ঐতিহাসিকগণ আরো লিখেছেন
যখন খৃষ্টানদের শোবক আক্রমণ করা ছিল একান্ত প্রয়োজন, যখন সুলতান আইউবী ছিলেন সামরিক শক্তিতে দুর্বল, তখন কিনা খৃষ্টানরা শোবক থেকে কয়েকটি মেয়েকে মুক্ত করার চিন্তায় ছিল বিভোর। সালাহুদ্দীন আইউবীর সামরিক দূরদর্শিতার প্রশংসা না করে পারা যায় না। সমরশক্তিতে দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও তিনি খৃষ্টানদের মনে আতংক সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কৌশলের মারপ্যাঁচে আটকিয়ে তিনি খৃষ্টান বাহিনীকে এদিক-সেদিক বিক্ষিপ্ত করে দিয়েছিলেন। ফলে তারা বড় ধরনের কোন অভিযান পরিচালনার সাহস-ই হারিয়ে ফেলেছিল। তাছাড়া মুসলিম বাহিনী ছিল দেশ-প্রেম ও ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত। ক্ষুৎপিপাসায় কাতর হয়েও যুদ্ধ থেকে পিছপা হয়নি তারা কখনো।
কিন্তু খৃষ্টান বাহিনী ছিল এ চেতনা থেকে বঞ্চিত। তারা যখন তাদের কমান্ডারদের পিছপা হতে দেখল, সঙ্গে সঙ্গে তাদের যুদ্ধ করার মনোবল হারিয়ে গেল। সাহস নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লে আইউবীর বাহিনীকে বিপর্যস্ত করা খৃষ্টানদের পক্ষে কঠিন ছিল না। কিন্তু তখন তারা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান বাদ দিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
সে কালের খৃষ্টান ঐতিহাসিকদের সুর টেনে দুতিনজন ঐতিহাসিক লিখেছেন যে, সালাহুদ্দীন আইউবী লাগাতার দুটি বছর শোবক অবরোধ করে রেখে অবশেষে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান। সালাহুদ্দীন আইউবী ও নুরুদ্দীন জঙ্গীর মধ্যে একটি ভুল বুঝাবুঝি তার কারণ। জঙ্গীর উপদেষ্টাগণ তাকে তথ্য দেয় যে, সালাহুদ্দীন আইউবী মিসরকে নিজের একচ্ছত্র অধিকারে রেখে ফিলিস্তীনেরও একক রাষ্ট্রনায়ক হতে চাইছেন। তাঁর পরিকল্পনা, ফিলিস্তীন কজা করে তিনি জঙ্গীকে ক্ষমতাচ্যুত করবেন।
ঐতিহাসিক লিখেছেন- এ তথ্য পেয়ে নুরুদ্দীন জঙ্গী শোবক অভিমুখে সৈন্য প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য, শোবকের সামরিক ক্ষমতা হাতে নেয়া। আইউবীর সহযোগিতার নাম করে জঙ্গীর বাহিনী শোবক এসে পৌঁছে। কিন্তু আইউবী তাদের গোপন পরিকল্পনার কথা টের পেয়ে যান। গোয়েন্দা মারফত এ তথ্য পেয়ে সুলতান আইউবী মনে প্রচন্ড আঘাত পান এবং অবরোধ তুলে নিয়ে ভগ্নহৃদয়ে মিসর ফিরে যান।
তবে খৃষ্টানরা নুরুদ্দীন জঙ্গীকে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে উস্কে দেয়ার অপচেষ্টা করেনি যে, তা নয়। সুলতান আইউবীর পিতাও সে অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।
আইউবীর পিতা নাজমুদ্দীন আইউব দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে হঠাৎ একদিন শোবক এসে হাজির হন। হঠাৎ পিতাকে দেখে তিনি বিস্মিত হয়ে পড়েন। ভাবলেন, তিনি হয়ত পুত্রকে বিজয়ের মোবারকবাদ দিতে-ই এসেছেন।
পিতা-পুত্রের সাক্ষাৎ হল। সুলতান বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সালাম-মোসাফাহা করলেন। কিন্তু নাজমুদ্দীন আইউব কোন ভূমিকা ছাড়াই অত্যন্ত গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, যে নুরুদ্দীন জঙ্গী আমার ন্যায় অখ্যাত-অপরিচিত ব্যক্তির পুত্রকে মিসরের রাষ্ট্রনায়ক বানালেন, সে কি অজ্ঞ? তোমার পুত্র ব্যক্তিগত ক্ষমতার মোহে ইসলামী সাম্রাজ্যের অতন্দ্র প্রহরী নুরুদ্দীন জঙ্গীর দুশমন হয়ে গেছে এ কথাটাও শুনতে হল আমাকে! যাও, নুরুদ্দীন জঙ্গীর পায়ে পড়ে ক্ষমা নিয়ে আস।
বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হল। ভুল ভাঙ্গল নাজমুদ্দীন আইউবের। স্পষ্ট হয়ে গেল যে, এটি খৃষ্টানদের ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের-ই ফল।
সুলতান আইউবী তাঁর বিশেষ দূত ও বিখ্যাত ফকীহ ঈসা এলাহকারীকে সঙ্গে দিয়ে পিতাকে বিদায় করেন এবং এলাহকারীর কাছে নুরুদ্দীন জঙ্গী বরাবর একটি পত্র দেন। সঙ্গে, শোবকের কিছু উপহার সামগ্রীও দিয়ে দেন। সেই পত্রে তিনি লিখেছেন
মূল্যবান হাদিয়া শোবকের দুর্গ। তা-ও আমি আপনার পায়ে নিবেদন করছি। এরপর কার্ক দুর্গও পেশ করব ইনশাআল্লাহ।
এ পত্রে সুলতান আইউবী প্রচ্ছন্নভাবে নুরুদ্দীন জঙ্গীকে খৃষ্টানদের নিত্য নতুন ষড়যন্ত্রের কথা স্মরণ করিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।
পত্রে সুলতান আইউবী শোবকের বর্তমান পরিস্থিতি ও তার বাহিনীর অবস্থান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন এবং কয়েকটি বৈপ্লবিক প্রস্তাব পেশ করেন। জঙ্গীকে তিনি লিখেন
দুশমন আমাদের ভূখন্ডে জেঁকে বসে আছে। তারা যুদ্ধ করছে আমাদের সাথে। গভীর চক্রান্তের মাধ্যমে গাদ্দার সৃষ্টি করছে তারা আমাদের মাঝে। আমাদের অ সামরিক নেতৃত্ব কেবল ব্যর্থ-ই নয়- ইসলামী সাম্রাজ্যের জন্য বিরাট এক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ ঘর-বাড়ি ছেড়ে অনেক দূরে উত্তপ্ত বালুকাময় মরুভূমিতে জীবনের মায়া ত্যাগ করে আমরা শত্রুর সঙ্গে লড়াই করছি। আমাদের অকুতোভয় মুজাহিদরা লড়াই করছে আর জীবন দিচ্ছে। দিনের পর দিন না খেয়েও তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষুৎপিপাসায় কাতর হয়েও থামছে না। শাহাদাঁতের পর কাফন পর্যন্ত জুটছে না তাদের। ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হচ্ছে তাদের লাশ। শৃগাল-শকুনের খোরাকে পরিণত হচ্ছে তাদের মৃতদেহ। ইসলামের মাহাত্ম্য ও জাতির মর্যাদা তারা যতটুক বুঝে, আর কেউ বুঝে না। ইসলাম ও জাতির জন্য আমাদের অ-সামরিক শাসকবর্গের এক ফোঁটা রক্তও ঝরে না। তারা যুদ্ধের ময়দান থেকে বহু দূরে নিরাপদ প্রাসাদে ভোগ-বিলাসে লিপ্ত থাকে। অপরূপা সুন্দরী ও বাকচতুর নারী আর ইউরোপের মদ দিয়ে শত্রুরা তাদেরকে নিজেদের ভক্ত-অনুরক্তে পরিণত করছে। দ্বীন-ঈমানের সমুন্নতির জন্য আমরা জীবন দিচ্ছি আর তারা কিনা দুশমনের হাতে ঈমান বিক্রি করে আয়েশ করছে, শক্ত করছে কাফেরদের হাত।
