একটি পুত্র বেঁচে ছিল। খৃষ্টান দস্যুদের কবল থেকে রক্ষা পেয়ে সে আমার ঘরে আশ্রয় নিয়েছিল। আমি তাকে সিরিয়া পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। এখানে থাকলে তাকেও জীবন দিতে হত। জবাব দেয় বৃদ্ধ।
আম্মাদ এখন নিশ্চিত, এটি-ই তাদের বাড়ি। ষোল বছর আগে যার ঘরে আশ্রয় নিয়ে জীবন রক্ষা করেছিল, ইনি-ই তিনি। এ বাড়ির মালিক বলে যার পরিচয় দেয়া হয়েছে, তিনি-ই তার পিতা।
কিন্তু নিজের পরিচয় গোপন রাখে আম্মাদ। বাড়ির মালিকের সেই পুত্রের সঙ্গেই যে কথা হচ্ছে, সে-ই যে এখন সামনে দাঁড়িয়ে, বৃদ্ধকে তা বুঝতে দেয়নি আম্মাদ। এমনি এক পরিস্থিতিতে আবেগ ধরে রাখা ভারী কষ্টকর, বলা যায় অসম্ভব। আম্মাদের হৃদয়ও আবেগে উদ্বেলিত হয়ে আসে। দুনিয়ার কান্না এসে জড়িয়ে ধরে তাকে। কিন্তু আম্মাদ কঠিন-প্রাণ এক সৈনিক। আবেগ পরাজিত হয় তার বীরত্বের কাছে। নিজেকে সামলিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে বৃদ্ধকে বলে, আমি এ বাড়ির মালিকের সঙ্গে সাক্ষাত করতে চাই। নামটা কি তার বলুন।
বাড়ির মালিকের নাম বলেন বৃদ্ধ পিতার নাম জানা ছিল আম্মাদের। শুনে আরেকবার রুদ্ধ হয়ে আসে আম্মাদের কণ্ঠ।
ছেলেটার এক বোন ছিল। বয়স বোধ করি সাত হবে। তাকেও তুলে নিয়ে যায় পাষন্ড খৃষ্টানরা। তার সূত্র ধরেই পরিবারের সবাইকে জীবন দিতে হল ক্রুসেডারদের হাতে। বললেন বৃদ্ধ।
আইওনা! চাঁদ তারকার উপর পবিত্র ক্রুশের নির্মমতার কাহিনী শুনছ তো? মেয়েটির প্রতি দৃষ্টিপাত করে কটাক্ষ করে আম্মাদ।
কোন জবাব দেয় না আইওনা। উপর দিকে মাথা তুলে ছাদ দেখছে সে। ছাদ থেকে চোখ নামিয়ে ছুটে যায় সে একটি কক্ষের দরজার কাছে। দরজার একটি কপাট বন্ধ করে উল্টো পিঠে কি যেন দেখে আইওনা। কপাটে গভীর করে খোদাই করা ছোট ছোট তিন-চারটি দাগ। বসে পড়ে গভীর মনোযোগ সহকারে নীরিক্ষা করে রেখাগুলো দেখতে শুরু করে আইওনা। আম্মাদ তাকিয়ে আছে সেদিকে। রেখাগুলোয় হাত বুলাচ্ছে আইওনা। এবার উঠে সে চলে যায় আরেক কক্ষে। বড় ব্যস্ত দেখাচ্ছে আইওনাকে। সেখানেও দরজার পাল্লায় কি যেন হাতড়াতে শুরু করে সে। কৌতূহল জাগে আম্মাদের মনে। করছে কি মেয়েটি! ছুটে যায় আইওনার নিকট। জিজ্ঞেস করে, অমন করে দেখছ কি তুমি?
মুখে হাসি টেনে আইওনা বলে, তোমার মত আমিও আমার শৈশব খুঁজছি। বলেই সে আম্মাদকে জিজ্ঞেস করে, এটি কি তোমাদের বাড়ি ছিল? তুমি কি এ বাড়ি থেকেই পালিয়েছিলে?
হ্যাঁ, আমি এখান থেকেই পালিয়েছিলাম। এই বলে আম্মাদ কিভাবে তার বোন অপহৃতা হয়েছিল, কিভাবে তাদের ঘরে খৃষ্টানরা আক্রমণ করেছিল, কিভাবে খৃষ্টানরা তার মা ও ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল, সব ঘটনা আইওনাকে জানায়। খানিক পূর্ব পর্যন্তও আম্মাদের ধারণা ছিল, তার পিতাও বুঝি হায়েনাদের শিকারে পরিণত হয়ে নিহত হয়েছেন। কিন্তু এই বৃদ্ধ বলছেন, তিনি নাকি জীবিত আছেন।
তুমি কি বৃদ্ধকে বলেছ যে, তিনি যাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, তুমি-ই সেই ছেলে? আইওনার মনে কৌতূহল।
না, এখন-ই সেকথা বলতে চাই না। জবাব দেয় আম্মাদ।
কিন্তু আম্মাদের মনে দোদুল্যমানতার ভাব। একবার ইচ্ছে হয়, পরিচয়টা দিয়েই ফেলি। আবার বলে, না, এখন থাক।
আম্মাদের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আইওনা। তার সাত বছর বয়সের চেহারাটা হৃদয়পটে ধরে আনার প্রাণপণ চেষ্টা করছে সে। কিন্তু পারছে না। সেই ষোল বছর আগের কথা। আইওনার বয়স তখন মাত্র সাত বছর।
দুটি ছেলে-মেয়ের অস্বাভাবিক কান্ড দেখে বিহ্বলের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছেন বৃদ্ধ। এই ঘরে এরা করছে কি, এই তার কৌতূহল। কি খুঁজে ফিরছে দুজনে, তাও তিনি বুঝতে পারছেন না। অবশেষে জিজ্ঞেস করে, বলুন, আমার জন্য কি হুকুম?
বৃদ্ধের প্রতি চকিতে ফিরে তাকায় আম্মাদ। আদেশের সুরে বলে, আপনি-ই বাড়িটি দেখা-শুনা করুন। আপাতত এটি আপনার দায়িত্বে রইল। আম্মাদ আইওনার প্রতি তাকিয়ে বলে, চল, এবার যাই।
কেন, পিতার সঙ্গে দেখা করবে না? জিজ্ঞেস করে আইওনা।
আগে কর্তব্য পালন করে নিই। মরুভূমিতে আমায় খুঁজে ফিরছেন কমাণ্ডার। না পেয়ে এতদিনে তিনি হয়ত আমাকে মৃত ঘোষণা করেই দিয়েছেন। ওখানে আমার বড় প্রয়োজন। চল, জলদি আস। আগে এই আমানত কাউকে বুঝিয়ে দিয়ে আসি। আইওনার প্রতি ইংগিত করে সহাস্যে বলল আম্মাদ।
***
নারী, নারী, নারী।
বদৃমাশ খৃষ্টানরা পেয়েছেটা কি? ওরা কি আমার চলার পথে নারীর প্রাচীর দাঁড় করাতে চায়? আমার সম্মুখে মেয়েদের নাচিয়ে কি তারা শোবক দুর্গ পুনর্দখল করতে চায়? গোয়েন্দা প্রধান আলী বিন সুফিয়ানের উদ্দেশে বললেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী।
না, আমীরে মোহ্তারাম! এরা দেয়াল নয়- এরা হচ্ছে উঁইপোকার দল। এরা উঁইপোকার ভূমিকাই পালন করছে। কাগজ কেটে টুকরো টুকরো করার ন্যায় মুসলিম জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য ও চরিত্র-ব্যক্তিত্ব কুরে কুরে খাওয়ার জন্য এদেরকে লেলিয়ে দিয়েছে খৃষ্টানরা। আপনার ও নুরুদ্দীন জঙ্গীর মাঝে ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি করার অপপ্রয়াস এই মেয়েদের-ই মাধ্যমে ঘটাতে চাচ্ছে। এরা হাশীশ আর মদ দ্বারা হাত করে নিয়েছে আমাদের মুসলিম শাসক ও আমীরদের।
যাক গে ওসব। এই মেয়েগুলোর ব্যাপারে আমায় কিছু বল। এরা আটজনই যে গোয়েন্দা, তা তো প্রমাণিত। এদের থেকে এ যাবত নতুন কোন তথ্য পাওয়া গেছে কি? জিজ্ঞেস করলেন সুলতান আইউবী।
