আমাকে ভয় কর না; বল তোমার পরিচয় কি? বলল আম্মাদ।
শোবক থেকে পরিবারের সঙ্গে পালিয়ে এসেছিলাম। পথে মারা গেছে সব কজা। বেঁচে আছি একা আমি। পথে মুসলমানরা আক্রমণ করেছিল। অব্যক্ত কণ্ঠে জবাব দেয় মেয়েটি।
না। সত্যি করে বল তুমি কে? যা বলেছ সব মিথ্যে।
মিথ্যে হলে হল। আমার প্রতি দয়া করুন; আমাকে কার্ক পৌঁছিয়ে দিন।
কার্ক নয়- আমি তোমাকে শোবকে নিয়ে যাব। বুঝতেই তো পারছ, আমি মুসলমান। পথে আমি খৃষ্টানদের হাতে মরতে চাই না।
তাহলে আমাকে একটি ঘোড়া দিন। আমি মেয়ে মানুষ। পথে কারুর হাতে পড়ে গেলে জানেন তো পরিণতি কী হবে।
আমি তোমাকে ঘোড়াও দিতে পারব না। একাও পাঠাতে পারব না। সঙ্গে করে তোমাকে শোবক নিয়ে যাওয়া আমার অর্পিত কর্তব্য।
সেখানে নিয়ে আমাকে কার হাতে তুলে দিবেন?
শোবকে নিয়ে আমি তোমাকে সেখানকার নতুন শাসকদের হাতে তুলে দেব। তুমি অমূলক ভয় পাচ্ছ। ইসলাম নারীকে ইজ্জত করতে শেখায়-অপমান করা নয়। শোবকে নিয়ে তোমাকে আমি যাদের হাতে তুলে দেব, তারা মুসলমান, ইসলামী আদর্শে বলিয়ান। তারা পরনারীর গায়ে হাত দিতে জানে না। আর আমিও সেই একই আদর্শের অনুসারী। সব ভয়-ভীতি মন থেকে ঝেড়ে ফেলে আমার সঙ্গে চল।
তবু শোবক যেতে চাইছে না মেয়েটি। কার্ক যাওয়ার জন্যই জিদ ধরে আছে সে। আম্মাদ বলে, শোবকের কোন নাগরিক যেন পালিয়ে যেতে না পারে, সেদিকে কড়া দৃষ্টি রাখার নির্দেশ রয়েছে আমাদের উপর। যারা নগর থেকে বের হয়ে এসেছে, তাদেরও ধরে ধরে ফেরত পাঠাতে বলা হয়েছে। তাছাড়া তুমি এখান থেকে রওনা হয়ে কার্ক পর্যন্ত নিরাপদে পৌঁছতে পারবে না। পথেই শেষ হয়ে যাবে তোমার সব সম্পদ। তোমার স্বজাতি ভাইয়েরাই খাবলে খাবে তোমাকে। নারীর ইজ্জতের গ্যারান্টি থাকলে আছে একমাত্র ইসলামে, আছে মুসলমানদের কাছে। দেরি না করে চল, রওনা হই।
আম্মাদের কোন কথাই কানে ঢুকছে না মেয়েটির। তার প্রবল আশংকা, এই মুসলমান সৈনিকটি কোথাও নিয়ে গিয়ে তাকে অপমান করবে। ইজ্জত লুট করে কেটে পড়বে। আম্মাদের সঙ্গে উপরে উঠছে না মেয়েটি। মনে মনে কৌশল আঁটে, আম্মাদকে খুন করে তার-ই ঘোড়া নিয়ে চম্পট দিবে। বলে, ঠিক আছে, তা-ই হবে। তবে এ অবসন্ন শরীর নিয়ে এখন আমি পথ চলতে পারব না। রাতটা দুজনে এখানেই কাটাই। ভোরে উঠে আমরা রওনা হব।
আম্মাদ নিজেও ক্লান্ত। ঘোড়াগুলোরও বেহাল অবস্থা। মেয়েটির ভগ্নদশাও তার চোখের সামনে। তাই প্রস্তাবে সম্মত হল সে।
প্রথমে মেয়েটি আম্মাদকে ভাল করে দেখেনি। লম্বা দাড়ি, দীর্ঘ দেহ আর মুখের গঠনে আম্মাদকে এক হিংস্র প্রাণী বলেই মনে হয়েছিল তার। তাছাড়া তার ধারণা, মুসলমান মানেই হিংস্র পশু, যাদের কাছে মায়া-দয়ার আশা করা বৃথা। কিন্তু এবার পুনর্বার গভীর দৃষ্টিতে, নিরীক্ষার চোখে ভাল করে দেখে নেয় সে আম্মাদকে। ভাবান্তর ঘটে যায় তার; না, মুসলমান মানেই হিংস্র নয়।
গভীর অপলক দৃষ্টিতে আম্মাদও তাকিয়ে আছে মেয়েটির প্রতি। ও ভাবছে, মেয়েটির অসহায়ত্বের কথা, এমনি এক অপরূপা সুন্দরী যুবতীর একাকী এই মরুভূমিতে পড়ে থাকার বিপদের কথা। আজ বেশ কদিন হল যুদ্ধ চলছে এই মরু অঞ্চলে। দু পক্ষের সৈন্যরা ক্ষুধার্ত ব্যাঘের ন্যায় ছুটে বেড়াচ্ছে এদিক-সেদিক। এভাবে একাকী পড়ে থাকলে কখন কার হাতে পড়ে মেয়েটিরও ইজ্জত হারাতে হত, তা বলা মুশকিল। এমনও তো হতে পারে যে, দখল প্রতিষ্ঠার জন্য মেয়েটিকে নিয়ে সৈনিকরা নিজেরাই পরস্পর যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিবে! ভাগ্যিস, মেয়েটি আমার হাতে পড়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবে সে, তাতে কি হল? আমিও তো ফেরেশতা নই। আমারও তো রক্ত-মাংস আছে, আছে কামনা-বাসনা, আছে যৌন-লালসা!
মেয়েটির চোখে চোখ রাখে আম্মাদ। মেয়েটিও তাকায় আম্মাদের প্রতি। লজ্জা পেল আম্মাদ। চোখ সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে সে। কিন্তু রূপের চুম্বকার্ষণে মেয়েটির চোখে চোখ আটকে যায় তার। নিজের মধ্যে কেমন এক অনুভূতি আবিস্কার করে সে, যা তার কাছে নিতান্ত অপরিচিত, একেবারে নতুন।
বহু কষ্টে দৃষ্টি অবনত করে আম্মাদ। কিন্তু সে ক্ষণিকের জন্য মাত্র। পরক্ষণেই আবার চোখাচোখি হয় দুজনের। অভাবিতপূর্ব এক শিহরণ খেলে যায় আম্মাদের মনে। হৃদয়টা যেন কেমন তোলপাড় করতে শুরু করে দেয় তার। অস্থির হয়ে উঠে সে। মেয়েটির দু ঠোঁটের ফাঁকে ফুটে উঠে একটুখানি মুচকি হাসি।
বোধ হয় তোমার এখনো বিয়ে হয়নি! আম্মাদের মনে কৌতূহল।
হ্যাঁ, আমি এখনো কুমারী। জবাব দিয়েই ঝট করে বলে ফেলে, জগতে কেউ নেই আমার। আমার সঙ্গে কার্ক চল, আমি তোমার বউ হব।
চৈতন্য ফিরে আসে আম্মাদের। বলে, হ্যাঁ, তারপর বলবে, এবার ধর্ম বদল কর। ইসলাম ত্যাগ করে খৃষ্টান হও; তাই না? তারচে বরং শোবক চল। মুসলমান বানিয়ে আমি তোমায় বিয়ে করে নেব। তুমি ঈমানী জিন্দেগীর স্বর্গীয় স্বাদ অনুভব করবে।
যে করে থোক, কার্ক আমার যেতেই হবে। আমার সঙ্গে ওখানে গেলে তোমার জগত পাল্টে যাবে। টোপ ফেলে মেয়েটি। ঈমান বেচা-কেনার হাট বসিয়ে দেয় সে।
কিন্তু হঠাৎ ভাবান্তর ঘটে যায় আম্মাদের মনে। মেয়েটির মুখমন্ডল, রেশমী চুল আর মায়াবী চোখ দুটো সে খুটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে আর মাথা ঝুঁকিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে গভীর চিন্তার জগতে। মেয়েটির কোন কথাই যেন ঢুকছে না আম্মাদের কানে।
