পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ শুরু করার নির্দেশ জারী করা হয়। সবাই ভীষণ আনন্দিত। এই প্রথমবার তারা সময়মত সুলতান আইউবীর গোপন পরিকল্পনার কথা জানতে পারল। অন্যথায় সবসময়ই তিনি ক্রুসেডারদের ফাঁকি দিয়ে-ই অভিযান পরিচালনা করে থাকেন।
খৃষ্টান সেনাপতিগণ বিস্ময় প্রকাশ করে বলে যে, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ন্যায় দূরদর্শী সিপাহসালারের থেকে এই পদস্খলন ঘটল, যে শত্ৰু গোয়েন্দাদের তিনি মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাদেরকে পাশের কক্ষে বসিয়ে উচ্চস্বরে এমন একটি নাজুক বিষয় নিয়ে কথা বললেন! সেনাপ্রধান তার ফ্রান্সের সৈন্যদের কাছেও এ পয়গাম প্রেরণ করে যে, অমুক দিনের আগেই তোমরা এমন জায়গায় পৌঁছে যাবে, যেখানে নুরুদ্দীন জঙ্গীর বিশেষ বাহিনীকে প্রতিরোধ করা যায়।
এ সময়ে কক্ষে প্রবেশ করে এক খৃষ্টান অফিসার। গোয়েন্দা প্রধানের কানে কানে কি যেন বলে। গোয়েন্দা প্রধান সকলকে জানায়, ডাকাতের হাতে আক্রান্ত মেয়ে– দুটোর একজন এইমাত্র এসে পৌঁছেছে। সাথে তার এক আহত মুসলিম রক্ষীসেনা।
আলেম গোয়েন্দা সকলের আগে কক্ষ থেকে বেরিয়ে পড়ে। তার পিছনে অন্যরাও বাইরে আসে। আহত হাদীদকে বারান্দায় শুইয়ে রেখে তার মাথার কাছে বসে আছে মেয়েটি। দীর্ঘ ভ্রমণের ফলে পট্টি-ব্যান্ডেজ খুলে গিয়ে ক্ষতস্থান থেকে আবার রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে হাদীদের। বিছানায় অচেতন পড়ে আছে সে।
খৃষ্টান সেনাপতিদের কেউ হাদীদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করল না। কারণ, তাদেরকে আগেই বলা হয়েছিল যে, ডাকাতদের আক্রমণ ছিল সাজানো নাটক। আইউবী-ই এ আক্রমণের মূল নায়ক।
আলেম গোয়েন্দা মেয়েটির হাত ধরে তাকে কক্ষের ভিতরে চলে আসতে বলে। খৃষ্টানদের বড় মূল্যবান মেয়ে ও। কিন্তু হাদীদের ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ-চিকিৎসা না হওয়া পর্যন্ত এখান থেকে এক চুল নড়বে না বলে জানিয়ে দেয় সে।
গোয়েন্দা প্রধান হরমুন মেয়েটিকে আড়ালে ডেকে নিয়ে কানে কানে বলে, কোন্ সাপের বাচ্চাকে তুমি ব্যান্ডেজ করাতে চাইছ? ভাগ্য প্রসন্ন ছিল বলেই না তুমি জীবন নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছ। অন্যথায় এরা তো তোমাদেরকে ডাকাতরূপী হায়েনাদের হাতে তুলে দিতেই চাইছিল!
এ তথ্য মিথ্যা। প্রথমে আমারও এ সন্দেহ ছিল। এ লোকটি আমার মনের সব সন্দেহ মুছে দিয়েছে। দু ডাকাতকে খুন করে সে আমার জীবন রক্ষা করেছে। কাঁদ কাঁদ কণ্ঠে বলল মেয়েটি।
মেয়েটি হরমুনকে সব ঘটনা খুলে বলে। শেষে একথাও জানায় যে, লোকটি আমাকে বারবার বলছিল, আমাকে এখানে মরতে দাও আর তুমি শোবক চলে যাও।
খৃষ্টানদের চোখে মুসলমান মানেই এক চরম ঘৃণ্য জাতি। মুসলমান হওয়ার কারণে হাদীদও ঘৃণার পাত্র। তাই এতগুলো অফিসার-সেনাপতির মধ্যে একজনও বলল না যে, লোকটির চিকিৎসার ব্যবস্থা কর।
জিদ ধরে বসে আছে মেয়েটি। অবশেষে একজন অফিসার বলল, লোকটিকে কক্ষে নিয়ে গিয়ে ব্যান্ডেজ করার ব্যবস্থা কর।
হাদীদকে তুলে কক্ষে নিয়ে যাওয়া হল। মেয়েটি চাপের মুখে অফিসারদের সঙ্গে চলে গেল।
মেয়েকে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করল অফিসাররা। তার জীবিত ফিরে আসার কাহিনী জানতে চায় তারা। সব ঘটনা খুলে বলে সে।
মেয়ের জন্য খাদ্য ও শরাব এসে যায়। আহার সেরে নিতে বলে অফিসাররা।
জখমীকে খাইয়ে থাকলেই তবে আমি খাব। অন্যথায় আমি খাবার স্পর্শ করব না। আমি তাকে একটু দেখে আসি। বলেই মেয়েটি উঠে দাঁড়ায়।
থাম লুজিনা! এই দ্বিতীয়বার ক্রুশের সামরিক নীতির বিরুদ্ধাচারণ করছ তুমি! প্রথমবার তোমাকে কক্ষে প্রবেশ করতে বলা হয়েছিল আর তুমি সেই নির্দেশ অমান্য করে বলেছিলে, আগে জখমীকে ব্যান্ডেজ করা হোক, তারপর আমি কক্ষে যাব। এবার তুমি বিনা অনুমতিতে অভদ্রের ন্যায় বাইরে যেতে পা বাড়িয়েছ! তোমার সম্মুখে যারা উপবিষ্ট, তারা সবাই খৃষ্টান বাহিনীর পদস্থ অফিসার। দুজন সম্রাটও বসা আছেন এখানে। জান, তোমার এ অপরাধের শাস্তি কি? দশ বছরের কারাদন্ড। আর যেহেতু তুমি এ আইন লংঘন করছ শত্রু বাহিনীর একজন সাধারণ সৈনিকের খাতিরে, তাই আমরা তোমাকে মৃত্যুদন্ডের শাস্তিও দিতে পারি। অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলল গোয়েন্দা প্রধান হরমুন।
যে লোকটি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একজন অভিজ্ঞ খৃষ্টান গোয়েন্দা মেয়ের জীবন রক্ষা করল, খৃষ্টান সম্রাট ও সেনাপতিগণ কি তাকে এর কোন প্রতিদান দেবেন না? আমি জানি, ও আমাদের শত্রু শিবিরের একজন সেনা কমান্ডার। কিন্তু আমি তাকে দুশমন ভাবব তখন, যখন সে নিজ বাহিনীতে ফিরে যাবে। বলল লুজিনা।
শত্রু সর্বাবস্থায় এবং সব জায়গায়-ই শত্রু। ফিলিস্তীনে কজন মুসলমানকে আমরা জীবিত থাকতে দিয়েছি? কেনই বা আমরা তাদের বংশধারা নিঃশেষ করছি? কারণ, ওরা আমাদের শত্রু, আমাদের ধর্মের দুশমন। ক্রুশ ছাড়া আর কোন প্রতীক আমরা পৃথিবীতে রাখব না। আমাদের কাছে একজন আহত মুসলমানের কোনই মূল্য নেই। বস তুমি! চীৎকার করে বলল এক কমান্ডার।
লুজিনা বসে পড়ে। বেদনার অশ্রুতে দু চোখ ঝাপসা হয়ে আসে তার।
***
পরদিন সকাল থেকে সোবকে নতুন এক তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। এ তৎপরতা সামরিক। শোবকের বেসামরিক জনগণ আপন আপন কাজে লিপ্ত। এ তৎপরতার সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। দুর্গ থেকে সারি সারি সৈন্য বের হচ্ছে। সামান-পত্র এদিক-ওদিক করা হচ্ছে। বহিরাগত সৈন্যদের সাময়িক তাঁবুর জন্য জায়গা খালি করা হচ্ছে। রসদ পরিবহনের জন্য উটের বহর দাঁড়িয়ে আছে। সেনা হেডকোয়ার্টারেও তৎপরতার অন্ত নেই। সালাহুদ্দীন আইউবীর আক্রমণ প্রতিহত করার লক্ষ্যে গতরাতে যে পরিকল্পনা ঠিক করা হয়েছিল, তারই অংশ হিসেবে এ ব্যস্ততা। অফিসারদেরও এক দন্ড দাঁড়াবার ফোরসত নেই। উঁচু পর্যায়ের কয়েকজন অফিসার রওনা হয়ে গেছে কার্ক অভিমুখে।
