পলায়নপর ঘোড়ার বাগ এখন মেয়ের হাতে। ঘোড়া ডান-বাম করতে শুরু করে। গতিও কমে যায়। কাছে চলে আসেন হাদীদ।
হাদীদের হাতে বর্শা। পলায়নপর ঘোড়ার আরোহীর এক পার্শ্বে গিয়েই বর্শার আঘাত হানেন তিনি। এক দিকে সরে যায় ঘোড়া। আঘাত থেকে রক্ষা পায় আরোহী। বর্শা বিদ্ধ হয় ঘোড়ার গায়ে। ১
ঘোড়া থামিয়ে ঘুরে দাঁড়ান হাদীদ। অপর ঘোড়ার আরোহীও মোড় ঘোরাবার চেষ্টা করে। কিন্তু সম্মুখে বসা মেয়েটি ঘোড়ার লাগাম এদিক-ওদিক করে স্থির হতে দিচ্ছে না তার ঘোড়াকে।
মেয়েটিকে নিয়ে ঘোড়া থেকে লাফিয়ে পড়ে দস্যু। নিজের ঘোড়াকে ঢাল বানিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছে সে।
ঘোড়ায় বসেই আঘাত করার চেষ্টা করছেন হাদীদ। কিন্তু যে দিক থেকেই তিনি আঘাত করছেন, দস্যু মেয়েটিকে নিয়ে তার ঘোড়ার আড়াল হয়ে হাদীদের আঘাত থেকে রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে।
এবার ঘোড়া থেকে নেমে আসেন হাদীদ। পিছন থেকে ধেয়ে আসা আরোহীও এসে পড়ে ইতিমধ্যে। হাদীদের সঙ্গী নয় সে, দস্যু। সে-ও নেমে পড়ে ঘোড়া থেকে। যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে গর্জে ওঠেন হাদীদ। বলেন, আমার জীবন থাকতে তোমরা মেয়েটিকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না।
এক দস্যু মেয়েটিকে ঝাঁপটে ধরে রাখে। অপরজন যুদ্ধে লিপ্ত হয় হাদীদের সঙ্গে। মেয়ের কাছে এখন তরবারী নেই। মেয়েকে আটকে রাখা দস্যুও এবার হাদীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছেড়ে দেয় মেয়েটিকে।
হাদীদ মেয়েকে ডেকে বলে, ঘোড়ায় চড়ে তুমি শোবকের দিকে চলে যাও। আমি দস্যুদের তোমাকে ধাওয়া করতে দেব না। কিন্তু মেয়ে এক পা-ও নড়ছে না, ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সে।
দু দস্যুর মোকাবেলা করেন হাদীদ। দস্যুদ্বয় বারবার তাকে বলে, একটি মেয়ের জন্য নিজের জীবন বিপন্ন কর না। আমাদের পথ ছেড়ে তুমি জীবন নিয়ে সরে যাও। কিন্তু হাদীদের একই জবাব, আগে আমার জীবন নাও, পরে মেয়েকে নিও। আমার জীবন থাকতে তোমরা ওকে নিতে পারবে না।
হাদীদ মেয়েকে পুনরায় বলে, এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন তুমি? পালাও না কেন এখান থেকে! মেয়ে বলে, তোমাকে ছেড়ে আমি যেতে পারব না। জীবন দিতে হলে তুমি একা কেন, দুজনই দেব। আমার জন্য তুমি তোমার জীবন বিপন্ন করবে, আর আমি তোমাকে ছেড়ে পালিয়ে যাব, তা হতে পারে না।
.
দস্যুদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন হাদীদ। প্রতিপক্ষের আঘাতে আহত হয়ে পড়েন তিনি। যুদ্ধরত অবস্থায় হাদীদ পুনরায় মেয়েকে বলেন, আমি আহত হয়ে গেছি। আমার মৃত্যুর আগেই তুমি এখান থেকে জীবন-সম্ভ্রম নিয়ে পালিয়ে যাও। অনুরোধ, আর দাঁড়িয়ে থেক না। যাও বলছি, যাও।
মেয়ের দিকে ঘুরে দাঁড়ায় এক দস্যু। মওকা পেয়ে যান হাদীদ। তার পাজরে বর্শা ঢুকিয়ে দেন তিনি। কিন্তু এ সময়ে অপর দস্যুর তরবারী হাদীদের কাঁধে আঘাত হানে। হাদীদের আঘাত খাওয়া দস্যু লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। মেয়েটি দৌড়ে গিয়ে তার তরবারীটি নিয়ে নেয় এবং পিছন থেকে এসে এক ঘা মারে দস্যুর পিঠে। নিজেকে সামলে নিয়ে পাল্টা আক্রমণ করতে চায় সে। এ সময়ে হাদীদের বর্শা এসে বিদ্ধ হয় তার বুকে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে দস্যুর অসাড় দেহ। চিরতরে নিস্তব্ধ হয়ে যায় সে-ও।
হাদীদও আহত। ক্ষত তার মারাত্মক। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না। পড়ে যাচ্ছেন তিনি। মেয়েটি ধরে দাঁড় করিয়ে রাখে তাঁকে।
কাঁপা কণ্ঠে হাদীদ মেয়েকে বলে, তুমি আমায় ছেড়ে দাও। ঘোড়ায় চড়ে এক্ষুণি শোবক অভিমুখে রওনা হও। শোবক এখান থেকে বেশী দূরে নয়; তুমি একাই যেতে পারবে। সঙ্গীদের দিকে যেও না। ওখানে বোধ হয় একজনও জীবিত নেই। যাও, আল্লাহ তোমায় নিরাপদে পৌঁছিয়ে দিন।
আপনার জখম কোথায় কোথায়, দেখি? বলল মেয়েটি।
আমায় মরতে দাও মেয়ে! আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে তুমি রওনা হও। আল্লাহর দিকে চেয়ে আমার দায়িত্বটা তুমি নিজেই পালন করে নাও। তোমাকে শোবক পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয়া ছিল আমার দায়িত্ব। কিন্তু আমি আর বাঁচব না। অপর কোন দস্যু-তস্কর এদিকে এসে পড়তে পারে। তার আগেই তুমি এ স্থান ত্যাগ কর।
হাদীদের ব্যাপারে মেয়ের মনে এখন আর কোন সন্দেহ নেই। সব সংশয়, ভুল বুঝাবুঝি দূর হয়েছে তার। মেয়েটি বুঝে ফেলেছে, তাদের ব্যাপারে হাদীদ ও তার সঙ্গীদের কোন কুমতলব বা দুরভিসন্ধি ছিল না। তার জীবন ও ইজ্জত রক্ষার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দস্যুদলের মোকাবেলা করেছেন তিনি।
আহত হাদীদকে এই জনমানবহীন মরুভূমিতে একাকী ফেলে যেতে স্পষ্ট অস্বীকার করে মেয়েটি। দৌড়ে গিয়ে ঘোড়ার জিনের সঙ্গে বাঁধা পানির মশক খুলে নিয়ে এসে হাদীদকে পানি পান করায়, নিজের পরিধানের কাপড় এবং হাদীদের পোষাক ছিঁড়ে কিছু কাপড় নিয়ে জখমে পট্টি বাঁধে। গোয়েন্দা মেয়ের প্রশিক্ষণ আছে এ কাজে।
মেয়েটি হাদীদকে ধরে দাঁড় করিয়ে একটি ঘোড়ার কাছে নিয়ে যায়। বড় কষ্টে তাকে ঘোড়ার পিঠে তুলে বসিয়ে দিয়ে নিজে অন্য ঘোড়ায় চড়তে যায়। কিন্তু হাদীদ ক্ষীণ কণ্ঠে বলেন, আমি একা ঘোড়ায় বসে থাকতে পারব না। সেই শক্তি আমার নেই।
ঘোড়া ছিল তিনটি। একটি ঘোড়াও যাতে খোয়াতে না হয়, তার জন্য বুদ্ধি করে মেয়েটি দুটি ঘোড়ার বাগ অপর ঘোড়ার জিনের সঙ্গে বেঁধে নেয়। নিজে হাদীদের পিছনে চড়ে বসে। হাদীদের পিঠ নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে তার মাথা নিজের কাঁধের উপর রেখে রওনার জন্য প্রস্তুতি নেয় সে।
