মুসলিম সৈনিকগণ তাদের আপন ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালাতে নিষেধ করে। সালার ও কমান্ডারগণ নিজ নিজ সৈনিকদের আদেশ করেন, কোন নাগরিককে যেন নগর ছেড়ে পালাতে দেয়া না হয়। নির্দেশ পেয়ে মুসলিম সৈন্যরা পলায়নপর খৃষ্টানদেরকে মরুভূমির দূর-দূরান্ত পথ ও পার্বত্য অঞ্চল থেকে ধরে ধরে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে শুরু করে।
তবু ভয় কাটছে না তাদের। তারা নিজ শাসকবর্গের পাপের কথা ভুলে যায়নি। এখানকার মুসলমানদের মানবিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিল খৃষ্টান শাসকরা। যেন ওরা মানুষ নয়- নরকের কীট। বেগার ক্যাম্প তার জীবন্ত প্রমাণ।
এ ক্যাম্প সম্পর্কে অবহিত ছিলেন সুলতান আইউবী। তাই শোবকে প্রবেশ করেই আগে ছুটে আসেন তিনি এ ক্যাম্পে। তখনো অন্ততঃ দু হাজার মুসলমান বন্দী ছিল এখানে। চরম মানবেতর জীবন যাপন করছিল তারা। দু হাজার মানুষ নয়, যেন দু হাজার লাশ। পশুর মত খাটান হত তাদের। মানুষের পায়খানা পর্যন্ত বহন করান হত তাদের দ্বারা।
এখানে অনেকে এসেছিল যৌবনে। এখন তারা বৃদ্ধ। তারা ভুলে গেছে যে, তারা মানুষ। প্রথম দিকের লড়াইগুলোর যুদ্ধবন্দীও আছে এখানে।
এ ক্যাম্পের হতভাগ্যদের অধিকাংশই হল তারা, যাদেরকে বিভিন্ন কাফেলা কিংবা শহর থেকে ধরে এনে এখানে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তারা ছিল হয়ত বড় কোন ব্যবসায়ী কিংবা কোন রূপসী কন্যার পিতা। সম্পদ-কন্যা ছিনিয়ে নিয়ে খৃষ্টানরা তাদের বন্দী করে রাখে এ ক্যাম্পে। ইসলামী সালতানাতের প্রতি সমর্থন ও ক্রুসেডের বিরুদ্ধাচারণের অভিযোগেও এখানে বন্দী হয়েছিল কেউ কেউ।
শহরের মুসলিম অধিবাসীরা নামায পড়ত, কুরআন তেলাওয়াত করত নিজ ঘরে, অতি সংগোপনে। শব্দ যেন বাইরে না আসে, সেদিকেও তাদের সতর্ক থাকতে হত।
একজন অতি সাধারণ খৃষ্টানকেও মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম করতে হত মুসলমানদের। সুন্দরী যুবতী মেয়েদের লুকিয়ে তো রাখতে হত-ই। নিষ্পাপ কিশোরীদেরও বাইরে বের হতে দেয়া যেত না। সুশ্রী হলে অপহরণ করে নিয়ে যেত খৃষ্টানরা।
বেগার ক্যাম্পের এ দু হাজার জিন্দা লাশের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন সুলতান আইউবী। অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে আসে তার দু চোখের পাতা। কান্নাভেজা কন্ঠে বললেন, আমার এই মজলুম ভাইদের মুক্ত করার জন্য প্রয়োজন হলে সমগ্র ইসলামী সাম্রাজ্যকে বন্ধক রাখতেও আমি কুণ্ঠাবোধ করতাম না।
আপাতত ক্যাম্পেই তাদের উন্নত থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন সুলতান। এদের বিস্তারিত ইতিবৃত্ত শুনবার মত এখন সময় নেই তার। বাইরের পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে আগে।
.
বাইরে লড়াই চলছে এখনো। সুলতান আইউবীর কৌশলের ফাঁদে ধরা খেয়ে তাকে প্রতিহত করার জন্য যেসব খৃষ্টান সৈন্য কার্ক ও শোবকের বাইরে অবস্থান নিয়েছিল, মুসলিম বাহিনীর কমান্ডো আক্রমণে দিগ্বিদিক বিক্ষিপ্ত হয়ে তারা এখন পিছনে সরে আসতে শুরু করেছে। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর কমান্ডো হামলা থামছে না তবু। ধাওয়া করে করে চরমভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে তারা খৃষ্টানদের।
কোন কোন অভিযানে মুসলিম বাহিনী খৃষ্টান বাহিনীর হাতে ক্ষয়-ক্ষতির শিকার হচ্ছে বলেও সংবাদ পান আইউবী। তাছাড়া কার্ক দুর্গে অবস্থানরত খৃষ্টান বাহিনী তাদের মরুভূমির বিপর্যস্ত সৈনিকদের সাহায্যে এগিয়ে যেতে পারে বলেও আশংকা জাগে তাঁর মনে।
ভাবনায় পড়ে যান সুলতান আইউবী। এ পরিস্থিতি সামাল দেয়ার মত সৈন্য তার নেই। মিসর থেকে রিজার্ভ বাহিনীও তলব করতে চাইছেন না তিনি। কারণ, সেখানকার পরিস্থিতিও অনুকূল নয়। বিলুপ্ত ফাতেমী খেলাফতের ধ্বজাধারীরা গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। সুদানী কাফ্রীরা স্বতন্ত্র শক্তি সঞ্চয় করছে। এ দুই বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে সাহায্য দিয়ে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ করছে ক্রুসেডাররা। সর্বোপরি কতক রাজনৈতিক ও সামরিক মুসলিম কর্মকর্তাও পর্দার আড়ালে থেকে আইউবী বিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত। ক্ষমতার লোভে ইসলামের দুশমনদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে নির্বোধ এই ঈমান-বিক্রেতাদের দল। সুলতান আইউবীকে একাধিকবার হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিল যারা, তাদের সঙ্গে এখন এদের গলায় গলায় ভাব।
বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে বেশ কিছু মুসলমানকে মৃত্যুদন্ডও দিয়েছেন সুলতান। কিন্তু একে তিনি খৃষ্টানদের-ই সাফল্য বলে মনে করছেন। তাঁর মতে যাদের তিনি মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন, নিঃসন্দেহে তারা ঈমান বিক্রয়কারী গাদ্দার। কিন্তু ছিল তো তারা কালেমা-গো মুসলমান। এ প্রসঙ্গ তুলে সুলতান আইউবী বহুবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, হায়! এরা যদি শত্রু-মিত্র চিনতে পারত!
.
শোবক দুর্গ এখন সুলতান আইউবীর পদানত। দুর্গের পাঁচিলে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। সঙ্গে তার সামরিক উপদেষ্টাবৃন্দ। সুলতান দেখতে পান, শহরের মুসলিম অধিবাসীরা দলে দলে উল্লাস করছে। আল্লাহু আকবার তাকবীর ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলছে তারা। আনন্দচিত্তে এগিয়ে আসছে দুর্গের দিকে। পাশাপাশি উটের পিঠে করে শহীদদের লাশ ও আহত সৈন্যদেরকে নিয়ে আসা হচ্ছে। একদিকে বিজয়ী জনতার উল্লাস। অপরদিকে ইসলাম ও মুসলমানের বিজয়ের জন্য জীবন দানকারী শহীদদের লাশ! গভীর ভাবনায় নিজেকে হারিয়ে ফেলেন সুলতান।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর একান্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ তাঁর রোজনামচায় লিখেছেন
