লোকটির জন্য তুমি বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছ লুজি!
হ্যাঁ। হরমুনের সামনে আমি আমার আবেগ প্রকাশ করতে পারিনি। কিন্তু তোমার কাছে তো আমি মনের সব কথা খুলে বলতে পারি। তুমি আমার বান্ধবী। আমার-ই মত একজন নারী। নারীর হৃদয় বহন কর তুমি। আচ্ছা বল তো, আমাদের জীবনটা কি? আমরা সুদর্শন খঞ্জর। মধুর বিষ। আমাদের দেহ ব্যবহৃত হয় পুরুষের বিনোদ সামগ্রী আর প্রতারণার ফাঁদ হিসেবে। এ-ই কি আমাদের জীবনের মূল্য? এমন কথা আমি আগে কখনো ভাবিনি। আমার মধ্যে কোন আবেগ-আসক্তি আছে বলেও মনে করিনি কখনো। কিন্তু এ লোকটির দেহের পরশ আমার ঘুমন্ত সব আবেগ-স্পৃহা জাগিয়ে তুলেছে। আমি এখন নিজেকে যুগপৎ মা-বোন-কন্যা এবং একজন পুরুষপ্রার্থী নারী বলে কল্পনা করছি। আবেগঝরা কণ্ঠে বলল লুজিনা।
এক নাগাড়ে এতগুলো কথা বলার পরও বলা শেষ হয় না লুজিনার। আবার বলতে শুরু করে সে
আমাকে সন্ত্রাসের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। আমি নাশকতামূলক কাজে এত দক্ষতা অর্জন করেছি যে, আমি যে কোন স্বৈরশাসককে আঙ্গুলের উপর নাচাতে পারি। কিন্তু ডাকাতরা আমাকে বিক্রয়ের পণ্যে পরিণত করেছে। আমাকে তারা এমন এক স্তরে নামিয়ে এনেছে, যেখানে আমার মত মেয়েরা প্রতি রাতে নিত্য নতুন খদ্দেরের হাতে বিক্রি যায় কিংবা কোন মুসলমান আমীর বা শাসকের হেরেমের দাসীতে পরিণত হয়। হাদীদ আমাকে সেখান থেকে উপরে তুলে এনেছে। ডাকাতদের হাতে পড়ার আগে আমি তার বন্দীনী ছিলাম। ইচ্ছে করলে সে আমাকে তার বিনোদ উপকরণে পরিণত করতে পারত। কিন্তু তা সে করেনি। তারপর যখন লোকটি আমার ইজ্জত রক্ষা করার জন্য নিজের দেহকে ক্ষত-বিক্ষত করল, তখন আমি নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি; জড়িয়ে নিই তাকে নিজের বুকের সঙ্গে।
সালাহুদ্দীন আইউবীর একটি কথা আমার মনে পড়ে যায়। তিনি আমায় বলেছিলেন, তুমি কোন সম্ভ্রান্ত পুরুষের স্ত্রী হয়ে মর্যাদার সাথে জীবন কাটাতে পার না? তখন লোকটিকে আমার কাছে বোকা মনে হয়েছিল। মনে মনে বলেছিলাম, নিতান্ত বেওকুফ ছাড়া এমন কথা বলে নাকি কেউ! কিন্তু এখন অনুভব করছি, তিনি কত মূল্যবান কথা বলেছিলেন।
শোন সখী! আমি তোমায় পরিষ্কার বলে দিচ্ছি, গুপ্তচরবৃত্তি করা আর আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। শৈশব থেকে যে প্রশিক্ষণ আমাকে দেয়া হয়েছিল, তার সব আমি হারিয়ে ফেলেছি। মরুভূমির সেই ভয়ানক রাত, দস্যুর ভয় আর হাদীদের দেহের উষ্ণ পরশ ও তার রক্তের ঘ্রাণ আমার ভিতর থেকে সব বিদ্যা ধুয়ে মুছে ছাফ করে দিয়েছে।
লুজিনার অবলীলায় বলে যাওয়া কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনে তার বান্ধবী। লুজিনা থামলে এবার মুখ খুলে সে। বলে
এতগুলো কথা না বললেও তমার মনের অবস্থা বুঝতে আমার অসুবিধা হত না। কিন্তু বাস্তবকে তো আর অস্বীকার করা যায় না লুজি! যার জন্য তোমার এত ব্যাকুলতা, এখান থেকে একদিন তাকে চলে যেতেই হবে। আর তুমিও পারবে না তার সঙ্গে যেতে। এ সময়ে যদি সে এখানে কষ্টেও থাকে, তবু উপরের নিষেধাজ্ঞার কারণে তুমি তো তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারছ না। চেষ্টা করতে পার, কিন্তু ধরা পড়লে তোমার সঙ্গে তাকেও জীবন হারাতে হবে। অতএব, এসব চিন্তা ত্যাগ করে তুমি শান্ত হও।
তুমি আমাকে একটু সাহায্য কর বোন! এতটুকু খবর নাও যে, লোকটি কোথায় আছে। হাদীদ সুস্থ হয়ে আপন গন্তব্যে চলে গেছে, এটুকু জানতে পারলেই আমার মন শান্তি পাবে। এটুকু উপকার তুমি আমার কর বোন! মিনতির সুরে বলল লুজিনা।
ঠিক আছে, এ কাজ আমি করতে পারব। তুমি শান্ত হও। কক্ষে চলে যাও, আরাম কর। বলল বান্ধবী।
লুজিনা তার কক্ষে চলে যায়। বান্ধবী চলে যায় অন্যদিকে।
***
কায়রোতে চলছে ব্যাপক সেনা তৎপরতা। সৈন্যদের সামরিক মহড়া চলছে। অতর্কিত আক্রমণ, অল্প কজনে দুশমনের বিপুল সৈন্যের উপর হামলা চালিয়ে শত্রুর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে কমান্ডো বাহিনী। আক্রমণ করে চোখের পলকে হাওয়া হয়ে যাওয়ার ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে তাদের। রাতের বেলাও ছাউনিতে অবস্থান নেয়ার সময় পাচ্ছে না তারা; থাকতে হচ্ছে ছাউনির বাইরে।
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী নিজে মহড়ার তদারকি করছেন। তিন-চার দিন পরপর তিনি উচ্চপদস্ত অফিসার ও গ্রুপ কমান্ডারদের উদ্দেশে বক্তৃতা করছেন এবং মানচিত্রের সাহায্যে তাদের রণকৌশল শিক্ষা দিচ্ছেন।
তার এ প্রশিক্ষণের মূলনীতি হল, স্বল্পসংখ্যক সৈন্যের পক্ষে দুশমনের ব্যাপক ক্ষতিসাধন, অস্ত্রের চেয়ে বুদ্ধিকে বেশী কাজে লাগান, মুখোমুখি লড়াই এড়িয়ে চলা, সমুখ থেকে হামলা না করা, দিনে একশত সৈন্য মুখোমুখি লড়াই করে দুশমনের যে পরিমাণ ক্ষতি করতে পারে, রাতে দশ-বারজনের কমান্ডো আক্রমণে তার চেয়ে বেশী সাফল্য অর্জন করা। তাছাড়া দুশমনের দুর্গ কিংবা শহর দীর্ঘ সময় অবরোধ করে রাখার পদ্ধতি এবং দুর্গের প্রাচীর ভাঙ্গার নিয়মও শিক্ষা দেন সুলতান। দুর্বল ও বয়স্ক উট, ঘোড়া ও খচ্চরগুলো আলাদা করে ফেলেন তিনি। আক্রমণের দিন ক্ষণ ঠিক হয়ে আছে আগেই।
.
সুলতান আইউবী ফিলিস্তীন জয়ের যে পরিকল্পনা স্থির করেছেন, তার প্রথম অভিযানে সাফল্যের সঙ্গে ফিলিস্তীন প্রবেশ করার তৎপরতা চলছে জোরেশোরে। অপরদিকে আইউবীকে পথেই প্রতিহত করার আয়োজন করছে খৃষ্টান বাহিনী। প্রস্তুতি দেখে মনে হচ্ছিল, দু পক্ষ-ই একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে চিরদিনের জন্য।
