লোকটি হাদীদ। ছায়ামূর্তিটি লুজিনা। হাদীদের অপেক্ষায় পরিকল্পনা মোতাবেক খেজুর তলায় দাঁড়িয়ে আছে সে।
দ্রুত হাঁটতে পারবে? জিজ্ঞেস করে লুজিনা।
চেষ্টা করব। জবাব দেয় হাদীদ।
ক্যাম্প থেকে বেশ দূরে চলে যায় দুজন। সামনে বিস্তীর্ণ অনাবাদী ভূমি। দ্রুত হাঁটতে পারছে না হাদীদ। তাকে ধরে দ্রুত নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে লুজিনা। এ ফাঁকে ইতিমধ্যে কি কি ঘটেছে, গোয়েন্দা প্রধান কি বলেছে, হাদীদের ব্যাপারে কি কি নির্দেশ জারী হয়েছে, সব খুলে বলে লুজিনা। মনের সন্দেহ দূর হয়ে যায় হাদীদের। লুজিনার প্রতি আস্থা ফিরে আসে তার।
আরো কিছুদূর অগ্রসর হয়ে তারা শহরের একটি গলিতে ঢুকে পড়ে। এ গলিতেই ডাক্তারের বাড়ি। ডাক্তারের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে যায় লুজিনা। বাড়ির দরজায় করাঘাত করে তিন-চারবার। দরজা খুলে ডাক্তার দ্রুত ভিতরে নিয়ে যায় দুজনকে।
ডাক্তার হাদীদের জখম খুলে নিরীক্ষা করে দেখে। বলে, রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হতে বিশদিনের মত সময় লাগবে।
শুনে ভাবনায় পড়ে যায় লুজিনা। এ এক নতুন সমস্যা। এতদিন হাদীদকে কোথায় লুকিয়ে রাখবে? বেগার ক্যাম্পে তো আর ফেরত পাঠান যাবে না। চিন্তার সাগরে ডুবে যায় লুজিনা। অবশেষে ভেবে-চিন্তে সমাধান একটা ঠিক করে রাখে মাথায়।
হাদীদের জখমে ব্যান্ডেজ করে ডাক্তার বলে, রোগীকে ভাল ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে।
লুজিনা ডাক্তারকে নিভৃতে নিয়ে যায়। বলে, লোকটি যেখানে থাকে, সেখানে তার পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা হবে না। আমার ঘরেও রাখতে পারছি না। আপনি তাকে এখানেই রেখে দিন। আপনি-ই তার উপযুক্ত খাবার-পথ্যের ব্যবস্থা করুন। খরচ ও পারিশ্রমিক যা চান, দেব।
খরচ-পারিশ্রমিকের পরিমাণ জানায় ডাক্তার। বিশাল অংক। আপত্তি জানায় লুজিনা। কিছু কমাবার অনুরোধ করে। ডাক্তার বলে, আমাকে দিয়ে তুমি ভয়ংকর এক কাজ করাচ্ছ। আমি জানি, এ লোকটিকে বেগার ক্যাম্প থেকে আনা হয়েছে। লোকটি মিসরী ফৌজের সিপাহী। আমি যে অংক চেয়েছি, আপত্তি না করে যদি তা ই প্রদান কর, তাহলে এ তথ্য আমার ঘরের বাইরে যাবে না।
ঠিক আছে, তা-ই দেব। তবে! যদি ঘুণাক্ষরে এ তথ্য ফাঁস হয়ে পড়ে, তবে আপনিও বাঁচবেন না। বলে লুজিনা।
ডাক্তার হাদীদকে একটি কক্ষে শুইয়ে দিয়ে বলে, সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া পর্যন্ত তুমি এখানেই থাকবে। ভিতর থেকে দুধ ও ফল এনে খেতে দেয় হাদীদকে। তারপর লুজিনাকে নিয়ে চলে যায় তার কক্ষে …।
পরদিন লুজিনা ও তার বান্ধবী গোয়েন্দাগিরি করতে যায় ক্যাম্পে। তারা কয়েদী রোগীদের ডাক্তারখানায় প্রহরীদের সঙ্গে গল্প করে। কথার ফাঁকে তারা তথ্য সংগ্রহ করে যে, হাদীদের পালানোর কারণে ক্যাম্পে কোন পরিবর্তন আসেনি। টের পায়নি কেউ এ ঘটনা।
ডাক্তার অতি গোপনীয়তার সাথে হাদীদের চিকিৎসা করছে। পুষ্টিকর খাদ্য খাবারও দিয়ে যাচ্ছে নিয়মিত। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর ডাক্তারের বাসায় আসে লুজিনা। হাদীদের শিয়রে বসে কাটায় কিছু সময়। তারপর ডাক্তারের কক্ষে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করে চলে যায়। এভাবে চলে যায় বিশদিন। হাদীদের জখমও শুকিয়ে গেছে। সে এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। লুজিনা ডাক্তারকে বলে, কাল রাত এসে আমি হাদীদকে নিয়ে যাব। আপনার পাওনাও তখন পরিশোধ করব।
নিম্নপদের এক অফিসার আসক্ত ছিল লুজিনার বান্ধবীর প্রতি। সময় পেলেই ঘুরঘুর করত সে মেয়েটির পিছনে। এ সুযোগ কাজে লাগায় লুজিনা।
পরদিন প্রেমের প্রলোভন দেখিয়ে লুজিনার বান্ধবী অফিসারকে কক্ষ থেকে বের করে নিয়ে যায়। এ ফাঁকে লুজিনা বাক্স থেকে তার সামরিক উর্দি চুরি করে নিয়ে আসে। ডাক্তারের বাসায় গিয়ে আগে তার পাওনা পরিশোধ করে। তারপর হাদীদকে অফিসারের সামরিক পোষাক পরায়। ঘোড়ার ব্যবস্থাও হয়ে যায় অনায়াসে।
.
নগরীর চারিদিক উঁচু দেয়ালে ঘেরা। চারদিকে চারটি ফটক। ফটকগুলো বন্ধ থাকে দিন-রাত সব সময়। কিন্তু সম্প্রতি সুলতান আইউবীর আক্রমণ প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে যে সামরিক তৎপরতা চলছে, তার কারণে ফটকগুলো দিনের বেলা খোলা থাকছে।
সূর্যাস্তের খানিক আগে এক অশ্বারোহী ছুটে আসে দুর্গের প্রধান ফটকের দিকে। গায়ে খৃষ্টান সেনা অফিসারের সামরিক উর্দি। কোমরে ঝুলছে একটি তরবারী। তরবারীটি মুসলমানদের তরবারীর ন্যায় বাঁকা নয়- সোজা। সব মিলিয়ে তাকে খৃষ্টান সেনা অফিসার মনে না করে উপায় নেই।
ফটক খোলা। বের হচ্ছে রসদ বোঝাই উটের বহর। অশ্বারোহী অফিসার উটের বহরের সঙ্গে যাচ্ছে যেন।
ফটকের নিকটে চলে আসে আরোহী। ঠিক এ সময়ে গোয়েন্দা প্রধান হরমুন ঘোড়ার পিঠে করে প্রবেশ করেন ফটকে। বাইরে কোথাও গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরছেন তিনি। অশ্বারোহী অফিসারের প্রতি তার দৃষ্টি পড়ে। তিনি মুচকি হাসেন। কিন্তু হাসি দিয়ে হাসির জবাব দেয় না অফিসার। কয়েক পা ভিতরে ঢুকে ঘোড়া থামান হরমুন। দু তিন শ কদম দূরে দাঁড়িয়ে আছে দেখতে পায় লুজিনাকে। হরমুনকে দেখেই দ্রুত কেটে পড়ে লুজিনা। চলে যায় নিজ কক্ষে।
আলী বিন সুফিয়ানের ন্যায় হরমুনও অত্যন্ত বিচক্ষণ গুপ্তচর। মনে বড় একটা খটকা জাগে তার। তিনি সন্দেহে পড়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়ার মোড় ঘুরিয়ে দেন ফটকের দিকে। বিদ্যুতিতে ঘোড়া ছুটান। মনের সন্দেহ দূর করতে চাইছেন তিনি।
