শোবক থেকে কার্ক এবং মিসরের সীমান্ত পর্যন্ত ক্রুসেডারদের আয়োজনের পরিধি। এ অঞ্চলের সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছে তারা তাদের সেনাবাহিনী। এ বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে তারা সুলতান আইউবীর জন্য ফাঁদ হিসেবে গড়ে তুলেছে। এ ফাঁদে একবার আটকা পড়লে জীবনেও উদ্ধার পাবে না আইউবী। সুলতান আইউবীর সে পরিকল্পনার-ই আলোকে চলছে তাদের প্রস্তুতি, যা সময়ের আগেই তাদের গোচরে এসে গেছে। মনে মনে আত্মতৃপ্তিতে বিভোর খৃষ্টান রাষ্ট্রনায়ক ও সেনাপতিগণ।
এই ব্যাপক সামরিক প্রস্তুতির ফাঁকে শোবকে চলছে অন্য এক গোপন তৎপরতা। তার সম্পর্ক যুদ্ধের সঙ্গে নয়- হৃদয়ের সঙ্গে।
লুজিনা নির্লিপ্ত পড়ে আছে তার কক্ষে। বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে সে হাদীদের জন্য। হাদীদের অমঙ্গল-আশংকায় উথালপাথাল করছে তার মন।
লুজিনার বান্ধবী দুদিন ধরে ঘুরে ফিরছে হাদীদের সন্ধানে। হাদীদ অফিসারদের হাসপাতালে নেই। নেই সাধারণ সৈনিকদের হাসপাতালেও।
পদস্থ গুপ্তচর হওয়ার সুবাদে বড় বড় অফিসারদের কাছে তার অবাধ যাতায়াত। সকলে তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে। এ সুযোগকে কাজে লাগায় সে। লুজিনার সঙ্গে যে আহত মুসলিম ফৌজি এসেছিল, এখন সে কোথায়? একে একে ছোট-বড় সব অফিসারকে জিজ্ঞেস করে লুজিনার বান্ধবী। কিন্তু প্রত্যেকের একই জবাব, কই এমন কাউকে তো আমি দেখিনি।
তৃতীয় দিন এক অফিসার তাকে সাবধানতার সাথে জানায়, লুজিনার সঙ্গে আসা আহত মুসলিম ফৌজিকে ব্যান্ডেজ করে মুসলিম ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
.
শোবকের মুসলিম ক্যাম্প এক ভয়ংকর স্থান। মুসলিম যুদ্ধবন্দী আর বিজিত অঞ্চল থেকে ধরে আনা নিরপরাধ বেসামরিক মুসলমানদের রাখা হয় এ ক্যাম্পে। লুণ্ঠিত কাফেলার মুসলমানদের ধরে এনেও এ ক্যাম্পে নিক্ষেপ করে খৃষ্টানরা। বেগার ক্যাম্প নামে পরিচিত এ ক্যাম্প।
এটি কোন কারাগার নয়। এখানে কড়া প্রহরার ব্যবস্থা নেই। যাদেরকে এখানে রাখা হয়, তাদের নিয়মিত কোন রেকর্ডও রাখা হয় না। পশুর মত আচরণ করা হয় এখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে। কোথাও প্রয়োজন হলে এখান থেকে পছন্দমত লোকদের ভেড়া-বকরীর মত হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে। গাধার মত খাটান হয় তাদের। খাবার দেয়া হয় সামান্য; বেঁচে থাকতে যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকু। থাকে তারা তাঁবুতে। যারা সাধারণ রোগে আক্রান্ত হয়, কেবল তাদের-ই চিকিৎসা করা হয়। রোগ বেড়ে গেলে মেরে ফেলা হয় বিষ খাইয়ে। এ অমানুষিক নির্যাতন সেলে নিক্ষিপ্ত বিপুলসংখ্যক মুসলমানের একমাত্র অপরাধ, তারা মুসলমান। গুপ্তচর মারফত সুলতান আইউবী অবহিত ছিলেন সোবকের এই বেগার ক্যাম্প সম্পর্কে।
হাদীদকেও পাঠিয়ে দেয়া হয় এ ক্যাম্পে। বান্ধবীর মুখে এ সংবাদ শুনে শিউরে উঠে লুজিনা। ধক্ করে জ্বলে উঠে তার হৃদয়। বেগার ক্যাম্পের পুরো চিত্র ফুটে উঠে তার চোখের সামনে।
হাদীদের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি নেই লুজিনার। গোয়েন্দা প্রধান হরমুন কঠোরভাবে নিষেধ করে দিয়েছে তাকে। একজন মুসলিম ফৌজির প্রতি এতটুকু আবেগপ্রবণ হওয়ার শাস্তির কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু সে নিষেধাজ্ঞা মেনে নেয়নি লুজিনা। হাদীদ বেগার ক্যাম্পে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে, বান্ধবীর মুখে এ সংবাদ শুনে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে লুজিনা। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বান্ধবীকে বলে, যে করে হোক, আমি ওকে মুক্ত করব-ই। তুমি আমায় সাহায্য কর বোন! সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয় বান্ধবী। পরিকল্পনা প্রস্তুত করে দুজনে মিলে।
লুজিনা তৎক্ষণাৎ ছুটে যায় শহরে। সাক্ষাৎ করে এক প্রাইভেট ডাক্তারের সঙ্গে। বলে, একজন আহত রোগী আছে, আপনাকে তার চিকিৎসা করতে হবে। কিন্তু বিষয়টা সম্পূর্ণ গোপন রাখতে হবে। এ ব্যাপারে কাউকে কিছু বলা যাবে না।
গোপনীয়তার কারণ জানতে চায় ডাক্তার।
লোকটি একজন গরীব মুসলমান। সে আমার পরিবারের বহু উপকার করেছে। এক জায়গায় ঝগড়া-ঝাটি করে এখন সে আহত। অর্থ-কড়ি নেই বলে কোন ডাক্তার তার চিকিৎসা করছে না। এখানকার সব ডাক্তার-ই যে খৃষ্টান। বিনা পয়সায় একজন মুসলমানের তারা চিকিৎসা করবে-ই বা কেন!
তাছাড়া ঝগড়া-ঝাটি করে একজন মুসলমান আহত হয়েছে, প্রশাসন এ খবর পেলে নিশ্চিত তাকে বেগার ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেবে। গোপনীয়তা রক্ষা করার এ-ও এক কারণ। লোকটি আমার পরিবারের যে উপকার করেছে, আমি তার প্রতিদান দিতে চাই। আমি তাকে রাতের বেলা নিয়ে আসব। বলুন, আপনাকে কত দিতে হবে? গোপনীয়তা রক্ষা করার পুরস্কারও আমি আপনাকে দেব। বলল লুজিনা।
ডাক্তারের কাছে নিজেকে এক দ্র পরিবারের মেয়ে বলে পরিচয় দেয় লুজিনা। নিজের আসল পরিচয় গোপন রাখে সে।
কথার ফাঁকে ডাক্তার আপাদমস্তক এক নজর দেখে নেয় লুজিনার। যুবতীর অস্বাভাবিক রূপে বিমোহিত হয়ে পড়ে ডাক্তার। পারিশ্রমিকের কথা মুখে আনার ভাষা, হারিয়ে যায় তার। রূপের চেয়ে বড় মূল্যবান বস্তু আর কি হতে পারে, তা খুঁজে পাচ্ছে না সে।
ডাক্তারের দৃষ্টির অর্থ বুঝে ফেলে লুজিনা। ডাক্তার যে তার রূপের জালে আটকা পড়েছে, তা বুঝতে আর বাকি রইল না তার। লুজিনা এ জগতের অভিজ্ঞ মেয়ে। নিজের যোগ্যতা কাজে লাগায় সে। মোমের মত গলে যায় ডাক্তার।
