তার ভাষ্যমতে আত্মহত্যা সে শাস্তির ভয়ে করেনি। মুসলিম ফৌজির আদর্শ দেখে, তার সংস্পর্শে গিয়ে তার উপলব্ধি আসে যে, সে পাপী এবং নিজের দেহকে প্রতারণার ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করছে। এ অনুভূতি তার এত তীব্র ছিল যে, শেষ পর্যন্ত মেয়েটি আত্মহত্যার পথ বেছে নিল।
আমাদের বেশীর ভাগ গোয়েন্দা মেয়ে-ই এমন যে, শৈশবে তাদেরকে বাবা-মার কোল কিংবা মুসলমানদের বিভিন্ন কাফেলা থেকে অপহরণ করে এনেছিলাম। এখুন তারা যুবতী। নিজেদের শৈশব এবং মূল পরিচয় তারা ভুলে গেছে। তারা যে মুসলিম পিতা-মাতার কন্যা, এখন সে কথা তাদের মনেও নেই। আমরা তাদের নাম পরিবর্তন করেছি। পাল্টে দিয়েছি তাদের ধর্ম, তাদের চরিত্র। ছিল মুসলমান, এখন তারা রীতিমত খৃষ্টান।
কিন্তু আমরা তাদের রক্ত পরিবর্তন করতে পারিনি। আমি মানুষের সাইকোলজি বুঝি। মুসলমানদের সাইকোলজি অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের থেকে ভিন্ন। এটা আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা। আমাদের এই মেয়েরা যখন কোন মুসলমানের মুখপানে তাকায়, তখন হঠাৎ করে তাদের যেন মনে পড়ে যায়, তাদের ধমনীতেও মুসলিম পিতার রক্ত বইছে। অনেক কিছুই করা যায়, কিন্তু মুসলমানের রক্ত থেকে তার ধর্মকে মুক্ত করা যায় না।
তার মানে কোন মেয়েকে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য না পাঠান হোক, এ-ই কি তোমার পরামর্শ? জিজ্ঞেস করে এক কমান্ডার।
না। বরং আমার বক্তব্য হল, এমন মেয়েদের গুপ্তচরবৃত্তিতে নিযুক্ত করা না হোক, যাদের জন্য মুসলমানের ঘরে। তবে আমার বিভাগ থেকে যদি আপনারা মেয়েদের একেবারেই সরিয়ে দেন, তাতে ক্রুশের জন্য ভালোই হবে বলে আমি মনে করি। মুসলিম আমীরদের হেরেমে নারী ঢুকিয়ে আপনারা তাদেরকে ফাঁদে ফেলতে পারছেন। রূপসী নারীর ছলনার শিকার হয়ে অনায়াসে চলে আসছে তারা আপনাদের হাতে। কিন্তু কেন? কারণ, তারা যুদ্ধের ময়দান দেখেনি। আমাদের তরবারীর সঙ্গে তাদের তরবারীর সংঘাত হয়নি। আমাদের আসল রূপের সাথে তারা পরিচিত নয়। আমাদেরকে চিনে তাদের সেনাবাহিনী। যুদ্ধের ময়দানে যাদের রক্ত ঝরে, তারাই জানে, কে তাদের শত্রু, আর কে মিত্র। এ কারণে সেনাবাহিনীর বেলায় আমাদের রূপসী নারীদের ছলনা কোন কাজেই আসে না। বললেন গোয়েন্দা প্রধান হরমুন।
ফিলিপ অগাস্টাস বড় শয়তান প্রকৃতির মানুষ। ইসলামের শত্রুতাকে তিনি ইবাদত মনে করেন। তিনি বললেন
দৃষ্টি তোমার সীমাবদ্ধ হরমুন! তুমি দেখছ শুধু সালাহুদ্দীন আইউবী আর নুরুদ্দীন জঙ্গীকে। আমাদের দৃষ্টি ইসলামের উপর। আমরা ইসলামের মূল উপড়ে ফেলতে চাই। তজ্জন্য মুসলমানদের চরিত্র ধ্বংস করা এবং তাদের চিন্তা-চেতনায় সংশয় সৃষ্টি করা একান্ত প্রয়োজন। রঙ্গিন সংস্কৃতি ঢুকিয়ে দাও মুসলমানদের মধ্যে। আমাদের লক্ষ্য আমাদের জীবদ্দশায়-ই যে অর্জিত হতে হবে এমন নয়। এ কাজ আমরা অর্পণ করে যাব পরবর্তী প্রজন্মের উপর। তারা কিছু সাফল্য অর্জন করবে। তারপর পুরুষানুক্রমে চলতে থাকবে এ ধারা। তারপর একটি যুগ এমন আসবে যে, তখন ইসলামের নাম-নিশানাও থাকবে না। থাকলেও তার আর কোন সালাহুদ্দীন আইউবী, নুরুদ্দীন জঙ্গী জন্ম দেয়ার ক্ষমতা থাকবে না। সেদিন মুসলমানরা ইসলাম মনে করে যে ধর্ম পালন করবে, আমাদের-ই সভ্যতা-সংস্কৃতির রঙে রঙিন হবে তা। একশত বছর পরের অবস্থার প্রতি দৃষ্টি দাও হরমুন! জয়-পরাজয় একটি সাময়িক ঘটনা। শোবক দুর্গ আবার আমাদের দখলে আসবে। তুমি মিসরে ষড়যন্ত্রের জাল আরো শক্ত কর। ফাতেমী ও সুদানী সৈন্যদেরকে মদদ দিয়ে যাও। হাশীশীদের কাজে লাগাও।
***
সভাকক্ষে প্রবেশ করে এক খৃষ্টান অফিসার। লোকটি অতিশয় ক্লান্ত। মুসলিম বাহিনীর প্রতিরোধে পাঠানো একটি দলের কমান্ডার সে। বড় উদ্বিগ্ন বলে মনে হল তাকে। কক্ষে প্রবেশ করেই মলিন মুখে সে বলল
বাহিনীর অবস্থা ভাল নয়। আমি আপনাদের কাছে একটি প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। কার্কে আমাদের যত সৈন্য আছে, কিছু রিজার্ভ সৈন্য যোগ করে তাদের দিয়ে শোবক আক্রমণ করা হোক। মুখোমুখি এসে লড়াই করতে বাধ্য করা হোক মুসলমানদের।
বর্তমানে যুদ্ধের অবস্থা হল, কেন্দ্রীয় কমান্ডের নির্দেশমত আমাদের বাহিনী কার্কের দিকে পিছিয়ে যাচ্ছে। রাতের অন্ধকারে বাহিনীর পিছন অংশের উপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে উধাও হয়ে যায় আইউবীর কমান্ডো বাহিনীর গুটি কতক সৈন্য। দিনের বেলা তাদের তীরান্দাজ বাহিনী দু চারটি তীর ছুঁড়ে আমাদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে হাওয়া হয়ে যায়। টার্গেট করে তারা আমাদের ঘোড়া ও উটগুলোকে। আঘাতপ্রাপ্ত জানোয়ারগুলো তুলকালামকান্ড ঘটিয়ে দেয়। দেখাদেখি সমস্ত উট-ঘোড়া দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করতে শুরু করে। চলে যায় আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকটি বাহিনীকে সমবেত করে পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু মুসলমানরা সামনাসামনি আসছে না। উল্টো নিজেদের পছন্দমত ময়দানে নিয়ে গিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত করিয়ে আমাদের কয়েকটি বাহিনীকে শেষ করে দিয়েছে। আমাদের সৈনিকরা যুদ্ধ করার মনোবল হারিয়ে ফেলেছে। এ মনোবল ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন একটি তীব্র পাল্টা আক্রমণ।
বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেল।
