দুশমনের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসার সময় তার পিছন পিছন ছুটে আসে দু অশ্বারোহী। তারা আম্মাদের সঙ্গী নয়- শত্রুসেনা। ধাওয়া করছে তাকে। অন্ধকারে পিছন থেকে হাঁক দিলে ঘটনাটি টের পায় আম্মাদ। সঙ্গী দুজন পান করে শাহাদাঁতের অমীয় সুধা।
দুই শক্রসেনা চলে আসে আম্মাদের মাথার কাছে। হাতে তাদের তরবারী। আঘাত হানে আম্মাদের উপর। আম্মাদের হাতে বর্শা। প্রথমবার শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করে ঘোড়ার মোড় ঘুরিয়ে দাঁড়ায় সে। মোকাবেলা করে দুই শত্রুর। তরবারীর মোকাবেলায় বর্শা। ঘোড়ার পিঠে বসে মুখোমুখি লড়াই করছে আম্মাদ। শত্রুর তরবারীর আঘাত প্রতিহত করছে, কৌশলে নিজে আঘাত করছে বর্শা দ্বারা।
দীর্ঘক্ষণ চলে এ লড়াই। আম্মাদের হাতে পরাজিত হয়ে পালাতে চেষ্টা করে শত্রু সেনাদ্বয়। কিন্তু আম্মাদ ওদের পালিয়ে বাঁচতে দেবে কেন? খৃষ্টানদের খুন করায়-ই যে তার আনন্দ! ছুটে গিয়ে পিছন থেকে আঘাত করে পলায়নপর দুই খৃষ্টান সৈন্যের উপর। অনি মাটিতে পড়ে যায় তারা। এবার মনটা খানিক হালকা হল আম্মাদের।
শোবক পাঠানোর জন্য ধরে নিল ঘোড়াগুলো। তুলে নিল তরবারী দুটো। কিন্তু কোথায় এসে পৌঁছেছে, তা সে জানে না। দিনে আক্রমণ করা যাবে না বলে পিছু নিয়েছিল শত্রুদের। এসে পড়েছে মূল ঘাঁটি ছেড়ে বহু দূরে এখানে। নিজেকে এবং ক্লান্ত ঘোড়াগুলোকে বিশ্রাম দেয়ার জন্য সে অবস্থান নেয় এক জায়গায়। কিন্তু পাছে কোথাও থেকে হঠাৎ কোন শত্রু এসে আক্রমণ করে বসে কিনা, এ আশংকায় ঘুমায় না আম্মাদ। জেগে কাটায় সারা রাত। তারকা দেখে শোবক ও কার্কের দিক নির্ণয় করে। মরুভূমিতে কোন্ দিকে গেলে মুসলিম সৈন্যদের পাওয়া যাবে, তা-ও ঠিক করে নেয় সে।
ভোর হওয়া মাত্র উঠে রওনা দেয় আম্মাদ। মরুভূমির সন্তান সে। মরুভূমিতে তার জন্ম, ওখানেই তার লালন-পালন ও বড় হওয়া। তাই পথ হারাবার ভয় নেই তার। তাছাড়া সে একজন অভিজ্ঞ গেরিলা যোদ্ধা। দূর থেকে বিপদের গন্ধ পায় সে।
বহু দূরে শত্রু বাহিনীর চার-পাঁচজনের কয়েকটি ক্ষুদ্র দল চোখে পড়ে আম্মাদের। সাথে অতিরিক্ত ঘোড়া দুটি না থাকলে কান্ড একটা ঘটিয়ে ছাড়ত। কিন্তু মূল্যবান ঘোড়া দুটো রক্ষা করার নিমিত্ত সন্তর্পণে শক্রর দৃষ্টি এড়িয়ে এগিয়ে চলে আম্মাদ। পথে বিভিন্ন স্থানে মৃত উট-ঘোড়া ও খৃষ্টান সৈন্যদের মরা লাশ দেখতে পায় সে। শকুন-শৃগালেরা খাবলে খাচ্ছে ওদের গোশত। তাতে দুচারজন মুসলিম সৈনিকের লাশ থাকাও বিচিত্র নয়।
গন্তব্য অভিমুখে এগিয়ে চলে আম্মাদ। সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিম আকাশে। সম্মুখের পার্বত্য ভূমিতে এসে পৌঁছে সে। আঁকাবাঁকা পথ। কয়েক পা পরপরই ডানে-বাঁয়ে মোড় নিয়েছে এখানকার রাস্তাগুলো। খৃষ্টান বাহিনীর ক্ষুদ্র কোন দল এ অঞ্চলে অবস্থান নিয়ে থাকতে পারে বলে আশংকা জাগে আম্মাদের মনে। তাই সূর্যাস্তের আগে-ভাগেই এখান থেকে কেটে পড়তে চাইছে সে। টিলার উপর কোন তীরান্দাজ ওঁৎ পেতে বসে থাকার আশংকাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। উপর দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে এগিয়ে চলছে আম্মাদ।
***
দুটি টিলার মধ্য দিয়ে মোড় নিয়েছে সামনের গলি। পথের বাঁক ধরে মোড় নিতেই আচম্কা কারো ধাবমান পায়ের শব্দ শুনতে পায় আম্মাদ। কে একজন লুকিয়ে ছিল পাশের টিলায়। ঘোড়ার লাগামে ঝাঁকুনি দেয় আম্মাদ। বেড়ে যায় ঘোড়ার গতি। তীরবেগে চলে যায় সে টিলার পিছনে। কিন্তু একি! পথ নেই যে আর! সম্মুখে আরেকটি টিলা রোধ করে রেখেছে আম্মাদের পথ।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় দাঁড়িয়ে আছে আম্মাদ। এদিক-সেদিক চোখ ফিরিয়ে পথের সন্ধান করছে সে। দৃষ্টি পড়ে সামনের টিলায়। দেখে, টিলার চড়াই বেয়ে উপরে উঠার চেষ্টা করছে একজন লোক। গায়ে তার লম্বা জুব্বা। মাথাটা এক খণ্ড বস্ত্র দ্বারা আবৃত। পিঠটা আম্মাদের দিকে। দুহাত ও কনুইয়ে ভর করে উঠার চেষ্টা করছে সে।
লোকটিকে নিরস্ত্র হওয়ার জন্য পিছন থেকে হাঁক দেয় আম্মাদ। বলে, নেমে এস, নইলে পরিণতি ভাল হবে না। কিন্তু তাতে কর্ণপাত করল না লোকটি। উপরে উঠার চেষ্টা চালিয়ে-ই যাচ্ছে সে। বেশ দুর্গম টিলা।
সামনে এগিয়ে যায় আম্মাদ। দ্রুত উপরে উঠে যাওয়ার চেষ্টা করে লোকটি। কিন্তু হাত-পা বসাতে পারছে না সে কোথাও। এতক্ষণে এক পা-ও উঠতে পারেনি সে। ক্লান্ত-অবসন্ন হয়ে পড়েছে তার দেহ। টিলা থেকে ঢিলে হয়ে আসে তার মুষ্টি। হাত ফকে গড়িয়ে পড়ে নীচে; আম্মাদের ঘোড়ার ঠিক পায়ের কাছে। নেকাব সরে গিয়ে অনাবৃত হয়ে পড়ে তার মাথা ও মুখমন্ডল। কিন্তু একি! এযে পুরুষ নয়- নারী! অপূর্বদৃশ্য অপরূপা এক সুন্দরী যুবতী! বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ে আম্মাদ।
ঘোড়া থেকে নামে আম্মাদ। ভয়ে কাঁপছে মেয়েটি। ভীতি অবশিষ্ট শক্তিটুকুও শেষ করে দিয়েছে তার। উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে মেয়েটি। কিন্তু পারল না, বসে পড়ল।
কে তুমি? জিজ্ঞেস করে আম্মাদ।
পানি দাও। জবাবে বলল মেয়েটি।
ঘোড়া থেকে মশক খুলে মেয়েটিকে পানি দেয় আম্মাদ। হাতে নিয়ে মেয়েটি কক্ করে খেয়ে ফেলে সবটুকু পানি। চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসে মেয়েটির। তাকে কিছু খাবার এনে দেয় আম্মাদ। ক্ষুধায় কাতর মেয়েটি খাবার খেয়ে কিছুটা চাঙ্গা হয়ে উঠে। জীবনীশক্তি ফিরে পায় সে।
