সুলতান আইউবী আরো লিখেন
আমি ফিলিস্তীনের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছি। সংকল্প নিয়েছি, সমগ্র ফিলিস্তীন জয় না করে ফিরব না। আপনি অ-সামরিক নেতৃবর্গের উপর কড়া নজর রাখুন। আলেমদের বলে দিন, যেন তারা মসজিদে মসজিদে এবং সর্বত্র এ ঘোষণা জানিয়ে দেন যে, ইসলামী সাম্রাজ্যের খলীফা শুধু একজন- বাগদাদের খলীফা। এক খলীফার আনুগত্য মেনে চলতে হবে সব মুসলমানের। খোতবায় খলীফার নাম যেন কেউ উচ্চারণ না করে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাম-ই আমাদের জন্য যথেষ্ট। খলীফা কিংবা তার কোন গভর্নর বাইরে বের হলে রক্ষী বাহিনী ছাড়া কোন সাধারণ মানুষ তাদের পিছনে যেন না হাঁটে, মাথা নত করে তাদের সালাম না করে, বলে দেবেন।
পত্রে সুলতান আইউবী সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি লিখেছেন, তাহলো
শিয়া-সুন্নী বিরোধ বেড়ে চলেছে। ফাতেমী খেলাফতের পতন এ বিরোধকে বেশী উস্কে দিয়েছে। এর অবসান ঘটাতে হবে। খেলাফত ও হুকুমত সুন্নী বটে, কিন্তু তাই বলে শিয়াদের গোলামে পরিণত করার অধিকার কারুর নেই।
পত্রখানা নুরুদ্দীন জঙ্গীর হাতে গিয়ে পৌঁছে। আইউবীর প্রস্তাবাবলীর প্রতি তিনি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন। তৎক্ষণাৎ তিনি তার বাস্তবায়ন শুরু করে দেন। অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা ও প্রেম-ভালবাসার মাধ্যমে সুলতান আইউবীও নিজ অঞ্চলের শিয়া-সুন্নী বিরোধেরও অবসান ঘটাতে শুরু করেন।
সুলতান আইউবীর উপর পাল্টা আক্রমণের পরিকল্পনা নিচ্ছে খৃষ্টানরা। সংঘাত এড়িয়ে কৌশলে বেরিয়ে আসার নির্দেশ প্রেরণ করে তারা মরুভূমির বিক্ষিপ্ত সৈনিকদের প্রতি। পাশাপাশি চল্লিশ সদস্যের একটি কমান্ডো বাহিনী গঠন করে ফেলে। নির্যাতিত মুসলিম বেশে শোবক প্রবেশ করে আটকেপড়া গুপ্তচর মেয়েদের বের করে আনবে তারা।
সুলতান আইউবীর অনুপস্থিতির সুযোগে খৃষ্টানরা মিসরে তাদের নাশকতার কার্যক্রম জোরদার করারও সিদ্ধান্ত নেয়। দ্রুত সুদানী ও ফাতেমীদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে কায়রো দখল করে নেয়ার পরিকল্পনা আঁটে তারা।
শোবক ও কার্কের মধ্যবর্তী অঞ্চলে চলছে ব্যাপক রক্তপাত। এলাকাটি সম্পূর্ণ অসমতল। স্থানে স্থানে মাটি ও বালির উঁচু উঁচু টিলা। ঢুকে পড়লে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এ দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে ধুকে ধুকে মরছে যেমন খৃষ্টানরা, তেমনি মুসলিম বাহিনীও। মুসলমানদের ভয়ে শোবক থেকে পালিয়ে আসা বেসামরিক খৃষ্টানরাও এখানে এসে পথ ভুলে মৃত্যর কোলে ঢলে পড়ছে। শূন্যে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়াচ্ছে শকুনের দল। আনন্দের সীমা নেই ওদের। মানুষের গোশতে পরিপূর্ণ তাদের পেট। হিংস্র প্রাণীরা খাবলে খাচ্ছে নিহতদের লাশ। মরুভূমির কোথাও আছে খেজুর বাগান, আছে পানির ঝর্ণা। ক্ষুৎপিপাসায় ক্লান্ত ও আহত অনেক মানুষ জীবন বাঁচাবার আশায় ছুটে আসছে ওখানে। কিন্তু জীবন নিয়ে আর ফিরে যেতে পারছে না একজনও।
***
আম্মাদ হাশেমী। মুসলিম বাহিনীর এক প্লাটুন কমাণ্ডার। বাড়ি সিরিয়া। খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে তার প্রচণ্ড ক্ষোভ। অন্যদের তুলনায় বেশী আক্রোশ তার ক্রুসেডারদের প্রতি।
সঙ্গীরা জানে, আম্মাদ এতীম। পিতা নেই। মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই তার। কিন্তু নিজের এতীম হওয়ার বিষয়টি তার কাছে নিশ্চিত নয়। কারণ, পিতা তার চোখের সামনে মরেনি।
তের-চৌদ্দ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়েছে আম্মাদ। শৈশবে খৃষ্টানরা হানা দিয়েছিল তার শোবকের বাড়িতে। সেই লোমহর্ষক ঘটনাটি স্পষ্ট মনে আছে তার। তখন মুসলমানদের উপর অমানুষিক নির্যাতনে মেতে উঠেছিল খৃষ্টানরা। খৃষ্টানদের নির্মম নির্যাতন চোখে দেখে বড় হয়েছে সে। সে দেখেছে পিটিয়ে পিটিয়ে হাঁকিয়ে নিয়ে মুসলিম বন্দীদের বেগার ক্যাম্পে নিক্ষেপ করার দৃশ্য। হাঁটতে না পারার কারণে চোখের সামনে দুজন কয়েদীর দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করার এবং পিতা-মাতার সম্মুখ থেকে মেয়েদের তুলে নেয়ার হৃদয় বিদারক ঘটনা মনে পড়লে এখনো সর্বাঙ্গ কাঁটা দিয়ে উঠে আম্মাদের। শহরে খৃষ্টানরা হঠাৎ নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে, মুসলমানদের অকারণে ধরে ধরে বেগার ক্যাম্পে পাঠাতে শুরু করলে, মুসলমানদের বাড়ি-ঘরে হানা দিতে আরম্ভ করলে মুসলমানরা মনে করত, এই বুঝি খৃষ্টানরা কোথাও মুসলমানদের হাতে পরাজয়ের শিকার হয়েছে।
এ অত্যাচার থেকে আম্মাদ হাশেমীর ঘরও রক্ষা পায়নি। একটি বোন ছিল তার। বয়স সাত-আট বছর। নাম আয়েশা। সে বোনটির কথাও মনে আছে তার। অতিশয় সুশ্রী ও ফুটফুটে মেয়ে। ঘরে ছিল তার পিতা, মা ও বড় এক ভাই।
একদিন বাইরে খেলতে গিয়ে আয়েশা আর ফিরে আসেনি। নিখোঁজ হয়ে যায় মেয়েটি। সর্বত্র পাতিপাতি করে সন্ধান নিয়েও পাওয়া গেল না তাকে। অবশেষে এক প্রতিবেশী জানাল, খৃষ্টানরা ওকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে।
নগর প্রশাসকের কাছে ফরিয়াদ জানাতে গেলেন আম্মাদের পিতা। কিন্তু অপহৃতা মেয়েটি মুসলমান একথা জানতে পেরে গর্জে উঠে প্রশাসক। বলে, তোমার এত বড় স্পর্ধা! শাসক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে এত হীনকর্মের অপবাদ দিলে তুমি! কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন আম্মাদের পিতা।
ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ঘরে ফিরে আসেন তিনি। আর্জির ফল জানালেন সকলকে। কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা পেয়ে ব্যাথ্যায় ছ্যাৎ করে জ্বলে উঠে সবার মন। সোচ্চার হয়ে উঠে তারা খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে।
