লুজিনা চারটি স্বর্ণমুদ্রা গুঁজে দেয় ডাক্তারের হাতে। ডাক্তার যুবতীর হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে হাসিমুখে বলে, তোমার চেয়ে মূল্যবান বিনিময় আর হতে পারে না। বিশেষ ভঙ্গিতে স্মিত হাসি বেরিয়ে আসে লুজিনার দু রাঙা ঠোঁটের ফাঁক বেয়ে। বলে, আপনি যা চাইবেন, তা-ই দেব; আগে আমার কাজ করুন।
ডাক্তার বুঝে ফেলল, বিষয়টি বিপজ্জনক ও রহস্যময়। কিন্তু লুজিনার রূপের ফাঁদে আটকে গিয়ে এ বিপদের ঝুঁকি মেনে নেয় সে। বলল, রোগী নিয়ে এস। আজ রাত, কাল রাত যেদিন ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা এস। এসে আমাকে ঘুমে পেলেও জাগিয়ে দিও।
ডাক্তার এক হাতে সোনার মুদ্রা আর অপর হাতে লুজিনার পেলব-কোমল হাতখানা মুঠি করে ধরে অপলক নেত্রে লুজিনার মুখপানে তাকিয়ে থাকে।
***
হাদীদকে ক্যাম্প থেকে বের করে আনাটা-ই এ অভিযানের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও বিপজ্জনক কাজ। রাতে ক্যাম্পে নামমাত্র পাহারা থাকে বটে, কিন্তু ক্যাম্পে এসে হাদীদকে খুঁজে বের করে আনা লুজিনার পক্ষে ষোল আনাই ঝুঁকিপূর্ণ। ধরা পড়লে মৃত্যুদন্ড অনিবার্য।
ক্যাম্প সম্পর্কে কিছু তথ্য সংগ্রহ করে লুজিনার বান্ধবী। যেমন যখমী ও রুগ্ন কয়েদীদের প্রতিদিন অতি সাধারণ একটি ডাক্তারখানায় হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের সঙ্গে থাকে মাত্র একজন প্রহরী।
পরদিন বান্ধবীর সঙ্গে লুজিনা সেই ডাক্তারখানার সামনে এসে দাঁড়ায়। তাদের বেশী অপেক্ষা করতে হল না। পঁচিশ-ত্রিশজন রোগীর একটি দল পা টেনে টেনে অতি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে এদিকে। লাঠি হাতে তাদের পশুপালের ন্যায় হাঁকিয়ে নিয়ে আসছে একজন প্রহরী। যারা দ্রুত হাঁটতে পারছে না, তাদের লাঠির দ্বারা ঠেলে ঠেলে নিয়ে আসছে সে।
চোখে-মুখে কৌতূহলী ভাব নিয়ে সামনে অগ্রসর হয় মেয়ে দুটো, যেন তারা তামাশা দেখছে। রোগীর দলটি তাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করতে শুরু করলে লুজিনার সন্ধানী দৃষ্টিতে খুটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করে সবাইকে। দলের মধ্যে হাদীদকে খুঁজছে সে।
হঠাৎ চমকে উঠে লুজিনা। দলের মধ্য থেকে একজন লোক প্রবল ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে চোখ লাল করে তাকিয়ে আছে তার প্রতি। ভালভাবে হাঁটতে পারছে না সে। লোকটি হাদীদ। পান্ডুর চেহারা। আহত হওয়ার আগে লুজিনা তার চেহারায় যে জৌলুস দেখেছিল, এখন আর তা নেই। পোষাকে শুকিয়ে যাওয়া লাল চটচটে রক্তের দাগ।
দেখে কান্না আসে লুজিনার। ঝর ঝর করে দু চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে বেদনার অশ্রু। কিন্তু হাদীদের দৃষ্টিতে ঘৃণার ভাব। লুজিনার উপর থেকে চোখ সরিয়ে নেয় সে।
আরো সম্মুখে এগিয়ে যায় রোগীর দলটি। প্রহরীর সঙ্গে আলাপ জুড়ে দেয় লুজিনা ও তার বান্ধবী। এই মুসলমান রোগীদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে তারা। কথার যাদু দিয়ে প্রহরীকে পটিয়ে ফেলে দু যুবতী। বলে, কথা বলে এদের সঙ্গে আমাদের একটু তামাশা করতে মন চাইছে।
ডাক্তারখানায় আগে থেকেই রোগীর প্রচন্ড ভীড়। কয়েদীদের বসিয়ে দেয়া হল একদিকে। লুজিনা তাদের ঘনিষ্ঠ হয়। প্রহরীর সঙ্গে মিষ্টি-মধুর গল্প জুড়ে দেয় বান্ধবী। দায়িত্বের কথা ভুলে গিয়ে মেয়েটির সঙ্গে আলাপে মেতে উঠে প্রহরী।
দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে বসে পড়ে হাদীদ। অবস্থা তার ভাল নয়। চোখের ইশারায় তাকে আড়ালে আসতে বলে লুজিনা। লুজিনার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় হাদীদ। লুজিনা ক্ষীণ কণ্ঠে তাকে বলে, আমার প্রতি নির্দেশ, আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারব না। আমি যে এখন তোমার সঙ্গে কথা বলছি, এ কথা কাউকে বুঝতে দেয়া যাবে না।
তোমার উপর আর যারা তোমাকে আমার সঙ্গে দেখা করতে নিষেধ করেছে, তাদের উপর আল্লাহর লানত। কোন প্রতিদানের লোভে আমি তোমাকে ডাকাতদের হাত থেকে রক্ষা করিনি। তোমাকে রক্ষা করে আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি মাত্র। কিন্তু কর্তব্যপরায়ণ লোকদের সঙ্গে এরূপ ব্যবহার করাই কি তোমাদের চরিত্র? ক্ষীণ অথচ ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলল হাদীদ।
চুপ কর হাদীদ! এসব কথা পরে হবে। আগে বল রাতে তুমি থাক কোথায়? আজ রাতেই তোমাকে বের করে আনতে হবে। ফিসফিসিয়ে বলল লুজিনা।
হাদীদ লুজিনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছিল না। লুজিনাকে তার বিশ্বাস হচ্ছিল না। কিন্তু লুজিনা চোখের অশ্রু দিয়ে মায়াবী কণ্ঠে হাদীদের মনে এ বিশ্বাস জন্মাতে সক্ষম হয় যে, তার সঙ্গে সে প্রতারণা করছে না। সত্যিই সে তাকে উদ্ধার করতে চায়।
আশ্বস্ত হয়ে হাদীদ বলল, রাতে যেখানে থাকি, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে না। কিন্তু বেরিয়ে এসে যাব কোথায়? মুহূর্ত মধ্যে পালানোর একটা পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলে দুজনে।
***
বেগার ক্যাম্পে মড়ার মত ঘুমিয়ে আছে কয়েদীরা। প্রহরীও গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। এখান থেকে কেউ পালায়নি কখনো। পালিয়ে যাবেই বা কোথায়? নরক হলেও এটাই তাদের বাসস্থান। তাছাড়া এক আধজন পালালেও কৈফিয়ত চায় না কেউ। তাই নিশ্চিন্তে ঘুমুতে পারে প্রহরীরা।
রাতের প্রথম প্রহর শেষ প্রায়। পুরনো জীর্ণ এক তাবু থেকে এক ব্যক্তি বেরিয়ে আসে। হামাগুড়ি দিয়ে তাবুর আড়ালে আড়ালে অতি সন্তর্পণে চলে আসে প্রহরীদের আওতার বাইরে। অন্ধকার সত্ত্বেও সম্মুখে চোখে পড়ে একটি খেজুর গাছ। সেখানেই তার পৌঁছানোর কথা। খেজুর তলায় দাঁড়িয়ে আছে আপাদমস্তক মোটা কাপড়ে ঢাকা এক ছায়ামূর্তি। হামাগুড়ি থেকে উঠে দাঁড়ায় লোকটি। পায়ে হেঁটে খেজুর তলায় এসে পৌঁছে সে।
