এদের থেকে এ পর্যন্ত যতটুকু উদ্ধার করতে পেরেছি, তা হল শোবকে এখনো বেশ কিছু খৃষ্টান গোয়েন্দা ও সন্ত্রাসী আছে। কিন্তু তাদের নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়নি। এদের তিনজন নাকি মিসরে কিছু সময় কাটিয়ে এসেছে।
ওরা আছে কোথায়? কয়েদখানায়? জানতে চাইলেন সুলতান আইউবী।
না, ওদেরকে ওদের-ই আগের জায়গায় বন্দী করে রাখা হয়েছে। বাড়ির চারদিকে কঠোর প্রহরার ব্যবস্থা করেছি। জবাব দেন আলী বিন সুফিয়ান।
ঠিক এ সময়ে কক্ষে প্রবেশ করে দারোয়ান। সালাম করে বলে, আম্মাদ শামী নামক এক প্লাটুন কমাণ্ডার এসেছেন। সঙ্গে তাঁর একটি খৃষ্টান মেয়ে। মেয়েটিকে নাকি তিনি কার্কের পথ থেকে ধরে এনেছেন। মেয়েটি গুপ্তচর।
দুজনকেই ভেতরে পাঠিয়ে দাও। বললেন সুলতান আইউবী।
বেরিয়ে যায় দারোয়ান। ভেতরে প্রবেশ করে আম্মাদ ও আইওনা। আম্মাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করে সুলতান বললেন, বোধ হয় তুমি বহু দূর থেকে এসেছ। তা আছ কার সঙ্গে?
আমি সিরীয় বাহিনীতে আছি। আমার কমাণ্ডারের নাম এহতেশাম বিন মুহাম্মদ। আমি আল-বার প্লাটুনের দায়িত্বশীল।
আল-বারক কি হালে আছে? বলেই আম্মাদের জবাবের অপেক্ষা না করে সুলতান আইউবী আলী বিন সুফিয়ানের প্রতি তাকিয়ে বললেন, আল-বার আসলেই বিদ্যুৎ। সুদানীদের উপর যখন আমরা কমান্ডো আক্রমণ চালিয়েছিলাম, তখন নেতৃত্বে ছিল এই আল-বারুক। মরু অঞ্চলে গেরিলা আক্রমণে এদের জুড়ি নেই। থামলেন আইউবী।
মহান সেনাপতি! বাহিনীর সব কজন সৈনিক আল্লাহর পথে জীবন কোরবান করেছে। বেঁছে আছি আমি একা। সুলতানের প্রশ্নের জবাব দেয় আম্মাদ।
এতগুলো জীবন নষ্ট করনি তো আবার? মৃত্যুবরণ আর কোরবান কিন্তু এক নয়; দুয়ের মাঝে বিস্তর ব্যবধান। তা বুঝ তো?
না, নষ্ট করিনি মাননীয় সেনাপতি! আল্লাহ সাক্ষী, আমাদের এক একটি জীবনের বিনিময়ে আমরা শত্রু বাহিনীর অন্ততঃ বিশ বিশটি জীবন খেয়েছি। গুটিকতক আহত সৈনিক ছাড়া ওদের কেউ গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি। ক্রুসেড বাহিনীর রক্তে লাল করে দিয়েছি আমরা ফিলিস্তীনের মাটি। আমাদের অপরাপর বাহিনীগুলোও শত্রু বাহিনীর উপর প্রলয় সৃষ্টি করেছে। সহসা পরবর্তী লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার শক্তি শেষ হয়ে গেছে তাদের। দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে জবাব দেয় আম্মাদ।
আর তুমি? মেয়েটির প্রতি মুখ ঘুরিয়ে সুলতান বললেন, লুকোচুরি না করে নিজের সব কথা খুলে বল, ভাল হবে।
বলব, সব বলব, যা জানি একেবারে সমস্ত। বলেই ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলে আইওনা।
আম্মাদ শামী! তুমি ফৌজি বিশ্রামাগারে চলে যাও। নাওয়া-খাওয়া করে আরাম কর। আগামীকাল তোমার বাহিনীতে গিয়ে যোগ দিতে হবে। সুলতান বললেন।
আমি শত্রু বাহিনীর দুটি ঘোড়া আর দুটি তরবারী নিয়ে এসেছিলাম। বলল আম্মাদ।
ঘোড়া দুটো আস্তাবলে আর তরবারীগুলো অস্ত্রাগারে জমা দাও। বলে খানিক কি যেন ভেবে নিয়ে সুলতান পুনরায় বললেন, এর মধ্যে তোমার ঘোড়া অপেক্ষা ভাল ঘোড়া থাকলে বদল করে নাও। আর শোন, বাইরের রণাঙ্গনের ঘোড়াগুলোর অবস্থা কি?
চিন্তার কারণ নেই মহান সেনাপতি। আমাদের একটি ঘোড়া নষ্ট হলে আমরা শক্রর দুটি পেয়ে যাই। জবাব দেয় আম্মাদ।
সালাম করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায় আম্মাদ। তার আমানত যথাস্থানে পৌঁছে দিয়েছে সে। এদিক থেকে তো আম্মাদ এখন সম্পূর্ণ দায়মুক্ত। কিন্তু তার হৃদয়জুড়ে জগদ্দল পাথরের মত জেঁকে বসে আছে যে অন্য কতগুলো বোঝা! সে বোঝ। আবেগের। সে বোঝ শৈশব-স্মৃতির। সে বোঝা পিতার ভালবাসার। স্থির হতে পারছে না আম্মাদ। মনটা কেমন যেন ব্যাকুল হয়ে উঠে তার। পিতৃস্নেহ এবং হৃদয়ের পুরণো ক্ষত কর্তব্য পালনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, এ আশংকায় পিতার সঙ্গে এখুনি দেখা করতে চাইছে না আম্মাদ।
আম্মাদ নিজের ঘোড়ার পিছনে অপর দুটি ঘোড়া বেঁধে নিয়ে আস্তাবল অভিমুখে আনমনে এগিয়ে চলেছে। আশপাশের কোন খবর নেই তার। ভাবাবেগে একেবারে মুষড়ে পড়েছে আম্মাদ।
.
পথ ছেড়ে দাঁড়াও আরোহী!
পিছন থেকে ভেসে আসা কারো কণ্ঠস্বরে মোহ ভাঙ্গে আম্মাদের। চৈতন্য ফিরে আসে তার। মাথা ঘুরিয়ে পিছন দিকে তাকায় সে। ছোট্ট একটি অশ্বারোহী সেনাদল এগিয়ে আসছে এদিকে। রাস্তার একধারে সরে ঘোড়া থামায় আম্মাদ। বাহিনীর একেবারে সামনের আরোহী আম্মাদের নিকট এসে থেমে যায়। দাঁড়িয়ে যায় পুরো কাফেলা। সম্মুখের আরোহী আম্মাদকে জিজ্ঞেস করে, তুমি বাইরে থেকে এসেছ? ওখানকার খবর কি?
আল্লাহর রহমতে সব ভাল দোস্ত! কচুকাটা হচ্ছে শত্রু বাহিনী। আপাতত শোবকের ব্যাপারেও কোন আশংকা নেই।
এগিয়ে চলে বাহিনী। ডান দিকে মোড় নিয়ে ঘোড়া হাঁকায় আম্মাদ।
***
আমি আপনার নিকট কিছুই গোপন রাখিনি।
সুলতান সালাহুদ্দীন ও আলী বিন সুফিয়ানের সামনে বসে কথা বলছে আইওনা। সে যে গোয়েন্দা, তা-ও সে বলে দিয়েছে। একথা-ও জানিয়েছে যে, কায়রোতে সে একমাস ডিউটি করে এসেছে। কায়রোতে আইউবী বিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত ছিল, এমন কয়েকজন বিশ্বাসঘাতক মুসলমানের নাম বলেছে আইওনা। আইওনা আরো জানায়, সুদানীরা খৃষ্টানদের পক্ষ থেকে বিপুল সহযোগিতা পাচ্ছে এবং খৃষ্টান বাহিনীর অভিজ্ঞ কমান্ডো সুদানীদের কমান্ডো আক্রমণের প্রশিক্ষণ দিয়ে চলেছে।
