.
ভাবনার জগতে নিজের হারানো অতীত হাতড়ে ফিরছে আইওনা। হঠাৎ বলে উঠে, আমার একটি ঘটনার কথা স্বপ্নের মত মনে পড়েছে। কোন এক সময় আমাকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বয়সটা তখন কত ছিল মনে নেই। দুহাতে মাথার চুলে বিলি কাটে আইওন। চুলগুলো মুঠি করে ধরে ঝাঁকুনি দেয় নিজের মাথাটা। অতীতের স্মৃতি স্মরণে আনার চেষ্টা করছে যেন সে। অবশেষে বিরক্ত হয়ে বলে উঠে, কিছু মনে পড়ছে না, ছাই! মদ, বিলাসিতা, বেহায়াপনা আর প্রতারণার বানে ভেসে গেছে আমার অতীত। আমার বাবা-মা কে ছিলেন, কেমন ছিলেন, আমি কখনো ভাবিনি; তাদের প্রয়োজনও পড়েনি কোনদিন। চেতনা বলতে কিছুই ছিল না আমার মধ্যে। পুরুষ যে বাপ-ভাইও হতে পারে, তা জানতাম না। পুরুষরা আমাকে মনে করে তাদের ভোগের সামগ্রী। রূপের ফাঁদে আটকিয়ে আমি তাদের ব্যবহার করি। আমার রূপ-যৌবনের নেশা যাকে মাতাল করতে ব্যর্থ হয়, তাকে ঘায়েল করি মদ আর হাশীশ দিয়ে। কিন্তু মোহাবিষ্ট মনের দুয়ারে আঘাত করা তোমার এই অশ্রুতপূর্ব কথাগুলো খুলে দিয়েছে আমার বিবেকের দ্বার। সজাগ করে দিয়েছে আমার সুপ্ত নারীসুলভ অনুভূতিগুলো। নারী যে পুরুষের ভোগের সামগ্রী নয়, নারী যে প্রতারণার ফাঁদ নয়, নারীরও যে মা-বাবা, ভাই-বোন থাকতে পারে, মা-বোন-স্ত্রী হওয়া-ই যে নারীর প্রকৃত পরিচয়, তা আমি স্বচ্ছ আয়নার মত পরিষ্কার বুঝতে পারছি এখন।
অস্থিরতা বেড়েই চলেছে আইওনার। থেমে থেমে কথা বলছে সে। এক সময়ে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায় তার কণ্ঠ। হারানো অতীত আর বর্তমানের মাঝে শত পাকে যেন আটকে গেছে মেয়েটা। হাজার চেষ্টা করেও বেরই যেন হতে পারছে না সে। নিজের অতীতটা খুঁজে ধরে আনার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে আইওনা। কিন্তু না, পাচ্ছে না আর কিছু-ই।
চল, রওনা হই।
আম্মাদের কণ্ঠ শুনে প্রকৃতিস্ত হওয়ার চেষ্টা করে আইওনা। সহজ-সরল নিষ্পাপ বালিকার মত উঠে দাঁড়ায় সে। ঘোড়ায় চড়ে আম্মাদের পিছনে পিছনে এগুতে শুরু করে।
পার্বত্য অঞ্চল ছেড়ে বহুদূর এগিয়ে গেছে আম্মাদ ও আইওনা। আম্মাদের মুখপানে তাকিয়ে আছে মেয়েটি। হঠাৎ মুখে হাসি টেনে বলে উঠল, পুরুষের কথায় আর প্রতিশ্রুতিতে আমি কখনো বিশ্বাস করিনি। কিন্তু এখন কেন যেন মনে হচ্ছে, আমার তোমার সঙ্গে যাওয়াই উচিত, বিষয়টা আমি বুঝতে পারছি না।
আম্মাদ চোখ তুলে আইওনার প্রতি দৃষ্টিপাত করে একটুখানি হাসল শুধু।
***
পরদিন সূর্যোদয়ের সময় আইওনাকে নিয়ে আম্মাদ শোবকের প্রধান ফটকে এসে পৌঁছে। মরুভূমিতে কেটেছে তাদের আরো একদিন একরাত।
ফটক পেরিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ে তারা। এগিয়ে চলছে একটি গলিপথ ধরে।
একটি বাড়ির সামনে গিয়ে থেমে যায় আম্মাদ। ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে আইওনা। বাড়ির বদ্ধদ্বারের প্রতি দৃষ্টি দিয়ে ইতিউতি করে কি যেন দেখে নিয়ে খানিকক্ষণ ভেবে ঘোড়ায় বসে বসেই দরজায় নক করে আম্মাদ। দু-তিনটি করাঘাতের পর খুলে যায় দরজা। ভিতরে সচকিত কৌতূহলী দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছে এক বৃদ্ধ।
এখানে কে থাকে? বৃদ্ধকে আরবী ভাষায় জিজ্ঞেস করে আম্মাদ।
কেউ নয়। বাস করত একটি খৃষ্টান পরিবার। সুলতান আইউবীর শোবক দখলের পর তারা স্বপরিবারে পালিয়ে গেছে। জড়তামাখা কণ্ঠে জবাব দেয় বৃদ্ধ।
তারপর আপনি বাড়িটি দখল করে নিয়েছেন, তাই না?
শোবক দখল করার পর সুলতান আইউবী হুকুম জারি করেছিলেন যে, কোন খৃষ্টান যেন কোন মুসলমানের হাতে কষ্ট না পায়। অন্যথায় তাকে কঠোর শাস্তি পেতে হবে। আর এখন কিনা বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে তারই একজন সৈনিক এক বৃদ্ধের কাছে জবাব চাইছে, খৃষ্টানদের বাড়ি কেন দখল করল সে!
ভয় পেয়ে যায় বৃদ্ধ। কাঁপা কণ্ঠে বলে, না, দখল করিনি; বাড়িটি পাহারা দিচ্ছি। শুধু। আপনি বললে বাড়িটি বন্ধ করে আমি চলে যাব, আর আসব না। বাড়ির মালিক এখনো বেঁচে আছেন। তিনি মুসলমান। পনের-ষোল বছর ধরে তিনি বেগার ক্যাম্পে পড়ে আছেন।
কেন, আমীরে মেসের কি ক্যাম্প থেকে তাদের মুক্ত করেননি? জানতে চায় আম্মাদ।
ওখানকার মুসলমানরা তো এখন স্বাধীন। কিন্তু এখনো তারা ক্যাম্পে-ই আছে। সুলতান আইউবী আপাতত ওখানেই তাদের জন্য উন্নত থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। বেশ কজন অভিজ্ঞ ডাক্তার তাদের চিকিৎসা করছেন। যখন ই যার শরীর ঠিক হয়ে যাচ্ছে, পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে তাকে নিজ বাড়িতে। এখনও যারা আছেন, আত্মীয়-স্বজনরা অবাধে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছে, খোঁজ-খবর নিচ্ছে। এ বাড়ির মালিকও সেখানে আছেন। লোকটি একে তো বৃদ্ধ, তদুপরি পনের-ষোল বছরের নির্যাতনে ক্লিষ্ট। বেচারা বেঁচে-ই আছেন শুধু। হাড্ডিসার-কংকাল তার দেহ। আমি তাকে মাঝে-মধ্যে দেখে আসি। আশা করি, সুস্থ হয়ে যাবেন। বাড়িটা খালি হয়েছে, তা আমি তাকে জানিয়ে দিয়েছি।
তার আত্মীয়-স্বজন কোথায়? জিজ্ঞেস করে আম্মাদ।
কেউ বেঁচে নেই। ঐ যে তিনটি বাড়ির পরে যে বাড়িটি দেখতে পাচ্ছেন, ওটি আমার। আত্মীয়তার বন্ধন না থাকলেও আমাকেই তার আপনজন বলতে পারেন। জবাব দেয় বৃদ্ধ।
ভিতরে কোন মহিলা নেই জেনে নিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে ভিতরে ঢুকে পড়ে আম্মাদ। ঘুরে ঘুরে দেখে বাড়ির কক্ষগুলো। হাত বুলায় দেয়ালে। আইওনাও তার সঙ্গে। লুকিয়ে লুকিয়ে চোখ মুছে আম্মাদ। কিন্তু আইওনার নজরে পড়ে যায় বিষয়টি। কান্নার কারণ জানতে চায় আইওনা। রুদ্ধ কণ্ঠে আম্মাদ বলে, আমি আমার শৈশব খুঁজছি। এটি আমার বাড়ি। এ ঘর থেকেই আমি পালিয়েছিলাম। দু চোখ গড়িয়ে অশ্রু ঝরতে শুরু করে আম্মাদের। অশ্রুভেজা চাঁপা কণ্ঠে সে বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা, লোকটির স্বজনরা কি সবাই মারা গেছে? তার কি ছেলে-মেয়ে নেই কেউ?
