এ মুহূর্তে খৃষ্টানদের প্রধান সমস্যা হল, তাদের সিংহভাগ সৈন্য- যারা তাদের শ্রেষ্ঠ লড়াকু- কার্ক থেকে বহুদূরে বিস্তীর্ণ বালুকাময় মরু অঞ্চলে বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। তারা মুসলিম বাহিনীর হাতের ক্রীড়নক হয়ে আছে। সুলতান আইউবীর পরিকল্পনাকে অতীব সাফল্যের সাথে বাস্তবায়ন করে চলেছে তার কমান্ডাররা। তারা পার্বত্য এলাকায় ওঁৎ পেতে লুকিয়ে থাকে। দিনের বেলা যখন তীব্র বাতাস বইতে শুরু করে, তখন যেদিক থেকে বাতাস বইছে, সেদিক থেকে আক্রমণ করছে। এতে বাতাস এবং ঘোড়ার পায়ের উড়ানো বালুকারাশি পড়ছে গিয়ে খৃষ্টান বাহিনীর চোখে-মুখে। চোখ থাকতেও অন্ধ হয়ে যাচ্ছে তারা।
আইউবীর সৈন্যসংখ্যা নগণ্য; প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত। ঐতিহাসিকরা লিখেছেন, সে সময়ে খৃষ্টানরা শোবক আক্রমণ করে বসলে সুলতান আইউবীর উপায় ছিল না। সৈন্যের অভাবে অধিকৃত এ দুর্গকে তিনি ধরে রাখতে পারতেন না। কিন্তু তিনি অতি কৌশলে খৃষ্টানদের উপর নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে রেখেছিলেন।
.
শোবকের উত্তর-পূর্বে প্রেরিত বিপুল খৃষ্টান সেনা বেকার বসে আছে। পাছে নুরুদ্দীন জঙ্গী আইউবীর সাহায্যে ফোর্স প্রেরণ করে বসেন কিনা এ আশংকায় তাদেরও ফিরিয়ে আনতে পারছে না খৃষ্টানরা।
কার্ক দুর্গে কপালে হাত ঠেকিয়ে হিমশিম বসে আছে খৃষ্টান রাষ্ট্রনায়ক ও কমান্ডাররা। কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না কেউ। কোন সিদ্ধান্ত আসছে না কারুর মাথায়। অন্যদিকে শোবকে বসে ব্যাকুলচিত্তে সুলতান আইউবীও ভাবছেন, খৃষ্টানরা যদি শোবক আক্রমণ করেই বসে, তবে তা ঠেকাবেন তিনি কিভাবে!
কার্ক থেকে খৃষ্টানদের তথ্য সংগ্রহ করছে আইউবীর গোয়েন্দারা। খৃষ্টানদের ছদ্মবেশে কার্কে ঢুকে পড়েছে তারা। উন্নত ব্যবস্থাপনায় প্রতিনিয়ত রিপোর্ট পাচ্ছেন সুলতান।
শোবক ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে লোক সংগ্রহ করে সেনাবাহিনীতে ভর্তি শুরু করে দেন সুলতান আইউবী। এক্ষুণি ট্রেনিং শুরু করতে আদেশ দেন তিনি। উট-ঘোড়র অভাবে নেই। খৃষ্টানরা পালাবার সময় অনেক উট-ঘোড়া ফেলে গিয়েছিল দুর্গে।
বাইরের বাহিনীগুলোর প্রতি নির্দেশ পাঠান, এখন থেকে যেন তারা দুশমনের পশুগুলোকে না মেরে ধরে দুর্গে পাঠাতে থাকে।
নতুন ভর্তিহওয়া সৈনিকদের কমান্ডো ও ঝটিকা আক্রমণ পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেয়ার নির্দেশ দেন সুলতান আইউবী।
গুপ্তচরবৃত্তিতে নারী ব্যবহার না করা সংক্রান্ত হরমুনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয় কার্কের কনফারেন্সে। অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় আলেম গোয়েন্দাকে। মুসলমানদের চিন্তা-চেতনায় আক্রমণ করার জন্য লোক তৈরি করার নির্দেশ দেয়া হয় তাকে।
শোবক দুর্গ থেকে কজন গোয়েন্দা মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। নিরাপদে পালিয়ে যায় কজন। নিখোঁজ রয়েছে কিছু। পুরুষদেরও কয়েকজন ধরা পড়ে যায় মুসলমানদের হাতে। বেশ কিছু আত্মগোপন করে আছে শোবকেই। কনফারেন্সে এ তথ্য প্রকাশ করেন গোয়েন্দাপ্রধান হরমুন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। আত্মগোপন করে থাকা গোয়েন্দাদের প্রতি আপাতত সেভাবেই থাকতে নির্দেশ পাঠান হয়।
এক সম্রাট বললেন, বন্দী মেয়েদের সহজে বের করে আনা সম্ভব হবে না বোধ হয়। তবে নিখোঁজ মেয়েরা ওখানকার কোন খৃষ্টানের ঘরে আত্মগোপন করেছে। তাদেরকে খুঁজে বের করে আনা আবশ্যক।
আলোচনার পর সুলতান আইউবীর কমান্ডো বাহিনীর সৈনিকদের ন্যায় একটি জানবাজ বাহিনী গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয় খৃষ্টানরা। বিচক্ষণ ও দূরদর্শী হতে হবে এ বাহিনীর প্রতিটি সদস্য। আরবী কিংবা মিসরী ভাষা জানা থাকতে হবে প্রত্যেকের। মুসলিম বেশে শোবক যাবে তারা। গিয়ে বলবে, খৃষ্টানদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আমরা কার্ক থেকে পালিয়ে এসেছি। শোবকে আটকেপড়া গোয়েন্দা মেয়েদের খুঁজে বের করে নিয়ে আসা হবে তাদের দায়িত্ব।
বিভিন্ন জেল থেকে যেসব কয়েদীকে তাদের ইচ্ছায় সেনাবাহিনীতে ভর্তি করা হয়েছিল, এ বাহিনীতে আনতে হবে তাদেরকে। যারা শোবকে ছিল এবং শোবকের অলিগলি যাদের পরিচিত।
প্রখ্যাত ইতিহাস লেখক উইলিয়াম অফ টায়ার শোবক বিজয়ের পর্যালোচনা করতে গিয়ে খৃষ্টানদের সমালোচনা করে বলেছেন
খৃষ্টানরা সুন্দরী মেয়েদের দ্বারা মুসলমানর দেশে গুপ্তচরবৃত্তি, নাশকতা ও মুসলমানের চরিত্র ধ্বংস করার প্রতি বেশী মনোযোগী ছিল। এর থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, তাদের চরিত্রটা ছিল কত নোংরা। তারা মুসলমানদের কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে হাত করতে সক্ষম হয়েছিল ঠিক; কিন্তু কোন জাতি এবং তার সেনা বাহিনীর জাতীয় চেতনাকে ধ্বংস করা যে সহজ নয়, তা তারা বুঝে উঠতে পারেনি। তাদের রূপসী মেয়েদের অপহরণ করে, বিজিত অঞ্চলসমূহে ব্যাপকহারে নারীর সম্ভ্রমহানী ও গণহত্যা চালিয়ে, সর্বোপরি নিরপরাধ মুসলমানদেরকে ধরে ধরে বেগার ক্যাম্পে নিক্ষেপ করে খৃষ্টানরা মুসলমানদের ক্ষতি করতে চেয়েছিল। কিন্তু ফল হয়েছে বিপরীত। এসব ঘটনা উল্টো মুসলমানদের জাগিয়ে তুলেছিল। প্রতিশোধ-স্পৃহায় তারা আরো বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। কোনভাবেই খৃষ্টানরা তখন মুসলমানদের জাতীয় ও সামরিক চেতনাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারেনি। মুসলমানের সারিতে কয়েকজন গাদ্দার তৈরি করে ইসলামের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা যায় না কখনো।
