আহ! বলে উত্তপ্ত এক দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ে আম্মাদ। বলে, ছিল এক সময়। এখন কেবল স্বপ্নযোগেই তাদের সাথে সাক্ষাৎ করি।
আরো অনেক কিছু জানতে চায় মেয়েটি। কিন্তু এড়িয়ে যায় আম্মাদ। আর কোন প্রশ্নের-ই জবাব দেয় না সে। মেয়েটিকে উদ্দেশ করে বলে
তুমি নিজের মিথ্যে পরিচয় দিয়েছিলে। তবে আসলে তুমি কে এ প্রশ্ন করার এখন আর আমি প্রয়োজন মনে করি না। আমাদের পথ আর বেশী নেই। শোবক পৌঁছে নগর প্রশাসকের হাতে তোমায় তুলে দিয়েই আমি ফিরে আসব। যদি সত্য বল, তাহলে নিজের সম্বন্ধে তুমি কিছু বলতে পার। কি বলবে, তুমি-ই জান; আমি কোন প্রশ্ন করব না। তবে, যেসব খৃষ্টান মেয়ে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য আমাদের দেশে আসে, তুমি তাদের কেউ নও, একথা বলতে পারবে না আগেই বলে দিচ্ছি।
তোমার ধারণা যথার্থ। আমি গোয়েন্দা মেয়ে-ই বটে। আমার নাম আইওনা। বলল মেয়েটি।
বাবা-মা কি জানেন, তুমি কী কর?
বাবা-মা নেই। কখনো তাদের চেহারাও দেখিনি। আমি যে বিভাগে চাকরী করি, সেই বিভাগ আমার মা; আর বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা হরমুন আমার পিতা। বলেই প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে ফেলে মেয়েটি। বলে
লুজিনা নামে আমার এক সহকর্মী ছিল। এক মুসলিম সৈনিকের জন্য সে বিষপানে আত্মহত্যা করেছিল। তখন আমি বিস্মিত হয়েছিলাম এই ভেবে যে, একটি খৃষ্টান মেয়ে একজন মুসলমান সৈনিকের জন্য এত বড় ত্যাগ দিতে পারে! কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, হ্যাঁ, এমনটি হওয়া সম্ভব।
শুনেছিলাম, ঐ মুসলিম সৈনিকটিও নাকি তোমার ন্যায় একদল ডাকাতের সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজের দেহকে ক্ষত-বিক্ষত করে লুজিনার জীবন-সম্ভ্রম রক্ষা করেছিল। আহত হওয়া সত্ত্বেও কর্তব্যবোধে সে লুজিনাকে শোবক পৌঁছিয়ে দিয়েছিল। লুজিনা ছিল আমার-ই মত ভীষণ সুন্দরী। কিন্তু তার প্রতি তোমার ন্যায় সেই মুসলিম সৈনিকটিও ছিল নির্মোহ। আমার তো এখন নিশ্চিত মনে হচ্ছে, লুজিনার মত প্রয়োজনে আমিও তোমার জন্য জীবন দিতে পারব। আচ্ছা, নারীর প্রতি তোমরা এত নির্মোহ হও কি করে? এত সংযম তোমাদের শেখায় কে?
ইসলাম। কু-চিন্তায় পরনারীর প্রতি দৃষ্টিপাত করাও ইসলামে নিষিদ্ধ। তাই নারীর প্রতি পুরুষের আকর্ষণ স্বাভাবিক হওয়া সত্ত্বেও আমরা সংযম অবলম্বন করে চলি।
ইসলামের প্রতি আমি নিবেদিতপ্রাণ বলেই ইজ্জত নিয়ে তুমি এ পর্যন্ত আসতে পেরেছ। অন্যথায় তোমার স্বজাতির দু সৈনিকের মত আমিও রক্ত-মাংসের মানুষ। যৌনতাবোধ আছে আমারও। সেই ইসলামের-ই জন্য আমরা তোমাদের সঙ্গে লড়াই করছি। আর তোমরা আমাদের এই চরিত্রটা ধ্বংস করে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করতে চাইছ!
আবেগের তাড়নায়-ই কিনা জানি না, আমার মনে হচ্ছে, এর আগেও কোথাও যেন আমি তোমাকে দেখেছি। বলল আইওনা।
দেখতে পার। মিসরে হবে হয়ত। বলে আম্মাদ।
মিসরে আমি গিয়েছি ঠিক, কিন্তু ওখানে তোমাকে দেখেনি। বলেই মুচকি হেসে আইওনা জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা আমার ব্যাপারে তোমার ধারণা কি? আমি কি অতিশয় সুন্দরী নই?
তোমার রূপের কথা আমি অস্বীকার করি না। তোমার এ প্রশ্নের মর্ম আমার বুঝতে বাকী নেই। কিন্তু একজন নিবেদিতপ্রাণ ও কর্তব্যপরায়ণ মুসলমান কোন নারীর কাছে হার মানে না। হোক সে শত সুন্দরী। তা না হলে মুসলমান কেন? মুসলমান তো আর খৃষ্টানদের মত নয় যে, ধর্ম রক্ষার সৈনিক হওয়া সত্ত্বেও বিপদগ্রস্ত স্বজাতির এক মেয়েকে দেখামাত্র পশুর মত ঝাঁপিয়ে পড়বে তার উপর।
তাছাড়া
আমার বয়স যখন তের-চৌদ্দ বছর। তখন খৃষ্টানরা আমার ছোট্ট একটি বোনকে আমাদের শোবকের বাড়ি থেকে অপহরণ করেছিল। তার বয়স ছিল তখন সাত বছর। এখন সে বেঁচে আছে কিনা জানি না। থাকলেও কোথায় কি অবস্থায় আছে জানা নেই। কোন আমীরের হেরেমে আছে নাকি তোমার-ই মত গুপ্তচরবৃত্তি করছে, তা আল্লাহ ভাল জানেন। তাই এখন যে মেয়েই আমার চোখে পড়ে, তাকেই আমার সেই বোন বলে মনে হয়। আমি কোন মেয়ের প্রতি কু-দৃষ্টিতে তাকাতে পারি না। পাছে সে-ই যদি হয় আমার অপহৃতা বোন! তোমাকে আমি শোবক নিয়ে যাচ্ছি শুধু তোমার নিরাপত্তার জন্য। মরুভূমিতে একাকী ছেড়ে আসলে তোমার কি দশা হত, তা আমার জানা ছিল। তোমার স্বজাতির দুজন সৈনিকই তো তার প্রমাণ রেখে গেল। আমি এখন অন্য জগতের মানুষ। মা-বোন আছে কিনা তুমি জানতে চেয়েছিলে। শোন, আমার মাকে খৃষ্টানরা খুন করেছে। সঙ্গে বড় এক ভাইকে। বোনের কথা তো বললাম। আমি প্রতিশোধের আগুনে পুড়ে মরছি। এখন এই মরু অঞ্চলে খৃষ্টান বাহিনীকে ধাওয়া করে ফিরতে আর ওদের রক্ত ঝরানোতে আমি শান্তি পাই। আমার সব সুখ এখন জড়ো হয়েছে এসে এখানে।
বিস্ময়াভিভূত নেত্রে আইওনা তাকিয়ে আছে আম্মাদের প্রতি। এক অতৃপ্তির ভাব ফুটে উঠেছে তার চোখে-মুখে। এ যাবত এমন কথা বলেনি কেউ তাকে। অশ্লীলতা আর বেহায়াপনার দীক্ষা-ই পেয়েছে সে। তার কথাবার্তা আর চালচলনে কর্মকর্তারা সৃষ্টি করেছে যৌনতার আকর্ষণ। বড় সুদর্শন এক ফাঁদ রূপে গড়ে তুলেছে তাকে। সতীত্বের মত মহামূল্যবান সম্পদ থেকে করেছে বঞ্চিত। দীক্ষা লাভ করার পর আইওনা নিজেকে পুরুষের হৃদয়-রাণী ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেনি। নিজের বাড়ি কোথায়, বাবা-মা কেমন ছিলেন, কিছুই তার মনে নেই। কিন্তু এখন আম্মাদের আবেগময় কথাগুলো আইওনার ব্যক্তিসত্ত্বায় তার নারীসুলভ অনুভূতিগুলো সজাগ করে দিয়েছে। গভীর এক ভাবনার জগতে ডুবিয়ে ফেলে সে নিজেকে। আম্মাদের উপস্থিতির কথাও মন থেকে হারিয়ে যায় তার।
