মাথা তুলে উঠে দাঁড়ায় আম্মাদ। ঘোড়ায় বাঁধা থলে থেকে কিছু খাবার এনে খায় দুজনে। কারো মুখেই রা নেই।
ঘুমিয়ে পড়ে আম্মাদ। অবসন্ন দেহটি মাটির শয্যায় এলিয়ে দেয়া মাত্র বুজে আসে তার দু চোখের পাতা। গভীর নিদ্রায় তলিয়ে যায় সে। ঘুমিয়ে পড়ে মেয়েটি।
.
মধ্যরাতের পর পার্শ্ব পরিবর্তন করে মেয়েটি। চোখ খুলে যায় তার। কিছুক্ষণ আড়মুড়িয়ে আচ্ছন্ন ভাবটা দূর করে আম্মাদের প্রতি তাকায় সে। নাক ঢেকে ঘুমুচ্ছে আম্মাদ। কয়েক পা দূরে দাঁড়িয়ে আছে ঘোড়াগুলো। টিলার উপর নেমে এসেছে আকাশের চাঁদ। স্বচ্ছ কাঁচের মত পরিষ্কার মরুভূমির জোৎস্যা। চন্দ্রালোকে ভেসে যাচ্ছে যেন প্রকৃতি। ঘোড়াগুলোর প্রতি তাকায় মেয়েটি। সব কটি ঘোড়ার পিঠে জিন বাঁধা। শোয়ার আগে জিনগুলো খুলে রাখবে, তা মনেই ছিল না আম্মাদের।
অনুকূল পরিবেশ পেয়ে জুব্বার পকেটে হাত ঢুকায় মেয়েটি। বের করে আনে চকচকে একটি খঞ্জর+শক্ত করে ধরে প্রস্তুতি নেয় সে। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আম্মাদকে। গভীর নিদ্রায় অচেতন সে। মেয়েটি একবার চমকে খঞ্জরের প্রতি আবার আম্মাদের মুখমন্ডলের প্রতি দৃষ্টিপাত করে। ক্ষীণ স্বরে বিড়বিড় করে কি যেন বলছে আম্মাদ।…..
আম্মাদের বুকটা কোথায়, গভীর দৃষ্টিতে দেখে নেয় মেয়েটি। হৃদপিন্ডটা কোথায় থাকতে পারে তা-ওঁ আন্দাজ করে নেয় সে। একবারের স্থলে দুবার আঘাত করা যাবে না। তাই আঘাতটা হানতে হবে হৃদপিন্ডে, যেন আহ! বলার আগেই প্রাণটা বেরিয়ে যায়। অন্যথায় মরতে মরতেও পাল্টা আঘাত হেনে মেরে ফেলবে তাকে।
হাতের খঞ্জর আরো শক্ত করে ধরে মেয়েটি। পরিকল্পনাটা সম্পূর্ণ কল্পনায় নিয়ে আসে আরেকবার- হৃদপিন্ডে খঞ্জর বিদ্ধ করব। ছুটে গিয়ে একটি ঘোড়ায় চড়ে বসব। তীরবেগে ঘোড়া ছুটাব।
মেয়েটি সৈনিক নয়। অন্যথায় তার এত কিছু ভাবতে হত না। এক আঘাতে আম্মাদকে খতম করেই পালিয়ে যেত। কারণ হিসেবে এটা-ই যথেষ্ট ছিল যে, আম্মাদ মুসলমান ও তার শত্রু।
কিন্তু ও তা পারছে না। বারবার চোখ দুটো চলে যাচ্ছে আম্মাদের মুখের প্রতি। আম্মাদের বুকে বিদ্ধ করার জন্য খঞ্জরের বাঁট শক্ত করে ধরে কাছে গেলেই কেন যেন মনটা তার ধড়ফড় করতে শুরু করে। খঞ্জরের হাতল ধরা হাতটা তার নেমে আসে নীচে।
আবারো বিড়বিড় করে আম্মাদ। এবার ঘুমের ঘোরে উচ্চারিত শব্দগুলো তার কিছুটা বুঝা যায়। স্বপ্নে বাড়ি গিয়েছিল সে। মাকে ডাকে, ডাকে বোনকে। আরও এমন কিছু শব্দ, যাতে বুঝা গেল, তাদেরকে কেউ খুন করেছে। খুনীদের খুঁজে বেড়াচ্ছে সে।
কি এক অজানা অনুভূতি চেপে ধরেছে মেয়েটির হাত। সীমাহীন বিচলিত হয়ে পড়ে সে। আম্মাদকে হত্যা করার সংকল্প ত্যাগ করে। খঞ্জর হাতে পা টিপে টিপে এগিয়ে যায় ঘোড়ার কাছে। কিন্তু বালিতে পা আটকে যায় তার। থেমে পিছন ফিরে আম্মাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করে আরেকবার। হঠাৎ এক ঝাঁক প্রশ্ন জেগে উঠে তার মনে। আমার মত রূপসী এক যুবতীকে একাকী হাতের মুঠোয় পেয়েও কি লোকটির মনে কোন ভাবান্তর ঘটল না? জ্বলে উঠল না তার কামনার আগুন? একটি খৃষ্টান মেয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে হত্যা করে ফেলতে পারে, সে কথা কি একটিবারও ভাবল না? লোকটি ঘোড়ার জিনও খুলে রাখেনি, নিজের অস্ত্রগুলোকেও সাবধানে রাখেনি। কেন? তবে কি আমার উপর তার পূর্ণ আস্থা ছিল। লোকটা কি এতই অনুভূতিহীন যে, আমার যৌবন তার দেহে একটুও লালসা সৃষ্টি করতে পারল না? তবে কি সে নিজেকে তার ঘোড়া অপেক্ষা বেশী মূল্যবান মনে করেনি?
মেয়েটি ধীরে ধীরে পৌঁছে যায় একটি ঘোড়ার নিকট। মানুষের আগমন টের পেয়ে ডেকে উঠে ঘোড়া। ভয় পেয়ে যায় মেয়েটি। আম্মাদ জেগে গেল কিনা, তাকায় সেদিকে। কিন্তু না, গভীর ঘুম ঘুমাচ্ছে আম্মাদ। নীরব-নিস্তব্ধ নিশীথে একটি ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনিতেও ঘুম ভাঙল না তার।
নিশ্চিন্ত হয় মেয়েটি। তিনটি ঘোড়ার আড়ালে দাঁড়িয়ে একটিতে চড়ে বসার সংকল্প করে সে। এক পা তার ঘোড়ার রেকাবে। ঠিক এমনি সময়ে পিছন থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে আসে তার কানে, কে
চমকে উঠে মেয়েটি। মাথা ঘুরিয়ে পিছন দিকে তাকায়। এক ব্যক্তি শি বাজিয়ে বলে, এ আমাদের সৌভাগ্য।
তারা দুজন। হাসিতে ফেটে পড়ে অপরজন।
মুখের ভাষায় মেয়েটি বুঝে ফেলে লোক দুজন খৃষ্টান। দ্রুতপদে ধেয়ে আসে তারা মেয়েটির কাছে। ক্ষুধার্ত হায়েনার মত ঝাঁপিয়ে পড়ে তার উপর। একজন বাহু ঝাঁপটে ধরে মেয়েটিকে টেনে নেয় নিজের দিকে। আমি খৃষ্টান বলে নিজের পরিচয় দিয়ে রক্ষা পেতে চায় মেয়েটি। হেসে উঠে দুজন-ই। হাসি থামিয়ে একজন বলে, তবে তো তোমার সবটাই আমাদের, এস।
একটু থাম; আগে আমার কথা শোেন। আমি শোবক থেকে পালিয়ে এসেছি। নাম আইওনা। আমি গোয়েন্দা বিভাগের কর্মী। যাচ্ছি কার্কে। ঐ যে দেখ, একজন মুসলিম সৈনিক ঘুমিয়ে আছে। ও আমাকে ধরে ফেলেছিল। তাকে ঘুমন্ত রেখে পালাতে চেয়েছিলাম। আমাকে তোমরা সাহায্য কর। দয়া করে আমাকে কার্কে পৌঁছিয়ে দাও।
খৃষ্টান বাহিনীর জন্য কতটুকু মূল্যবান গুরুত্বপূর্ণ মেয়ে সে, তা খুলে বলল আইওনা। তবু ওরা নিরস্ত হল না।
একজন তাকে হায়েনার মত বাহুবন্ধনে জড়িয়ে ধরে বলল, যেখানে বলবে, সেখানেই তোমায় পৌঁছিয়ে দেব। অশ্লীল এক মন্তব্য ছুঁড়ল অপরজন। একদিকে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যেতে শুরু করল তারা আইওনাকে।
