প্রশ্ন আসে গোয়েন্দা প্রধান হরমুনের উপর। এত বড় বিচক্ষণ গুপ্তচর হওয়া সত্ত্বেও চোখ বুজে আপনি এ রিপোর্ট মেনে নিলেন কেন? কি করেইবা বুঝলেন যে, রিপোর্টটি সঠিক? জানতে চায় এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
এ প্রসঙ্গে আমার অনেক কথা আছে। সংগত কারণেই আমি এ দাবি করতে পারি যে, গুপ্তচরবৃত্তিতে আমি বিচক্ষণ। কিন্তু ইতিপূর্বে আমার বিচক্ষণতা ও আমার গোয়েন্দাদের শ্রম ও কোরবানীকে বহুবার অগ্রাহ্য করা হয়েছে। ফলে আমার যোগ্যতা বলি হয়ে গেছে সামরিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নির্দেশের যূপকাষ্ঠে। এখানে উপস্থিত আছেন তিনজন রাষ্ট্রনায়ক। আছেন তাদের সম্মিলিত কমান্ডের উচ্চপদস্থ এক কমাণ্ডারও? অবিশ্বাস্য শোচনীয় এক পরাজয়ে বিপর্যস্ত আমরা। শোবকের মত শক্ত দুর্গ আমাদের হাতছাড়া। আমাদের মাইলের পর মাইল বিশাল-বিস্তৃত এলাকা এখন মুসলমানদের কজায়। আমাদের বছরের রসদ-পাতি ও মূল্যবান জিনিসপত্র এখন দুশমনের হাতে। শোবকের জনগণ এখন মুসলমানদের গোলাম। এর জন্য দায়ী কে? বে-আদবী মাফ করলে আমি আপনাদের প্রত্যেককে একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, আমরা শপথ করেছিলাম, ক্রুশের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার জন্য আমরা আমাদের জীবন উৎসর্গ করব। ব্যক্তিগত মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে হলেও ক্রুশের মর্যাদা রক্ষা করে সেই অঙ্গীকার পালন করে চলা উচিত আমাদের সকলের। এবার অনুমতি হলে আমি একটি প্রশ্ন করতে চাই।
গোয়েন্দা প্রধান হরমুন অত্যন্ত ব্যক্তিত্বশীল লোক। কনরাড, গাই লে অফ লুজিনান এবং ফিলিপ অগাস্টাস-এর ন্যায় রাষ্ট্রনায়কগণও তার মতের বিরুদ্ধাচারণ করার সাহস পান না। গোয়েন্দা বিভাগের সকল নিয়ন্ত্রণ ও সর্বময় ক্ষমতা তার হাতে। একজন খৃষ্টান রাষ্ট্রনায়ককেও গুপ্তভাবে হত্যা করার মত ব্যবস্থা, সাহস ও যোগ্যতা তার আছে। তাকে সমীহ করে চলে সকলে। প্রশ্ন করার অনুমতি পান তিনি। পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে কক্ষজুড়ে। হরমুনের মুখের প্রতি সকলের দৃষ্টি। প্রশ্ন করেন হরমুন
দুশমনের গোপন তথ্য সংগ্রহ এবং চরিত্র ধ্বংসের জন্য আমরা মেয়েদের উপর নির্ভরশীল কেন?
কারণ, নারীর প্রতি মানুষ সবচেয়ে বেশী দুর্বল। চরিত্র ধ্বংসের জন্য নারী শ্রেষ্ঠ অস্ত্র। নারীর হাডিড-মাংসের এই দেহের মাধ্যমে হোক কিংবা সাহিত্যের মাধ্যমে নারীর রূপ-সৌন্দর্য, দেহ-সৌষ্ঠব ও আকর্ষণের কথা ফুটিয়ে তুলে হোক, মানুষের চারিত্রিক পদস্থলনে নারীর বিকল্প নেই।
তুমি কি একথা অস্বীকার করতে পারবে যে, আরবের বহু আমীর-উজীরকে নারীর হাতে আমরা আমাদের গোলামে পরিণত করেছি? বললেন এক সম্রাট।
কিন্তু বর্তমানে মুসলমানদের শাসন-ক্ষমতা যে আমীর-উজীরদের নয় সেনাবাহিনীর হাতে। খলীফার শাসন মানছে না এখন মুসলমানরা। সামরিক ক্ষেত্রে খলীফাদের দখল বলতে নেই। সালাহুদ্দীন আইউবী মিসরের একজন গভর্নর মাত্র। কিন্তু রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা তার হাতে। মিসরের খলীফাকে তিনি ক্ষমতাচ্যুৎ করেছেন। এদিকে আছেন নুরুদ্দীন জঙ্গী। তিনি একজন সেনাপতি ও মন্ত্রী। সামরিক ক্ষেত্রে বাগদাদের খলীফার আদেশ-অনুমতির তোয়াক্কা করতে হয় না তাকেও।
এমতাবস্থায় কজন আমীর-উজীরকে হাত করলে মুসলমানদের মধে বড়জোর গাদ্দারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। দেশের এক ইঞ্চি জমিও ওরা আপনাকে দিতে পারবে না। ইসলামী সাম্রাজ্যের আসল রাষ্ট্রনায়ক এখন সেনাবাহিনী। সুলতান আইউবী ও নুরুদ্দীন জঙ্গী তাদের সেনাবাহিনীকে এমন প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলেছেন যে, মেয়ে দিয়ে তাদের সৈন্যদের চরিত্র আপনি নষ্ট করতে পারবেন না, পারেনওনি।
মুসলিম সৈন্যদের জন্য মদপান জঘন্য অপরাধ। ইসলামে যে কারো জন্য মদপান করা হারাম। এ কঠোর পাবন্দির কারণে সামরিক-বেসামরিক কোন মুসলমান-ই চৈতন্য হারায় না কখনো। হুঁশ-জ্ঞান ঠিক রেখে চলতে পারে তারা সবসময়। সালাহুদ্দীন আইউবী যদি মদপানে অভ্যস্ত হতেন, তাহলে আজ মিসর হত আমাদের আর সালাহুদ্দীন আইউবী শোবক দুর্গের বিজয়ী নয়- হতেন এই দুর্গে আমাদের বন্দী। বললেন হরমুন।
হরমুন! মুসলমানদের প্রশংসা শোনবার সময় আমাদের নেই। মেয়ে সম্পর্কে কি বলছিলে, তা-ই বল। বলল এক কমান্ডার।
মূল প্রসংগে ফিরে যান হরমুন। বললেন
আমি বলতে চেয়েছিলাম, গুপ্তচরবৃত্তির জন্য আমাদের নারী ব্যবহারের কৌশল ব্যর্থ হয়েছে। গত দু বছরে অতি মূল্যবান মেয়েগুলোকে মিসর পাঠিয়ে আমরা মুসলিম সৈন্যদের হাতে তাদের খুন করিয়েছি। নারী হল আবেগপ্রবণ জাতি। মেয়েদেরকে আমরা যত কড়া প্রশিক্ষণ দেই না কেন, তারা পুরুষদের মত পাথর হতে পারে না। আমরা তাদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করি। কিন্তু কোমল-হৃদয়ের কারণে তারা অনেক সময় পরিস্থিতির কাছে নতি স্বীকার করে। ফল আসে বিপরীত। মেয়েরা ধরা পড়ে শক্রর হাতে।
মুসলিম সৈন্যরা তাদের উপভোগ না করে সসম্মানে আশ্রয় দেয়। পরনারীর দেহকে তারা হারাম মনে করে। ওদের চরিত্র দেখে আমাদের মেয়েরা প্রভাবিত হয়ে পড়ে; দুর্বল হয়ে পড়ে ইসলাম ও মুসলমানের প্রতি। এই তো সম্প্রতি আইউবীর এক কমান্ডার একদল দস্যুর সঙ্গে লড়াই করে আমাদের এক মেয়ের জীবন ও সম্ভ্রম রক্ষা করেছে। গুরুতর আহত হয়েছে নিজে। মেয়েটি তাকে সঙ্গে করে শোবকে নিয়ে আসে। আমরা তাকে বেগার ক্যাম্পে ফেলে আসি। কিন্তু মেয়েটি এক সেনা অফিসারের সামরিক উর্দি চুরি করে তাকে পরিয়ে নিজের ঘোড়ায় করে পার করে দিয়েছে। আমি মেয়েটিকে ধরে ফেলি। কিন্তু বিষপান করে আত্মহত্যা করেছে ও।
