ওরা দুজন খৃষ্টান বাহিনীর সৈন্য। মুসলিম কমান্ডো বাহিনীর ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। রাতে নিরিবিলি লুকিয়ে একটু বিশ্রাম নেয়ার জন্য এসেছিল এখানে। আইওনার রূপ পশুতে পরিণত করেছে তাদের। ক্রুশের প্রতিও লোক দুটোর কোন শ্রদ্ধাবোধ নেই। উচ্চস্বরে চীৎকার করে উঠে আইওনা। আম্মাদ জেগে উঠে তার সাহায্যে এগিয়ে আসবে, এই তার আশা। সৈন্যরা হেঁচড়াতে শুরু করে মেয়েটিকে।
হঠাৎ ভয়ার্ত কণ্ঠে চীৎকার করে একজন তার সঙ্গীর নাম নিয়ে বলে, সাবধান! কে যেন আসছে! কিন্তু না, সাবধান হওয়ার আগেই বর্শা আমূল বিদ্ধ হয়ে গেছে তার পিঠে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে।
তরবারী হাতে নিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়ায় দ্বিতীয়জন। হঠাৎ মেয়েটির মনে পড়ে যায়, তার হাতে খঞ্জর। বিলম্ব না করে খৃষ্টান সৈন্যের পাঁজরে ঢুকিয়ে দেয় সেটি। পর পর আরো দুটি আঘাত হানে সে। চীৎকার করে বলে, তোমাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। তোমরা ক্রুশের কলংক।
লাশ হয়ে গেছে দু খৃষ্টান সৈন্য। আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অঝোরে কাঁদছে আইওনা। আম্মাদ তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, এখন আর এখানে থাকা ঠিক নয়। অন্য কোন খৃষ্টান সেনাদল এদিকে এসে পড়তে পারে। চল, এক্ষুণি শোবক রওনা হই। বলে আম্মাদ জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা, ওরা কি তোমাকে জাগিয়ে তুলেছিল?
না, আমি জাগ্রত-ই ছিলাম। ঘোড়ার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
ওখানে কেন?
ঘোড়ায় চড়ে পালাবার জন্য। তোমার সঙ্গে যাব না, আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম।
খঞ্জর পেলে কোথায়?
আমার সঙ্গে ছিল। ওরা আসার পূর্বেই এটি আমার হাতে ছিল।
কারণ? আম্মাদের কণ্ঠে প্রচণ্ড কৌতূহল। কপালে ভাজ পড়ে যায় তার। বলে, বোধ হয় এজন্যে যে, জাগ্রত হওয়ার পর আমাকে হত্যা করবে।
মেয়েটি নিরুত্তর। মাথা নত করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে সে। খানিক পর মাথা তুলে আম্মাদের মুখপানে তাকায়। তারপর চোখ সরিয়ে জড়তামাখা কণ্ঠে বলে, তোমাকে খুন করে আমি পালাতে চেয়েছিলাম। ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে তোমাকে হত্যা করারই জন্য জুব্বার পকেট থেকে এটি বের করেছিলাম। কিন্তু পারিনি; কেন জানি শত ইচ্ছার পরও তোমাকে খুন করার জন্য আমার হাত উঠেনি। তোমার জীবন ছিল আমার হাতের মুঠোয়। তাছাড়া আমি ভীরুও নই। তারপরও কেন যে তোমায় খুন করতে পারলাম না, আমি তা জানিনা। তুমি হয়ত বলতে পারবে।
মানুষের জীবন-মৃত্যু আল্লাহর হাতে। তিনি-ই তোমার হাত স্তব্ধ করে রেখেছিলেন। আর তোমার সম্ভ্রমও রক্ষা করেছেন তিনি-ই। আমি তো একটি উপলক্ষ্য মাত্র। যা গে ও-সব। একটি ঘোড়ায় চড়ে বস, রওনা হই। বলল আম্মাদ।
হাতের খঞ্জর আম্মাদের প্রতি এগিয়ে ধরে মেয়েটি বলল, এই নিন, আমার খঞ্জরটি আপনার কাছে রাখুন। অন্যথায় আমি আপনাকে হত্যা করে ফেলতে পারি।
আমার তরবারীটিও তুমি নিজের কাছে রাখতে পার। তুমি আমায় হত্যা করতে পারবে না। পরম গাম্ভীর্যের সাথে বলল আম্মাদ। মেয়েটির মুখেও গম্ভীরতার ছাপ।
দুটি ঘোড়ায় চেপে বসে দুজন। তৃতীয় ঘোড়াটিও সঙ্গে নিয়ে যাত্রা করে তারা।
সূর্যোদয়ের আগেই তারা এগিয়ে যায় বহুদূর। খৃষ্টান সৈনিকদের আনাগোনা চোখে পড়ছে না এখন। একদল মুসলিম সৈনিকের দেখা পেল আম্মাদ। ঘোড়ার বাগ টেনে কথা বলে তাদের সাথে। আবার রওনা হয়।
.
এপ্রিল মাস। প্রচন্ড তাপ। গরমে সিদ্ধ হয়ে যায় যেন আম্মাদের সমস্ত শরীর। দূরে ধূ-ধূ বালুকারাশি সমুদ্রের পানির মত চিকচিক্ করছে। বাঁ-দিকে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বালির পর্বত। পথের দুধারে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত পড়ে আছে অসংখ্য লাশ। অক্ষত নেই একটিও। শকুন-শিয়ালেরা খেয়ে খেয়ে ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছে ওদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। কোন কোন লাশের হাড় আর মাথার খুলি ছাড়া কিছুই নেই। প্রচন্ড খরতাপের সঙ্গে যোগ হয়ে পঁচা লাশগুলোর উৎকট দুর্গন্ধ বিষিয়ে তুলেছে আম্মাদকে।
এ যাবত কোন কথা হয়নি দুজনের। মেয়েটির ঘোড়াকে পাশাপাশি নিয়ে আসে আম্মাদ। মুখ খুলে সে।
এরা তোমার স্বজাতির সৈনিক। ইসলামী সাম্রাজ্যের পতন ঘটানোর নিমিত্ত বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানী ও ইটালী প্রভৃতি দেশ থেকে আসা রাজ-রাজড়াদের ইচ্ছার বলি এরা।
কথা বলে না মেয়েটি। কেবল একবার আম্মাদের মুখপানে তাকিয়ে আহ! বলে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা নত করে সে। বাঁয়ের পর্বতের প্রতি মোড় ফেরায় আম্মাদ। পিপাসা নিবারণের জন্য পানি আর বিশ্রামের জন্য ছায়া দুই-ই পাওয়া যাবে ওখানে।
আকাশের সূর্যটাকে পিছনে ফেলে পার্বত্য এলাকায় ঢুকে পড়ে দুজন। ঘোড়াগুলোকে ঘাসে ছেড়ে দিয়ে একটি ঝর্ণা খুঁজে নিয়ে পানি পান করে তারা। ঘোড়াগুলোকেও পান করায়। দুজনে বসে পড়ে একটি গাছের ছায়ায়। প্রথমে মুখ খোলে মেয়েটি।
তুমি কে? তোমার নাম কি? বাড়ি কোথায়? আম্মাদকে প্রশ্ন করে মেয়েটি। মনে তার প্রচন্ড কৌতূহল। জবাবের জন্য অধীর চোখে তাকিয়ে আছে আম্মাদের মুখের প্রতি।
আমি মুসলমান। নাম আম্মাদ। বাড়ি সিরিয়া। জবাব দেয় আম্মাদ।
রাতে ঘুমের ঘোরে তুমি কাকে স্মরণ করছিলে?
মনে নেই। স্বপ্নে আমি কথা বলছিলাম, না? আমার এক সহকর্মীও আমাকে বলত, আমি নাকি ঘুমের ঘোরে কথা বলি!
তোমার মা আছেন? বোন আছে? বোধ হয় তুমি ওদের কথা-ই স্মরণ করছিলে।
