তন্দ্রা পায় হাদীদের। ঝিমিয়ে পড়ে সে। এগিয়ে চলছে ঘোড়া। বেশ কিছু পথ অতিক্রম করার পর চোখ খুলে হাদীদ। সূর্য তখন মাথার উপরে উঠে এসেছে। হাদীদ বলে, ঘোড়ার গতি বাড়াও। আশা করি, সূর্যাস্তের পরপর আমরা শোবক পৌঁছে যেতে পারব।
ঘোড়ার গতি বাড়ায় মেয়ে। তীব্রগতিতে পিছনে সরে যাচ্ছে মরুপ্রান্তর।
***
সূর্য ডুবে গেছে। শোবকের সভাকক্ষে খৃষ্টান সম্রাট ও কমান্ডারগণ উপবিষ্ট। আলেম গোয়েন্দাও তথায় উপস্থিত। কর্মকর্তাদের নিকট রিপোর্ট পেশ করছে সে।
মেয়ে দুটোর পরিণতি কি হয়েছে, তা আমি বলতে পারছি না। ওদের রক্ষা করা তো দূরে থাক, আমি ওদেরকে এক নজর দেখে আসারও চেষ্টা করিনি। কারণ, মিসর থেকে আমি যে তথ্য নিয়ে এসেছি, তা মেয়ে দুটোর চেয়েও বহু বহু মূল্যবান। আপনাদের নিকট সে তথ্য পৌঁছানোর জন্য ডাকাতদের আক্রমণ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক সুযোগে ঘোড়ায় চড়ে আমি পালিয়ে এসেছি। আইউবীর বন্দীদশা থেকে মুক্তি পাওয়া ছিল আমার এক বিস্ময়কর ঘটনা। তাই ডাকাতদের রক্তক্ষয়ী হামলা থেকে আমি নিরাপদে সরে এলাম, কেউ-ই আমাকে ধাওয়া পর্যন্ত করল না।
আমার মনে হয়, ওরা আসলে দস্যু নয়। আইউবী-ই দস্যুবেশে ওদেরকে আমাদের উপর লেলিয়ে দিয়েছেন। ঘটনাটি একটি সাজানো নাটক। সালাহুদ্দীন আইউবী আমাদের তিনজনকে মৃত্যুদন্ড কেন যে দিলেন না, কেন যে মেয়েদের নষ্ট করার জন্য তিনি এই পন্থা অবলম্বন করলেন, আমার তা মাথায় ধরছে না। মেয়েগুলো এখন বোধ হয় ওদের আয়ত্ত্বে চলে গেছে এবং অমানুষিক নির্যাতন ভোগ করছে! বলল আলেম গোয়েন্দা।
ওদের মুক্তির কথা ভাববার সময় আমাদের নেই। দুটো মেয়ে হারিয়েছি, তাতে তেমন কিছু হয়নি। বৃহত্তর স্বার্থে এরূপ ত্যাগ দিতেই হয়। আমাদের কাছে মেয়ের অভাব নেই। এ পদ্ধতি আমাদের সফল। এই ধারা চালু রাখার জন্য আরো মেয়ে প্রস্তুত কর। সভাসদদের সকলেই এসে গেছেন, এবার বলুন, আপনি কী তথ্য নিয়ে এসেছেন। বলল এক কর্মকর্তা।
কায়রোর এক মসজিদে সালাহুদ্দীন আইউবী ও আলী বিন সুফিয়ানের হাতে কিভাবে বন্দী হল, কয়েদখানায় তার ও মেয়েদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হল এবং সুলতান আইউবী কিভাবে তাদের অপ্রত্যাশিতভাবে মুক্তি দিলেন, আলেম গোয়েন্দা সভাসদদের সামনে সব বিবরণ তুলে ধরে। এ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আইউবী তাকে কিভাবে দিলেন, তাও শোনায়। দিন-তারিখ উল্লেখ করে আলেম গোয়েন্দা জানায়, সালাহুদ্দীন আইউবী এ-দিন কার্ক আক্রমণের জন্য বাহিনী প্রেরণ করবেন। তার এ ঘোষণা শুনে এক সভাসদ বলল, কার্ক নয়- আগে আমাদের শোবক দখল করা প্রয়োজন। কারণ, কার্কের তুলনায় শোবক অধিক শক্তিশালী দুর্গ। কিন্তু আইউবী শোবকে তার শক্তি ব্যয় করতে চাইছেন না। দুর্বল মনে করে তিনি কার্ক দখল করতে চান আগে। তার কথা হল, আগে কার্ক দখল করে তাকে তিনি সৈন্য ও রসদ ইত্যাদির কেন্দ্র বানাবেন। পর্যাপ্ত রসদ সংগ্রহ করে বিশেষ ফোর্স তলব করবেন। তারপর সৈন্যদের কিছুদিন বিশ্রামের সুযোগ দিয়ে শোবকে হামলা চালাবেন।
তিনি আমাদের অজ্ঞাতে অতর্কিতে আক্রমণ চালাতে চান। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তার সৈন্য কম। পক্ষান্তরে আমাদের সৈন্যও বেশী এবং আমাদের ঘোড়াও তার ঘোড়া অপেক্ষা উন্নত। তাছাড়া আমাদের আছে বর্ম, আছে শিরস্ত্রাণ, যা তার নেই। তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, খৃষ্টান সৈন্যরা যদি আমাদেরকে পথেই প্রতিহত করে ফেলে, তাহলে পরাজয় ছাড়া আমাদের উপায় থাকবে না। তিনি খোলা মাঠে যুদ্ধ করতে ভয় পান।
সুলতান আইউবীর মুখ থেকে শোনা সব কথা আনুপুংখ বিবৃত করে আলেম গোয়েন্দা।
এমন মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও তার বিস্তারিত বিবরণ শুনে সবাই ভুলে গেল মেয়েদের কথা। এ বিষয়ে মত বিনিময় শুরু হল। দীর্ঘ আলোচনার পর সভা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, সুলতান আইউবী একজন অসাধারণ বিচক্ষণ যোদ্ধা। কার্ক আক্রমণের যে পরিকল্পনা তিনি প্রস্তুত করেছেন, তাতেই তার সামরিক দূরদর্শিতার প্রমাণ পাওয়া যায়। পথে লড়াই এড়িয়ে চলার সিদ্ধান্তও তার বিচক্ষণতার এক জ্বলন্ত প্রমাণ। আমাদের প্রতি যীশু খৃষ্টের অপার অনুগ্রহ আছে বলেই আমরা আগেভাগে এ পরিকল্পনার খবর পেয়ে গেছি। অন্যথায় আইউবী শুধু কার্ক-ই নয়- শোবকের মত শক্ত দুর্গের জন্যও আশংকার কারণ হয়ে দেখা দিত।
সালাহুদ্দীন আইউবীর পরিকল্পনা মোতাবেক তখনই তাদের সেনা তৎপরতা ও প্রতিরোধ আয়োজন শুরু হয়ে যায়। পরিকল্পনায় নিম্নরূপ সিদ্ধান্তগুলি গৃহীত হয়
সম্মিলিত খৃষ্টান বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড থাকবে শোবকে। রসদও থাকবে এখানে। শোবক থেকেই যুদ্ধ পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করা হবে। কার্ক দুর্গকে আরো দুর্ভেদ্য করে তোলা হবে। শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য কার্কে আরো কিছু সৈন্য পাঠান হবে।
আইউবীকে কার্ক থেকে দূরে তারই সীমান্তের ভিতরে কোন এক দুর্গম পার্বত্য এলাকায় প্রতিরোধ করা হবে। এ লক্ষ্যে বিপুলসংখ্যক সৈন্য প্রেরণ করা হবে। এই বাহিনীতে বেশী থাকবে অশ্বারোহী ও উজ্জ্বারোহী সৈন্য। আইউবীর বাহিনীকে অবরুদ্ধ করে ফেলার চেষ্টা করতে হবে। পানির ঝর্ণাগুলো কজা করতে হবে আগেই।
