কিন্তু সালাহুদ্দীন আইউবীর চেহারায় বিজয়ের কোন প্রতিক্রিয়া-ই দেখা গেল না। শোবকের উল্লসিত মুসলমানরা দ ও শানাইয়ের তালে তালে নেচে-গেয়ে পাঁচিলের সামনে এসে থামে। সালাহুদ্দীন আইউবী একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন তাদের প্রতি। তাকে এক নজর দেখতে পেয়ে জনতা পাগলের মত লাফাতে শুরু করে। কিন্তু সুলতানের ঠোঁটে একটু হাসি নেই। তিনি হাত নেড়ে জনতাকে অভিনন্দন পর্যন্ত জানালেন না। অপলক নেত্রে জনতার প্রতি তাকিয়েই আছেন শুধু। হঠাৎ জনতার মধ্য থেকে উচ্চস্বরে একজন বলে উঠল, নাজমুদ্দীন আইউবের পুত্র সালাহুদ্দীন আইউবী! তুমি আমাদের মুক্তিদূত। তুমি শোবকের মুসলমানদের জন্য পয়গম্বর হয়ে এসেছ।
আমরা তোমাকে সেজদা করি। জনতার মধ্য থেকে গগণবিদারী তাবকীর ধ্বনি তুলে বলল আরেকজন।
এবার নিজেকে খুঁজে পান সুলতান। চৈতন্য ফিরে আসে তার। জনতার মন্তব্যে কেঁপে উঠে তার সমস্ত শরীর। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন- আমার পাপের বোঝা ভারি করতে ওদের নিষেধ কর। আমি পয়গম্বর নই- পয়গম্বরদের একজন দাসানুদাস মাত্র। আর সেজদার উপযুক্ত তো একমাত্র আল্লাহ।
আমি সুলতানের এক রক্ষীকে বললাম, জদি যাও, জনতাকে এসব শ্লোগান বন্ধ করতে বল। বল, সুলতান এতে অসন্তুষ্ট হচ্ছেন।
রক্ষী যেতে উদ্যত হয়। সুলতান তাকে থামিয়ে বললেন, বলবে শান্তভাবে। যেন। ওরা মনে কষ্ট না পায়। ওদের আনন্দ-উল্লাসে ব্যাঘাত কর না। ওরা যে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করেছে! আমার জীবন ওদের আনন্দের জন্য উৎসর্গিত।
আর বলতে পারলেন না সুলতান। আবেগের আতিশয্যে রুদ্ধ হয়ে আসে তার কণ্ঠ। মুখ ফিরিয়ে নেন অন্যদিকে। চোখের কোনে উদগত অশ্রু লুকাবার চেষ্টা করেন তিনি। আবার আমাদের প্রতি তাকান। বলেন, আমরা সবেমাত্র ফিলিস্তীনের আঙ্গিনায় এসে পৌঁছেছি। যেতে হবে অনেক দূর। রোম উপসাগর যেখান থেকে পশ্চিমে মোড় নিয়েছে, উত্তরদিকে আমাদের যেতে হবে সে পর্যন্ত। আরব ভূমি থেকে সর্বশেষ ক্রুসেডারটিকেও ধাক্কা দিয়ে রোম উপসাগরে নিক্ষেপ করে ডুবিয়ে মেরেই তবে আমরা ক্ষান্ত হব।
সুলতান আইউবী নায়েবদের নির্দেশ দেন যে, শহরময় ঘোষণা করিয়ে দাও, কোন অমুসলিম নাগরিক যেন এই ভয়ে শহর ছেড়ে না পালায় যে, মুসলমানরা তাদের উত্যক্ত করবে। কোন মুসলিম ফৌজি কিংবা কোন সাধারণ মুসলমানের আচরণে যদি কোন অমুসলিম নাগরিক কষ্ট পায়, তবে সে যেন দুর্গের দ্বারে এসে অভিযোগ করে। প্রতিকার পাবে।
অত্যন্ত জোরালো ভাষায় সুলতান ঘোষণা করলেন
মানুষের জন্য আমরা অশান্তির বার্তা নিয়ে আসিনি। আমরা এসেছি ভালবাসার পয়গাম নিয়ে। তবে যদি কেউ ইসলামী হুকুমতের বিরুদ্ধে কোন উক্তি করে কিংবা যদি কেউ ইসলাম বিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত হয়, তবে মুসলিম হোক, অমুসলিম হোক, এর কঠোর শাস্তি তাকে ভোগ করতেই হবে। ইসলামী বিধান মেনে চলতে হবে দেশের সব নাগরিককে।
সুলতান আরো আদেশ জারি করেন, নগরীর কোথাও যদি কোন খৃষ্টান ফৌজি কিংবা গুপ্তচর লুকিয়ে থাকে, সে যেন এক্ষুণি মুসলিম বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে।
দেয়াল ভেঙ্গে দুর্গে প্রবেশ করার পর পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আইউবীর বাহিনী সর্বাগ্রে খৃষ্টানদের গোয়েন্দা সদর দফতরে তল্লাশী চালায়। কিন্তু পাওয়া গেল না গুরুত্বপূর্ণ কিছুই। আক্রান্ত হওয়ার পর চতুর খৃষ্টানরা সর্বাগ্রে এ অফিসটি খালি করে ফেলে। সরিয়ে ফেলে দফতরের জরুরী কাগজপত্র। পালিয়ে যায় গোয়েন্দা প্রধান হরমুন ও তার সহকর্মীরা।
তবে ধরা পড়ে যায় আটটি মেয়ে। তাদের তুলে দেয়া হয় আলী বিন সুফিয়ানের হাতে। তিনি তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। তারা জানায়, অন্তত বিশটি মেয়ে এখান থেকে পালিয়ে গেছে। যে কজন পুরুষ গোয়েন্দা ছিল, তারাও পলায়ন করেছে। এদের একজন জানায়, আমার এক সহকর্মী মেয়ে ছিল। নাম তার লুজিনা। হাদীদ নামক এক আহত মুসলিম ফৌজিকে পালাতে সাহায্য করার পর সে বিষপানে আত্মহত্যা করেছে।
.
বিশৃংখলা দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার তৎপরতা চলছে শোবকে। অন্যদিকে কার্কে প্রস্তুত হচ্ছে শোবককে আইউবীর হাত থেকে মুক্ত করার পরিকল্পনা। আলোচনায় বসেছে তারা। কি হতে কি কি হয়ে গেল এই ভেবে স্তম্ভিত সবাই। আলেম গোয়েন্দার নিকট থেকে তারা নিশ্চিত রিপোর্ট পেয়েছিল যে, সুলতান আইউবী কার্ক আক্রমণ করবেন, কার্ক অভিমুখে এগিয়ে আসছে তার বাহিনী। কায়রোর গুপ্তচরদের মারফতও একের পর এক তারা এ রিপোর্ট-ই পেয়েছিলেন যে, আইউবী কার্ক আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অভিযানের কমান্ডে থাকবেন সুলতান নিজে। কিন্তু মাঝপথে সৈন্যরা কার্কের পথ ছেড়ে অন্য পথ ধরে। তারা এমন এমন কৌশল অবলম্বন করে যে, তাদের প্রতিহত করার জন্য প্রেরিত খৃষ্টান বাহিনী তাদের কমান্ডো বাহিনীর হাতে বিপর্যস্ত হতে শুরু করে। সুলতান আইউবী আক্রমণ করে দখল করে নেন শোবকের মত শক্তিশালী দুর্গ। বিষয়টি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয় সকলের মনে।
এর জন্য অভিযুক্ত করা হয় আইউবীর বন্দীদশা থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত আলেম গোয়েন্দাকে। তার প্রদত্ত ভুল তথ্য-ই খৃষ্টানদের শোচনীয় পরিণতির জন্য দায়ী বলে সকলের অভিমত।
হাতকড়া পরিয়ে কনফারেন্সে হাজির করা হল তাকে। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করে গোয়েন্দা। আইউবীর মুখ থেকে এ তথ্য সে কিভাবে পেয়েছিল, পুনরায় তা বিবৃত করে সকলের সামনে। অবশেষে বলল, আমার দেয়া তথ্যে সন্দেহ থাকলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ সে অনুযায়ী কাজ না করলেই পারত! আমার রিপোর্ট গ্রাহ্য না করলেই তো আর এ বিপর্যয় ঘটত না!
