অশ্বারোহী অফিসার চলে গেছে বহু দূর। তীরগতিতে এগিয়ে চলছে তার ঘোড়া। চোখের নিমিষে হারিয়ে যায় বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে।
***
কিছুদুর অগ্রসর হয়ে থেমে যান হরমুন। অশ্বারোহী অফিসারের নাগাল পাওয়ার সাধ্য নেই তার। ঘোড়ার মোড় ঘুরিয়ে ফিরে আসেন। ফটক পেরিয়ে দ্রুত ঢুকে পড়েন দুর্গের ভিতরে। ছুটে যান বেগার ক্যাম্পে। হাদীদের লক্ষণ বলে ইনচার্জকে জিজ্ঞেস করেন, লোকটি কোথায়? কিছুই বলতে পারে না ইনজার্চ। হাদীদকে পাওয়া গেল না ক্যাম্পে। যে তাঁবুতে তাকে রাখা হয়েছিল, তার অধিবাসীরা জানায়, লোকটি একদিন সকালে অনুপস্থিত ছিল। আমরা মনে করেছিলাম, আশেপাশে কোথাও আছে; কিন্তু আর ফিরে আসেনি।
হরমুনের সন্দেহ দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত হয়। খৃষ্টান সৈন্যের উর্দি পরিহিত যে লোকটিকে তিনি ঘোড়ায় চড়ে ফটক পেরিয়ে যেতে দেখেছিলেন, সে হাদীদ-ই ছিল। আরো কিছু খোঁজখবর নিয়ে লুজিনার কক্ষে যান হরমুন।
মাথায় হাত চেপে কক্ষে নতমুখে বসে আছে লুজিনা। কোন ভূমিকা ছাড়াই গর্জে উঠেন হরমুন
তুই কি ভাগিয়েছিস্ লোকটাকে মিথ্যা বলে রেহাই পাবি না। তদন্ত করে আমি প্রমাণ করে ছাড়ব যে, তুই ওর পলায়নে সাহায্য করেছি।
ধীরে ধীরে মাথা উঠায় লুজিনা। অপলক নেত্রে তাকিয়ে থাকে হরমুনের প্রতি। হরমুনের দুচোখে আগুন। প্রবল ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তিনিও তাকিয়ে আছেন লুজিনার প্রতি।
মুখ খুলে লুজিনা-
আপনার তদন্তের প্রয়োজন নেই। আমার মিথ্যে বলারও আবশ্যক নেই। আমার জীবনটাই এক রাজকীয় মিথ্যা। আমার অস্তিত্ব চোখ ধাঁধানো এক প্রতারণা। নিজের আত্মার মুক্তির জন্য সত্য বলেই আমি মৃত্যুবরণ করছি।
লুজিনার কণ্ঠস্বরে নেশার ভাব। আস্তে আস্তে বেড়ে চলেছে তা। বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় সে। পা দুটো কাঁপছে তার। নিকটে-ই পড়ে আছে একটি গ্লাস। তাতে কয়েক ফোঁটা পানি। কম্পিত হাতে গ্লাসটি তুলে নিয়ে হরমুনের প্রতি এগিয়ে ধরে ক্ষীণ কণ্ঠে বলে
আমি নিজেই আমাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছি। এ গ্লাসের অবশিষ্ট কয়েক ফোঁটা পানি ই তার সাক্ষী। আমার এই অপবিত্র দেহটাকে মৃত্যুদণ্ড আমি এজন্য দেইনি যে, আমি জাতির সঙ্গে গাদ্দারী করেছি। বরং কারণ হল, আমি সেসব লোকদের ধোকা দিতে গিয়েছিলাম, যারা ধোকা-প্রতারণা বলতে কিছু বুঝে না। তাদের চারটি লোক আমার ইজ্জত রক্ষা করার জন্য- যা লুণ্ঠিত হয়েছে আগেই- দশজন দস্যুর মোকাবেলা করেছে। সবশেষে একজন নিজের দেহকে ক্ষত-বিক্ষত করে আমাকে ডাকাতদের হাত থেকে ছিনিয়ে এনেছে। এখন আমি ভাল-মন্দ ও ভালবাসা-ঘৃণার পার্থক্য বুঝি। আমি সত্য কথা বলেই মৃত্যুবরণ করছি। এ এক শান্তিময় মৃত্যু।
দুচোখ অন্ধকার হয়ে আসে লুজিনার। কাঁপতে কাঁপতে পড়ে যেতে শুরু করে সে। হাত থেকে গ্লাসটা সরিয়ে নিয়ে তাকে ধরে ফেলেন হরমুন। গায়ে বল নেই। তবু এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় হরমুনের বাহুবন্ধন থেকে। মাটিতে পড়ে যায় লুজিনা। শুয়ে শুয়ে অস্ফুট স্বরে বলে জীবনের শেষ কথাগুলো-।
আমাকে ছুঁয়ো না হরমুন। এখন আর আমি তোমাদের কোন কাজে আসব না। আমার মধ্যে সত্যের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে এ বিষ; তোমাদের প্রয়োজন অপবিত্র নারী দেহ। ওকে আমি-ই ভাগিয়েছি। লুকিয়ে রেখেছিলাম বিশ দিন। ফার্নান্ডেজের উর্দি চুরি করে ওকে পরিয়েছি আমি। আমি-ই ওকে ঘোড়া দিয়েছি। আমি ওর সঙ্গে যেতে পারিনি, ওকে ছাড়াও থাকতে পারছিলাম না। তাই বিষপান করেছি। তুমি যদি আমায় না-ও দেখে ফেলতে, তবু এ বিষপান আমি করতাম-ই। সত্য বলে মৃত্যুবরণ করাকে কত যে শান্তি, কত যে আনন্দ, এ মুহূর্তে আমি তা গভীরভাবে উপলব্ধি করছি।
.
ঝিমিয়ে পড়ে লুজিনা। সোজা হয়ে যায় তার বিষাক্ত দেহ। বুজে আসে দুচোখের। পাতা। মৃত্যুর কোলে ঘুমিয়ে পড়ে সে চিরদিনের জন্য।
গোয়েন্দা প্রধান হরমুন হতবুদ্ধির ন্যায় পলকহীন নেত্রে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে লুজিনার মৃত দেহটার প্রতি। বারবার প্রতিধ্বনিত হয়ে তার কানে বাজতে থাকে লুজিনার জীবনের শেষ বাক্যটি
সত্য বলে মৃত্যুবরণ করায় কত যে শান্তি, কত যে আনন্দ, এ মুহূর্তে আমি তা গভীরভাবে উপলব্ধি করছি।
শেষকৃত্য সম্পন্ন হল লুজিনার। আপন বলতে কেউ নেই তার। বাবা-মা, ভাই বোন, আত্মীয় কেউ নয়। ছোটকালে এক কাফেলা থেকে তাকে তুলে আনা হয়েছিল। তখন বয়স তার দশ কি এগার বছর। তাই কাউকে তার মৃত্যু সংবাদ পৌঁছানোর ঝামেলা পোহাতে হল না অফিসারদের।
***
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বাহিনী অভিযানে রওনা হয়েছে তিনদিন হল। তাদের প্রতিহত করার জন্য পথে অবস্থান নিয়েছে খৃষ্টান বাহিনী। আইউবীর ঘোষণা অনুযায়ী হামলা হবে কার্কে। তাই শোবকের অধিকাংশ সৈন্য এখন কার্কেই অবস্থান করছে। সিরিয়া অভিমুখেও রওনা হয়ে গেছে একটি বাহিনী। উদ্দেশ্য, নুরুদ্দীন জঙ্গী আইউবীর সাহায্যে এগিয়ে আসলে তাকে প্রতিহত করা।
নিজের বাহিনীকে তিন ভাগে বিভক্ত করে নিয়েছেন আইউবী। পরস্পর দূরত্ব বজায় রেখে অগ্রসর হচ্ছে তার তিন বাহিনী। একস্থানে এসে শিবির স্থাপন করেন সুলতান। অধীন সব কমাণ্ডারকে তলব করেন নিজের তাঁবুতে। বললেন
এবার আমার মনের গোপন কথা প্রকাশ করতে হচ্ছে। আমি ঘোষণা দিয়েছিলাম, আক্রমণ হবে কার্কে। কিন্তু তোমাদের নিয়ে এসেছি অন্য পথে। বিষয়টা তোমাদের মনে খটকা লাগছে নিশ্চয়। কিন্তু শোন, আমি কার্ক আক্রমণ করব না। লক্ষ্য আমার শোবক দুর্গ।
