেও গোয়েন্দাদের নিকট থেকে আদায় করা যায় না। সন্দেহে পড়ে যান আলী।
আইওনা! আমিও তোমার বিদ্যায় পারদর্শী। আমি স্বীকৃতি দিচ্ছি যে, তুমি একজন উঁচু স্তরের গুপ্তচর। আমাদের জেল-শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তুমি যে পন্থা অবলম্বন করেছ, তা প্রশংসনীয় বটে, কিন্তু আমি তো আর তোমার এ প্রতারণার ফাঁদে পা দিতে পারি না। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
আপনার নাম? জিজ্ঞেস করে আইওনা।
আলী বিন সুফিয়ান। তুমি হরমুনের নিকট থেকে আমার নাম শুনে থাকবে হয়ত। জবাব দেন আলী।
হঠাৎ চমকে উঠে আইওনা। বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় সে। ধীরে ধীরে আলী বিন সুফিয়ানের কাছে গিয়ে হাটু গেড়ে বসে। আলীর ডান হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে চুমো খায় আইওনা। আলীর মুখপানে তাকিয়ে বলে, আপনাকে জীবিত দেখে আমার ভীষণ আনন্দ লাগছে। আপনার সম্বন্ধে আমি অনেক কিছু শুনেছি। হরমুন বলতেন, আলী বিন সুফিয়ান মরে গেলে মুসলমানদের বুকে বসেই বিনা যুদ্ধে আমরা তাদের পতন ঘটাতে পারব।
উঠে গিয়ে নিজ জায়গায় বসে আইওনা। বলে
কায়রোতে আমি আপনাকে দেখার অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু পাইনি। আমার উপস্থিতিতে আপনাকে হত্যা করার পরিকল্পনা আঁটা হয়েছিল। সে অভিযান সফল হল কি না পরে আর আমি জানতে পারিনি। আমাকে ডেকে পাঠান হয়েছিল শোবকে।
তুমি যা কিছু বলেছ, তার সব যে সত্য, আমরা তা বিশ্বাস করি কি করে? জানতে চান আলী।
আপনি আমায় কেন বিশ্বাস করছেন না? বলে আইওনা।
কারণ, তুমি খৃষ্টান। পাশের থেকে বললেন সুলতান আইউবী।
আমি যদি বলি, আমি খৃষ্টান নই- মুসলমান, তবে তখনও কি আপনারা বলবেন, বাপু! এটিও তোমার মিথ্যে কথা? আমার নিকট তো কোন প্রমাণ নেই। মোল সতেরটি বছর কেটে গেছে, আমি এই পল্লী থেকে অপহৃতা হয়েছিলাম। এখানে এসে জানতে পারলাম, আমার পিতা ক্যাম্পে আছেন।
পিতার নাম বলে আইওনা। এ-ও জানায় যে, পিতার নামটি তার মনে ছিল না, এখানে এসে জানতে পেরেছে। মরুভূমিতে হায়েনার হাত থেকে আম্মাদ কিভাবে তার জীবন-সম্ভ্রম রক্ষা করেছে, রাতে তার আম্মাদকে হত্যা করার প্রচেষ্টা, আম্মাদকে হত্যা করার জন্য তার খঞ্জরধারী হাত না উঠা ইত্যাদি সব ঘটনার আনুপুংখ বিবরণ দেয় আইওনা। বলে
দিনের বেলা আম্মাদের মুখমন্ডল ও চোখের প্রতি নজর পড়লে আমার হৃদয়ে এমন এক অনুভূতি জেগে উঠে, যা আমাকে সংশয়ে ফেলে দেয় যে, লোকটিকে আমি আগেও কোথায় যেন দেখেছি। ও যেন আমার পরিচিত লোক। কিন্তু কোথায় দেখেছি, কখন দেখেছি, কিভাবে পরিচয় তার কিছুই স্মরণ আসল না। আমার এ সন্দেহের কথা তার নিকট ব্যক্ত করলে সে বলল, না এমনটি হতে পারেনা; তুমি আমায় দেখবে কোথায়! রাতে দুজন খৃষ্টান সৈনিক আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওরা আমার সম্ভ্রম লুট করতে চেয়েছিল। আমার চীৎকার শুনে আম্মাদ ঘুম থেকে জেগে উঠে। আমাকে রক্ষা করার জন্য সে এগিয়ে আসে। বর্শার আঘাতে হত্যা করে ফেলে একজনকে। তখন পর্যন্ত আমি নিজেকে খৃষ্টান-ই মনে করতাম। ক্রুশের নিবেদিতপ্রাণ এক কর্মী ছিলাম আমি। কিন্তু এ মুহূর্তে আমার ভাবান্তর ঘটে যায়। যে জাতির সৈনিকেরা স্বজাতির এক অসহায় নারীর ইজ্জতে আঘাত হানতে পারে, তারা অমানুষ, মানুষ নামের কলংক। আমার হৃদয়ে প্রচন্ড ঘৃণা জন্মে যায় খৃষ্টানদের প্রতি।
হাতে ছিল আমার খঞ্জর। এক আঘাতে মাটিতে ফেলে দিলাম অপরজনকে। আম্মাদ আমার ইজ্জত রক্ষা করেছে, তাতে আমার যা আনন্দ, তারচে বেশী প্রীত আমি আমার খঞ্জরাঘাত থেকে আম্মাদ রক্ষা পাওয়ায়। আহ! কি যে হত যদি আম্মাদকে আমি খুন করেই ফেলতাম!
আইওনা আরো বলে
চলার পথে আম্মাদের মুখনিসৃত আবেগময় কিছু কথা শুনে আমি আরো আপুত হয়ে পড়ি। আমার চেতনার দুয়ারে আঘাত করে তার কথাগুলো। সমস্ত পথে আমি তার মুখপানেই তাকিয়ে থাকি। আমার মনে পড়ে যে, শৈশবে আমাকে অপহরণ করা হয়েছিল। কিন্তু এই স্মৃতি আরো অস্থির করে তুলে আমাকে।
আপনাদের নিশ্চয় জানা আছে যে, আমার মত মেয়েদেরকে কিভাবে প্রস্তুত করা হয়। প্রশিক্ষণের পর শৈশবের স্মৃতি আর নিজের মৌলিক পরিচয় মুছে যায় মন থেকে। আমারো হয়েছে একই হাল। কিন্তু আমার সংশয় ক্রমেই দূর হয়ে যায়। নিশ্চিত বিশ্বাসে পরিণত হল যে, আম্মাদকে আমি জানি। এ ছিল রক্তের টান। আমার চোখ চিনে নিয়ে নিয়েছে আম্মাদের চোখকে আর হৃদয় চিনেছে হৃদয়কে।
বোধ হয় আম্মাদের হৃদয়েও এমনি এক অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছিল। হয়ত সে কারণেই সে আমার ন্যায় হৃদয়কাড়া এক যুবতীকে হাতের কাছে পেয়েও বিন্দুবিসর্গ ভ্রূক্ষেপ করেনি, যেন আমি তার সঙ্গে-ই নেই। বহুবার গভীর দৃষ্টিতে সে আমার প্রতি তাকিয়েছিল বটে, তবে সে দৃষ্টি ছিল পবিত্র, তাতে লালসার লেশমাত্র ছিল না।
বলেই চলেছে আইওনা।
শোবকে প্রবেশ করে খানিকটা অগ্রসর হয়ে একটি বাড়ির সামনে এসে থেমে যায় আম্মাদ। দুজনে ভিতরে প্রবেশ করলাম। বাড়িটি ভিতর থেকে দেখামাত্র ধীরে ধীরে আমার মনের পর্দা অপসারিত হতে শুরু করে। কেমন যেন মনে হল, এ বাড়িটি আমি চিনি। আস্তে আস্তে চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল শৈশবের হারানো স্মৃতি।
