মাত্র একটি মেয়ে এ তৎপরতায় সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত। লুজিনা। যে হাদীদকে সঙ্গে করে শোবকে নিয়ে এসেছিল, সেই মেয়ে।
গত রাতে সভাকক্ষ থেকে যখন সে ছুটি পায়, তখন মধ্য রাত। গোয়েন্দা বিভাগের বিশেষ শাখার গুরুত্বপূর্ণ সদস্যা বলে পূর্বেকার অভিযানের রিপোর্ট পেশ করতে হয়েছে তাকে রাতভর।
দীর্ঘ পথ অশ্ব চালনার ক্লান্তি ও অনিদ্রায় এখন অসাড় হয়ে পড়েছে তার দেহ। একজন অফিসার তাকে বলেছিল, তোমার আহত মুসলিম ফৌজিকে ডাক্তারের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে। ওর জন্য তোমার এত অস্থির হওয়া ঠিক হচ্ছে না। এরূপ আবেগ-প্রবণতা তোমার কর্তব্যের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
গোয়েন্দা প্রধান হরমুন লুজিনাকে বলেছিল, এ রাতে না হলে কনরাড এবং গাই অফ লুজিনান এর মত সম্রাট- যারা কাউকে ক্ষমা করতে জানেন না তোমাকে বন্দীশালায় নিক্ষেপ করতেন। তোমার মুসলিম রক্ষীর যা করার করা হয়েছে। তোমার জন্য নির্দেশ, তার সঙ্গে তুমি সাক্ষাৎ করতে পারবে না।
কেন? আমি কি তার কৃতজ্ঞতাও আদায় করতে পারব না? বিস্ময় ও নিরাশার সুরে বলল লুজিনা।
না। কারণ সে দুশমনের ফৌজি। তুমি যে বিভাগে চাকুরী কর, জান তো তা কি? আমি তোমাকে ওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার অনুমতি দিতে পারি না। তোমার বিদ্যা ও কর্তব্যের দাবীও তা-ই। আমি এ-ও লক্ষ্য করছি যে, তার প্রতি তুমি আসক্ত হয়ে পড়েছ। এটা ভাল লক্ষণ নয়। শত্রুর সঙ্গে এমন সম্পর্ক স্থাপনের অনুমতি দেয়া যায় না লুজিনা। হরমুনের কণ্ঠে দৃঢ়তা।
আপনি আমাকে শুধু এতটুকু নিশ্চয়তা দিন যে, তার ক্ষতে ব্যান্ডেজ করা হয়েছে আর নিরাপদে তাকে ফেরত পাঠান হবে। বলল লুজিনা।
লুজিনা! আমি তোমাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, তোমার এ আকাংখা পূরণ করা হবে। আর শোন, তুমি বড় কঠিন ভয়ানক মিশন থেকে ফিরে এসেছ, তোমার সফরও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। তোমাকে দশদিনের ছুটি দেয়া হল। পরিপূর্ণ বিশ্রাম নাও। ঝঝ মেশানো কণ্ঠে বলল হরমুন।
.
রাতে এসব কথাবার্তার পর লুজিনা তার কক্ষে চলে যায়। গোয়েন্দা মেয়েদের আবাস হাইকমাণ্ড থেকে অনেক দূরে। কিন্তু লুজিনার মত উচ্চ পর্যায়ের গোয়েন্দা মেয়েরা থাকে বেশ উন্নত কক্ষে, রাজকীয় হালে। রাজকন্যাদের ন্যায় সুযোগ সুবিধা ও বিলাস উপকরণ পায় তারা। দায়িত্ব তাদের যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, সুযোগ সুবিধা তেমনি উন্নত।
কক্ষে গিয়েই বিছানায় গা এলিয়ে দেয় লুজিনা। মুহূর্ত মধ্যে দু চোখের পাতা বুজে আসে তার। গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ে সে।
পরদিন বেশ বেলা হলে চোখ খোলে লুজিনার। কিন্তু বিছানা থেকে শরীর টেনে তুলতে পারছে না সে। ভেঙ্গে আসছে তার সারা শরীর। উঠে বসার শক্তিটুকুও পাচ্ছে না সে।
বেশ কিছুক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি খেয়ে অবশেষে উঠে দাঁড়ায় লুজিনা। নাস্তা করে বাইরে বের হওয়ার প্রস্তুতি নেয়। ইতিমধ্যে পাশের কক্ষের মেয়েরা এসে কায়রোর কারগুজারী শুনতে চায় তার কাছে। কথা বলতে মন চাচ্ছে না লুজিনার। সংক্ষেপে দু চারটা কথা শুনিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পরে হবে বলে হাসপাতাল অভিমুখে ছুটে যায়।
***
একটু এগুতেই এক বান্ধবীর সঙ্গে দেখা হয় লুজিনার। গোয়েন্দা বিভাগেই চাকুরী করে মেয়েটি। লুজিনার সহকর্মী। দুজনের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। নিজের মনের কথা অপরজনের কাছে গোপন রাখে না দুজনের কেউ।
মুখোমুখি হয় দু বান্ধবী। কিছুক্ষণ মুখপানে তাকিয়ে থেকে লুজিনার বান্ধবী জিজ্ঞেস করে, যাচ্ছ কোথায়, লুজি? তোমাকে খুব অস্থির মনে হচ্ছে। কোন অঘটন ঘটেছে, নাকি দীর্ঘ সফরের ক্লান্তির কারণে এমনটি হল? ছুটি পাওনি বুঝি?
ছুটি পেয়েছি বটে, তবে বিশেষ একটি ঘটনা আমাকে অস্থির করে তুলেছে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল লুজিনা।
বান্ধবীর হাত ধরে একটি গাছের ছায়ায় গিয়ে বসে লুজিনা। বান্ধবীকে ঘটনা বিস্তারিত শুনিয়ে মনের বোঝা হালকা করার চেষ্টা করে। অফিসাররা তাকে যে ধমক দিয়েছে, বান্ধবীকে তাও শুনিয়ে লুজিনা বলল, আমি হাদীদকে এক নজর দেখতে চাই। আমার আশংকা, ওর কোন চিকিৎসা হয়নি এবং ওকে নির্দয়ভাবে নগর থেকে বের করে দেয়া হয়েছে কিংবা মৃত্যুর জন্য কোন এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকে রাখা হয়েছে।
তুমি বললে, তোমাকে না ওর সঙ্গে দেখা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। অফিসারদের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এ ঝুঁকি নিওনা বোন! ধরা পড়লে জান তো শাস্তি কি! লুজিনাকে নিরস্ত হওয়ার পরামর্শ দেয় বান্ধবী।
লোকটির জন্য মৃত্যুদন্ডও মাথা পেতে নিতে আমি প্রস্তুত। আমার খাতিরে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করেছে সে, তা তোমাকে বলেছি। ডাকাতদের হাতে আমার জীবনের কোন ভয় ছিল না। আমাকে ওরা তুলে নিয়ে যেত। কিছুদিন ভোগ করে নষ্ট করে কোন আমীরের হাতে বিক্রি করে দিত। হাদীদ আমার এই পরিণতির কথা জানত। আমার ইজ্জতের খাতিরে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সে ডাকাতদের সঙ্গে লড়াই করেছে। ডাকাতরা তাকে বলেছিল পর্যন্ত, মেয়েটিকে আমাদের হাতে তুলে দাও, আর তুমি নিজে নিরাপদে চলে যাও। হাদীদ এ-ও তো জানত যে, আমি পবিত্র মেয়ে নই। কিন্তু তারপরও তার বিবেচনায় আমি ছিলাম তার আমানত। এ আমানতকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশী মূল্য দিয়েছে সে।
