শাসক গোষ্ঠীর এ অত্যাচারের প্রকাশ্য প্রতিবাদ জানায় তারা।
শাসক খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের প্রতিবাদ! এর নিদারুণ পরিণতির শিকার হতে হয় আম্মাদের পরিবারকে। সে রাতেই খৃষ্টানরা হানা দেয় তাদের ঘরে। হত্যা করে আম্মাদের মা ও ভাইকে। নিজে পালিয়ে আশ্রয় নেয় এক প্রতিবেশী মুসলমানের ঘরে। সেই যে পালিয়ে আসা; আর ঘরে ফিরেনি আম্মাদ।
কিছুদিন লুকিয়ে থাকার পর এক ব্যক্তির সহায়তায় সাবধানে অতি সন্তর্পণে শহর ত্যাগ করে আম্মাদ। এক কাফেলার সঙ্গে যোগ দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে সিরিয়া পৌঁছে যায়। চাকুরী পেয়ে যায় এক ধনাঢ্য শিল্পপতির ঘরে।
পরের ঘরে নোকরী করে জীবন কাটাচ্ছে আম্মাদ। পাশাপাশি মানসিকভাবেও জাগ্রত হয়ে উঠে সে। মনে তার প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে।
সৈনিকদের ভাল লাগে আম্মাদের। শিল্পপতির বাসার নোকরী ছেড়ে তারও মন চায় সৈনিক হয়ে যুদ্ধ করতে। কিন্তু আপাততঃ সৈনিক হতে না পারলেও এক সেনা অফিসারের ঘরে চাকরি মিলে যায় তার। কাটে কিছুদিন। নিজের করুণ কাহিনী শোনায় অফিসারকে। সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছের কথাও ব্যক্ত করে তার কাছে। আম্মাদের দুঃখের কাহিনী শোনেন অফিসার। সান্ত্বনা দেন তাকে। উপদেশ দেন ধৈর্য ধারণের। মনের আশাও তার পূরণ হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি। নিজ সন্তানের মত বরণ করে নেন তিনি অসহায় আম্মাদকে।
ষোল বছর বয়সে অফিসার আম্মাদকে সেনা বাহিনীতে ভর্তি করে নেন। প্রতিশোধ স্পৃহায় ব্যাকুল হয়ে আছে আম্মাদ। তিন চারটি লড়াইয়ে অংশ নেয়। অল্প কদিনে বীরত্ব ও প্রতিভা বিকশিত হয়ে উঠে তার।
এক যুগ পর এক বাহিনীর সঙ্গে আম্মাদকে পাঠিয়ে দেয়া হয় মিসরে। সুলতান আইউবীর সাহায্যে নুরুদ্দীন জঙ্গী প্রেরণ করেছিলেন এ বাহিনীটি। মিসরে কাটে তার দুবছর।
এবার তার মনের আশা পূরণ হওয়ার পালা। শোবক অভিযানে অংশগ্রহণকারী সৈনিকদের তালিকায় আম্মাদের নামও এসে যায়। মরুভূমিতে খৃষ্টান বাহিনীর উপর আক্রমণ পরিচালনাকারী মুসলিম বাহিনীগুলোর একটির কমান্ডার নিযুক্ত হয় সে। মনের ক্ষোভ প্রশমিত করার সুযোগ পেয়ে যায় আম্মাদ।
এই সেই খৃষ্টান বাহিনী, যারা অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল আম্মাদের সাত বছর বয়সের নিষ্পাপ অবুঝ বোন আয়েশাকে। এই সেই ঘাতকের দল, যারা নির্মমভাবে খুন করেছে আম্মাদের মা ও ভাইকে, যাদের ভয়ে নিজ বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালাতে হয়েছিল তাকে, যাদের নির্দয় নিষ্পেষণের শিকার হয়ে ধুকে ধুকে জীবন দিতে হচ্ছে শোবকের নিরপরাধ মুসলমানদেরকে।
খৃষ্টান বাহিনী এখন প্রতিশোধ স্পৃহায় প্রজ্বলিত আম্মাদের বৈধ শিকার। অতীব বেপরোয়া হয়ে উঠে আম্মাদ। খৃষ্টান বাহিনীর জন্য এক ভয়াবহ গজব হয়ে আবির্ভূত হয় সে।
দলের সৈন্যদের নিয়ে আহত ব্যাঘ্রের ন্যায় বারবার গেরিলা আক্রমণ চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করছে সে খৃষ্টানদের। অল্প সময়ে তার অশ্বারোহী গেরিলা বাহিনীর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। তবু বুকের প্রজ্বলিত আগুন নিভছে না তার। শত্রুদের উপর এত প্রলয় সৃষ্টি করার পরও মনের ক্ষোভ তার প্রশমিত হতে চাইছে না; মিটছে না হৃদয়ের জ্বালা।
.
একমাস পর।
আম্মাদের দলে মুজাহিদের সংখ্যা এখন চারজন। তাকে সহ পাঁচজন। বাকীরা সব শহীদ হয়ে গেছে। এক রাতে এই চার আরোহী আক্রমণ করে বসে খৃষ্টান বাহিনীর পঞ্চাশজনের এক প্লটুনের উপর। সে এক অভাবিতপূর্ব দুর্ধর্ষ অভিযান। একস্থানে তাঁবু গেড়ে রাতের বেলা অবস্থান করছিল খৃষ্টান বাহিনী। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তারা। পাহারা দিচ্ছে বেশ কজন সান্ত্রী। রাত তখন দ্বি-প্রহর। চার সঙ্গীকে নিয়ে বিদ্যুদ্বেগে ঘোড়া ছুটায় আম্মাদ। ঘুমন্ত খৃষ্টান সৈনিকদের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে অন্য দিকে যাওয়ার সময় বর্শা দ্বারা প্রবলবেগে আঘাত হানে ডানে-বাঁয়ে। তার সঙ্গীরাও একই প্রলয় সৃষ্টি করে। খৃষ্টানরা ঘটনা আঁচ করার পূর্বে অন্ধকারে মিলিয়ে যায় আম্মাদ। ঘুমন্ত খৃষ্টানদের অনেকে আহত হয় বর্শার আঘাতে। চার চারটি ঘোড়ার পায়ে পিষ্ট হয়ে নিহত হয় বেশ কজন। সান্ত্রীরা অন্ধকারে তীর ছুঁড়ে। ব্যর্থ যায় তাদের লক্ষ্য।
কিন্তু মনে তৃপ্তি পেল না আম্মাদ। মোড় ঘুরে দাঁড়ায় সে। সঙ্গীদের থামায়। আস্তে আস্তে সরে আসে পিছনে। এতক্ষণে দুশমন সজাগ হয়ে গেছে, তা একটুও ভাবল না সে। সঙ্গীদের নিয়ে চলে যায় তাঁবুর নিকটে। দ্রুত ঘোড়া ছুটাতে নির্দেশ দেয়। অন্ধকারে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায় শত্রু সেনাদের। দুদিকে সমান গতিতে আক্রমণ চালিয়ে শত্রু শিবিরের উপর দিয়ে তীরবেগে ছুটে যায় পাঁচটি ঘোড়া। কিন্তু শিবির অতিক্রম করার পর এবার তারা পাঁচজন নয়- তিনজন। তীরের আঘাতে খৃষ্টানরা ফেলে দিয়েছে দুজনকে।
আম্মাদ আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। রক্তের তেজ বেড়ে যায় তার। সঙ্গী দুজনকে ডেকে বলে, এক্ষুণি আমি এর প্রতিশোধ নিচ্ছি। সীমাহীন বেপরোয়া হয়ে উঠে আম্মাদ। ঘোড়ার মোড় ঘুরিয়ে খৃষ্টানদের সন্নিকটে এসেই আক্রমণ করার নির্দেশ দেয় সঙ্গীদের। তাদের ঘোড়াগুলো এবার ক্লান্ত। দুশমনও পূর্ণ সজাগ-সচেতন। বেশ কিছুক্ষণ হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে আম্মাদ সরে আসে পিছনে।
