শোবক কোন্ দিকে বলতে পারেন? হাদীদকে জিজ্ঞেস করে মেয়েটি।
হাদীদ মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকান। নক্ষত্র দেখে এবং একদিকে ইংগিত করে বলেন, ওদিকে চল।।
ঘোড়া ছুটায় মেয়ে। ধীর গতিতে এগিয়ে চলছে তিনটি ঘোড়া। খানিক অগ্রসর হওয়ার পর হাদীদ বললেন, আমি বোধ হয় বাঁচব না। ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছে। যেখানে আমার মৃত্যু হবে, সেখানেই আমাকে কবর দিও। আমার ব্যাপারে তোমার মনে কোন সন্দেহ থাকলে, তা মন থেকে দূর করে আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি আমানতে খেয়ানত করিনি। দুআ করি, আল্লাহ তোমাকে নিরাপদে জীবিত গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দিন।
এগিয়ে চলছে ঘোড়া। কেটে যাচ্ছে রাত।
***
পরদিন ভোর বেলা। মেয়েটির কাঁধে মাথা আর বুকে পিঠ ঠেকিয়ে অর্ধ-অচেতন অবস্থায় বসে আছেন হাদীদ। নিজেকে সচেতন রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন তিনি। তার জখমের রক্তক্ষরণ এখন বন্ধ। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অসাড় হয়ে পড়েছে তার দেহ।
ছোট্ট একটি খেজুর বাগানে এসে ঘোড়া থামায় মেয়েটি। হাদীদকে আলগোছে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামায়। পানি পান করায়। ঘোড়াগুলোর সঙ্গে বাঁধা ছিল কিছু খাবার। হাদীদকে খাওয়ায় সেগুলো। হাদীদের আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে যায়। মস্তিষ্ক পরিষ্কার হতে শুরু করে। হাদীদ ভাবেন, ছিলাম মেয়েটির রক্ষী, এখন হয়েছি তার বন্দী।
মেয়েটি শুইয়ে দেয় হাদীদকে। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর সুস্থতা অনুভব করে সে। ধীরে ধীরে চাঙ্গা হয়ে উঠে তার দেহ। মেয়েটিকে বলেন, শোবক আর বেশী দূরে নয়। বোধ হয় আর একদিনের পথ হবে। একটি ঘোড়া নিয়ে তুমি চলে যাও, আমি ফিরে যাই।
জীবন নিয়ে তুমি গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে না। এখান থেকেই যদি ফিরে যেতে হয়, তাহলে আমাকে সঙ্গে নিয়ে চল। তুমি যেমন আমাকে একাকী ফেলে আসনি, আমিও তোমাকে একলা ছেড়ে যাব না। বলল মেয়েটি।
আমি পুরুষ। একজন নারী আমাকে হেফাজত করবে, আমার মন তা মানছে না। তার চেয়ে বরং আমার মরে যাওয়াই শ্রেয়। বললেন হাদীদ।
যারা ঘরের চার দেয়ালে আবদ্ধ থাকে, যারা পুরুষের সহযোগিতা ছাড়া এক পা ও চলতে পারে না, আমি তেমন মেয়ে নই। আমাকে একজন সৈনিক-ই মনে কর। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, আমার অস্ত্র তীর-তরবারী নয়। আমার অস্ত্র হল, আমার রূপ যৌবন, আমার নারীত্ব, আমার বাকপটুতা। তোমার মত আমিও কষ্ট সহ্য করতে অভ্যস্ত। এখান থেকে পায়ে হেঁটে আমি শোবক যেতে পারি। বলল মেয়েটি।
আমি তোমার আবেগের মূল্যায়ন করি। দস্যুরা আমাদের দুজনকে পরস্পর কত কাছে এনে দিয়েছে! অথচ, আমরা একে অপরের দুশমন। তুমি আমার দেশের ভিত উপড়ে ফেলার চেষ্টা করছ, আর আমি একদিন তোমার দেশ আক্রমণের স্বপ্নে বিভোর। বললেন হাদীদ।
কিন্তু এ মুহূর্তে আমার বন্ধুত্ব বরণ করে নাও। দুশমনির কথা তখন ভাববে, যখন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে তুমি নিজের দেশে ফিরে যাবে। বলল মেয়ে।
মেয়েটি হাদীদের বাহু ধরে শোওয়া থেকে উঠিয়ে বসায়। হাদীদ নিজ শক্তিতে উঠে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে হেঁটে ঘোড়ার কাছে পৌঁছে সে। মেয়েটি ধরে হাদীদকে ঘোড়ার রেকাবে তুলে দেয়। ঘোড়ার পিঠে উঠিয়ে বসায় তাকে। হাদীদকে বসিয়ে মেয়েটি নিজেও একই ঘোড়ায় চড়তে চায়। বাধা দেন হাদীদ। বলেন, তুমি অন্য ঘোড়ায় উঠ। আমি এখন একাই চলতে পারব।
তবু আমি এ ঘোড়ায়-ই বসব। তোমাকে জড়িয়ে রাখব আমার গায়ের সাথে। দৃঢ়কণ্ঠে বলল মেয়ে।
হাদীদের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও মেয়েটি তার ঘোড়ার পিছনে চড়ে বসে। নিজের এক বাহু হাদীদের বুকে রেখে হাদীদকে নিজের গায়ের সাথে জড়িয়ে রাখার চেষ্টা করে। আপত্তি জানায় হাদীদ। বলে, আমাকে একটু নিজের শক্তিতে বসতে দাও।
হাদীদের আপত্তিতে কান দেয় না মেয়ে। জোর করে হাদীদকে নিজের বুকের সঙ্গে লাগিয়ে নেয় সে। নিজের কাঁধের উপর টেনে আনে হাদীদের মাথা। তারপর বলে, আমি জানি, খারাপ মেয়ে মনে করে তুমি আমার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছ।
না, খারাপ মেয়ে মনে করে নয়- শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে আমি তোমার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছি। দুটি রাত নিতান্ত অসহায় অবস্থায় তুমি আমার বন্দীনী ছিলে। ইচ্ছে করলে আমি তোমাকে দাসীর মত ব্যবহার করতে পারতাম। কিন্তু আমি শয়তানকে আমার উপর জয়ী হতে দেইনি। এখন আমার মনে হচ্ছে, যেন আমি আমানতে খেয়ানত করছি। আমার মধ্যে পাপবোধ জাগ্রত হচ্ছে।
তুমি পাথর তো আর নও। আমাকে যখনই যে পুরুষ দেখেছে, কামনার চোখেই দেখেছে। সামান্য মূল্যের বিনিময়ে আমি তোমার জাতির দুজন মুমিনের ঈমান কিনে নিয়ে এসেছি।
কত মূল্য? জিজ্ঞেস করে হাদীদ।
শুধু এতটুকু যে, তাদেরকে আমার কাছে বসতে দিয়েছি, আমার কাঁধে তাদের মাথা রেখেছি। জবাব দেয় মেয়ে।
ঈমান ছিল-ই না তাদের কাছে। বলল হাদীদ।
যতটুকু ছিল, তাই আমি নিয়ে এসেছি। তার স্থলে তাদের অন্তরে স্বজাতির বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা ঢুকিয়ে দিয়ে এসেছি।
তারা কারা? জানতে চায় হাদীদ।
এখন বলব না। তোমার অর্পিত দায়িত্বের প্রতি তুমি যেমন নিষ্ঠাবান, তেমনি আমার কর্তব্যও আমার কাছে ততটুকু প্রিয়। জবাব দেয় মেয়েটি।
কথা বলা বন্ধ করে হাদীদ। যুবতীর দেহের উষ্ণতা, হালকা ঘ্রাণ অনুভব করছে সে। তরুণীর উন্মুক্ত রেশম-কোশল চুল বাতাসে উড়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে হাদীদের গাল-মুখ।
