তিন খৃষ্টান গোয়েন্দাকে আমি কেন মুক্তি দিলাম, রক্ষীর প্রহরায় তাদের শোবক পৌঁছানোর ব্যবস্থা-ই বা কেন করলাম, এ প্রশ্ন তোমাদের ভাবিয়ে তুলেছে জানি। এখন শোন তার রহস্য।
গোয়েন্দাদের পাশের কক্ষে বসিয়ে মাঝের দরজা ঈষৎ ফাঁক করে রেখে আমি উচ্চকণ্ঠে আলী বিন সুফিয়ান ও দু নায়েবকে বলতে শুরু করেছিলাম, অমুক তারিখে আমি কার্ক আক্রমণ করব। আমি জানতাম, আমার কথাগুলো সব গোয়েন্দাদের কানে যাচ্ছে। আমি একথাও তাদের কানে দিয়েছি যে, খৃষ্টানদের সঙ্গে খোলা মাঠে লড়তে আমাদের ভয় হয়।
এসব কথা কানে দিয়ে মুক্ত করে দিয়েছিলাম খৃষ্টান গোয়েন্দাদের। চারজন রক্ষী দিয়ে তাদের নিরাপদে শোবক পৌঁছার ব্যবস্থাও করেছিলাম। সংবাদ পেয়েছি, শোবক যাওয়ার পথে তারা এক দুর্ঘটনার শিকার হয়। কতিপয় ডাকাত আমার তিনজন রক্ষী ও একটি গোয়েন্দা মেয়েকে হত্যা করে ফেলেছে। চতুর্থ রক্ষী গতকাল রাতে শোবক থেকে ফিরে এসেছে। গোয়েন্দা মারফত আমি জানতে পেরেছি যে, আলেম গোয়েন্দা জীবিত শোবক পৌঁছুতে সমর্থ হয়েছে। সে আমার কার্ক আক্রমণের পরিকল্পনার কথা খৃষ্টান কর্মকর্তাদের অবহিত করার কৌশল সফল করেছে। আমি যেভাবে চেয়েছিলাম, খৃষ্টানরা সেভাবেই তাদের বাহিনীকে ছড়িয়ে দিয়েছে। এ মুহূর্তে আমাদের বাহিনীর বাম অংশের অবস্থান খৃষ্টানদের বিশাল এক বাহিনীর বাম দিকে বার মাইল দূরে।
বাহিনীর বাম অংশের কমাণ্ডারকে উদ্দেশ করে সুলতান বললেন, আজ সূর্যাস্তের পরপর তুমি তোমার সকল অশ্বারোহী বাহিনীকে সোজা দু মাইল সম্মুখে নিয়ে যাবে। সেখান থেকে মোড় নেবে বায়ে। যাবে আরো সোজা চার মাইল। তারপর আবার বাঁয়ে মোড়। দুমাইল অগ্রসর হওয়ার পর দেখবে শত্রু বাহিনী আরাম করছে। তীব্র গতিতে কমান্ডো আক্রমণ চালাবে তাদের উপর। অল্প সময়ে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করবে। সামনে যা পাবে, পায়ে পিষে দ্রুত ফিরে আসবে আগের জায়গায়।
বাহিনীর দ্বিতীয় অংশ সোজাসুজি সম্মুখে এগিয়ে যাবে। আট ন মাইল পথ অতিক্রম করবে। শত্রু বাহিনীর রসদ ও কাফেলা চোখে পড়বে। তখন থাকবে তোমরা দুশমনের পিছনে। দিনের বেলা শত্রু বাহিনী তোমাদের বাম অংশকে ধাওয়া করবে। মুখোমুখি সংঘাতে লিপ্ত হবে না। দিনের বেলা সরে আসবে অনেক পিছনে।
আক্রমণ করবে রাতে। আক্রমণের পর থামবে না একদন্ডও, সরে আসবে পিছনে। সম্মুখে অগ্রসর হবে খৃস্টান বাহিনী। তখন মাঝের অংশ পিছন থেকে তাদের উপর আক্রমণ করবে। নিজেদের সামলে নিয়ে তারা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে।
বাহিনীর তৃতীয় অংশকে নিয়ে আমি আজ রাতেই রওনা হব। আগামীকাল দুপুর পর্যন্ত আমরা শোবক অবরোধ সম্পন্ন করে ফেলব। বাহিনীর অপর দুই অংশ আমার শেখানো নিয়মে শত্রু বাহিনীকে মরুভূমিতে অস্থির করে রাখবে। তাদের কাছে রসদ পৌঁছতে দেবে না। সুযোগমত পানির ঝর্ণাগুলো দখল করে নেবে। আক্রমণ করবে সবসময় শক্রর বাম পার্শ্ব থেকে। আক্রমণের পর লড়াই করার জন্য বিলম্ব করবে না। অতর্কিত কমান্ডো আক্রমণ করেই চোখের পলকে কেটে পড়বে। সুইসাইড স্কোয়াড প্রতিরাতে অগ্নিগোলা নিক্ষেপ করবে দুশমনের পশুপালের উপর।
.
১৯৭১ সাল। বছরের ঠিক শেষ দিন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর কার্কের লোকেরা জানতে পায় যে, শোবকের মত তাদের শক্ত দুর্গ সুলতান আইউবী অবরোধ করে ফেলেছেন। অথচ, তাদের বেশীর ভাগ সৈন্যকে সমবেত করা হয়েছে কার্কে, পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে মরুভূমিতে। এসে তারা শোবককে সাহায্যও করতে পারছে না। মুসলিম বাহিনী মরুভূমির সৈন্যদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে ফিরছে। সামনে এসে মুখোমুখি লড়াই করছে না মুসলিম বাহিনী। গেরিলা ও কমান্ডো আক্রমণ করে তারা সীমাহীন ক্ষতি করছে খৃষ্টানদের। তারা খৃষ্টানদের রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। পানির ঝর্ণাগুলোও এখন তাদের দখলে।
হারিয়ে গেছে খৃষ্টান বাহিনীর মনোবল। উভয় সংকটে পড়ে গেছে তারা। না পারছে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে, না পারছে পিছনে সরে গিয়ে শোবক রক্ষা করতে। তারা দু চোখে শোচনীয় পরাজয় ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছে না।
শোবক দুর্গ অবরোধ করেছেন সুলতান আইউবী। দুর্গ ও নগরীর পাঁচিলে দাঁড়িয়ে তীর ও বর্শা ছুঁড়ে মুসলিম বাহিনীর মোকাবেলা করে স্বল্পসংখ্যক খৃষ্টান সৈন্য। বেশিক্ষণ টিকতে পারে না তারা। দুর্গের প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলে আইউবীর বাহিনী। প্রায় দেড় মাস অবরোধ করে রাখার পর দুর্গে প্রবেশ করেন সুলতান। সর্বাগ্রে ছুটে যান বেগার ক্যাম্পে। সিজদায় লুটিয়ে পড়ে ক্যাম্পের হাড্ডিসার মুসলিম বন্দীরা।
মরুভূমির খৃষ্টান সৈন্যরা দিশে হারিয়ে পিছনে সরে গিয়ে ঢুকে পড়ে কার্ক দুর্গে। ওখানে বিপুলসংখ্যক সৈন্য বেকার বসে বসে সুলতান আইউবীর আক্রমণের অপেক্ষায় প্রহর গুণছে।
২.২ আইওনা নয় আয়েশা
আইওনা নয় আয়েশা
১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারী মাস।
শোবক দুর্গ মুসলমানদের পদানত হলেও শহরে এখনো শান্তি-শৃংখলা ফিরে আসেনি। খৃষ্টান পরিবারগুলো শহর ছেড়ে পালাবার চেষ্টা করছে। পালিয়ে গেছেও কেউ কেউ। শোবকের মুসলমানদের উপর তারা যে নির্মম অত্যাচার চালিয়েছিল, তার-ই প্রতিশোধ আশংকায় তারা তটস্থ। কৃতকর্মের প্রতিশোধ হিসেবে মুসলমানরা তাদের বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেবে, এই ভয় তাদের তাড়া করে ফিরছে। তারা যখন দুর্গ থেকে পলায়নপর খৃষ্টান বাহিনীকে সুলতান আইউবীর তীরান্দাজ বাহিনীর তীরের আঘাতে জীবন দিতে এবং অস্ত্র সমর্পণ করতে দেখেছিল, তখন প্রতিশোধ অভিযানের ভয়ে তারা পরিবার-পরিজনসহ ঘর-বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে শুরু করেছিল।
