এখন নয়। সংঘর্ষ শুরু হোক, তখন দেব। বললেন হাদীদ। সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয় গোয়েন্দাদের।
রক্ষী কমান্ডার বললেন, উট-ঘোড়ায় চড়ে লড়াই করার জন্য এ জায়গা উপযোগী নয়। এক্ষুণি আমাদের এ স্থান ত্যাগ করতে হবে। বলেই এক লাফে ঘোড়ায় উঠে রওনা দেয় হাদীদ।
রক্ষীরা তীর-কামান হাতে নেয়। নীরের মুখ খুলে নেয়। ঘোড়ায় চড়ে ছুটে চলে তারাও। মেয়েদের নিয়ে আলেম গোয়েন্দাও এগিয়ে চলে।
এক সঙ্গীসহ হাদীদ সকলের আগে। সঙ্গী তাকে বলে, ওদের হাতে অস্ত্র দেয়া ঠিক হবে না। শত হলেও ওরা আমাদের শত্রু। অস্ত্র পেলে ওরা ডাকাতদের সঙ্গে যোগ দিয়ে আমাদেরকে মেরে ফেলতে পারে।
ওরা আমাদের অস্ত্র দিতে অস্বীকার করল। ওদের মনোভাব ভাল নয়। ডাকাতরা ওদের-ই লোক। তোমাদের দুজনকে ওরা ডাকাতদের হাতে তুলে দেবে আর আমাকে খুন করে ফেলবে। মেয়েদের উদ্দেশে বলল গোয়েন্দা।
মুখোশপরা কাউকে দেখামাত্র তীর ছুঁড়বে। আমার নির্দেশের অপেক্ষা করবে না। যখন হোক, যেখানে হোক, ডাকাতদের সঙ্গে সংঘর্ষ হবেই। রক্ষীদের আগেই বলে দেন হাদীদ।
বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে চলে কাফেলা। মাঝে-মধ্যে থেমে উট-ঘোড়াকে দানা-পানি খাইয়ে নিচ্ছে। তাই পথ চলায় ক্লান্তি নেই ওদের।
উঁচু-নীচু পার্বত্য এলাকা যেন ফুরাতে চায় না। মাঝে-মধ্যে পথের দুধারে উঁচু উঁচু টিলা। হাদীদ ভয় পান টিলার উপর থেকে ডাকাতরা তীর ছোঁড়ে কিনা। সতর্ক করে দেন তিনি সঙ্গীদের। গোয়েন্দাদেরও বলে দেন, যেন তারা উটের গতি বাড়িয়ে ঘোড়ার সমানে চলে আর উপর দিকে লক্ষ্য রাখে।
পার্বত্য এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে আসে কাফেলা। কোন ডাকাত চোখে পড়েনি। পশ্চিম আকাশে সূর্য নীচে নামতে শুরু করে। একবার দূরে ছায়ার মত দুটি উট চোখে পড়ল। কাফেলা যেদিকে যাচ্ছে, উট দুটোও সেদিকে এগুচ্ছে বলে মনে হল। দ্রুত এগিয়ে চলছে কাফেলা।
পথে একস্থানে পানি পাওয়া গেল। থামল কাফেলা। উট-ঘোড়াকে পানি পান করাল। নিজেরাও পান করল। আবার ছুটে চলল।
সূর্য আরো নীচে নেমে আসে। সাঝের আবছা আঁধারে ছেয়ে যায় প্রকৃতি। কাফেলাকে থামান হাদীদ। বলেন, যুদ্ধের জন্য এটি উপযুক্ত জায়গা। এখানে আশে পাশে কোন প্রতিবন্ধকতা নেই।
হাদীদ ঘোড়াগুলোর জিন খুললেন না, যাতে প্রয়োজনের সময় প্রস্তুত পাওয়া যায়। উটগুলোকে বসিয়ে দেন। আহারাদি সেরে হাদীদ মেয়েগুলোকে এক স্থানে শুইয়ে দেন। সতর্ক থাকতে বলে দেন তাদের। রক্ষীদেরকে তীর-কামান প্রস্তুত রাখতে বলেন। বলেন, চোখ-কান খোলা রেখে শুয়ে থাকতে। হাদীদ নিশ্চিত, রাতে যে কোন সময় আক্রমণ হবেই।
***
মধ্য রাত। শান্ত-নিস্তব্ধ মরুভূমি। হঠাৎ কিসের যেন শব্দ শুনতে পায় কাফেলা। কান খাড়া করে সবাই। চকিতে চোখ তুলে তাকান হাদীদ। ভূত! ভূতের ন্যায় বড় বড় ছায়ামূর্তি দৌড়াচ্ছে কাফেলার চারদিকে। অনেকগুলো উটের পায়ের আওয়াজ স্পষ্ট কানে আসছে। মাটি যেন থর থর করে কাঁপছে। উটের সংখ্যা দশেরও বেশী বলে মনে হল। একটিতে একজন করে আরোহী। কাফেলার মনে আতংক সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে তারা।
তিন চারটি চক্কর দিয়ে নিকটে এসে হাঁক দেয়, মেয়ে দুটোকে আমাদের হাতে তুলে দাও। আমরা তোমাদের আর কিছু চাই না; ওদের নিয়েই ফিরে যাব।
শুয়ে শুয়ে-ই হাদীদ প্রথম তীর ছুঁড়ে। সঙ্গে সঙ্গে বিকট এক আর্তচীৎকার ভেসে আসে। অন্য রক্ষীরাও শোয়া অবস্থাতেই তীর চালাতে শুরু করে। দুটি উটের গোংগানীর শব্দ শোনা যায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে দস্যুদলের উট দুটো।
হাদীদ মেয়েদের বলেন, পালাবার চেষ্টা কর না, আমাদের সঙ্গে থাক।
দস্যুদের একজন বলল, আক্রমণ কর, ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়। একজনকেও প্রাণে বাঁচতে দিওনা। মেয়েদের তুলে আন।
জোৎস্না না থাকলেও মরুভূমির রাত বেশ ফর্সা।. অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। উটের পিঠ থেকে নেমে আসে দস্যুদল। তরবারী আর বর্শা হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে কাফেলার উপর। হাতাহাতি লড়াই শুরু হয়। দু পক্ষের হাঁক-ডাকে নিঝুম রাতের নীরবতা ভেঙ্গে যায়। হাদীদ ও তার সঙ্গীরা নিজেরা ঢাল হয়ে দস্যুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করছে মেয়েদের। অস্ত্র চায় মেয়েরা। নিজের তরবারী দিয়ে দেন হাদীদ। নিজে বর্শা দিয়েই মোকাবেলা করছেন তিনি। হাদীদের তরবারী হাতে নিয়ে এক মেয়ে রক্ষীদের নিরাপদ বেষ্টনী থেকে বেরিয়ে যায়। আলেম গোয়েন্দার সাড়াশব্দ নেই।
দীর্ঘক্ষণ চলে এ সংঘর্ষ। ধীরে ধীরে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যোদ্ধারা। রক্ষীরা একে অপরকে ডাকতে থাকে। এক সময়ে তাদের ডাক-চীৎকারও বন্ধ হয়ে যায়। রণাঙ্গনের হট্টগোলও কমে আসে।
হাদীদ তার সঙ্গীদের ডাকেন। কিন্তু কোন জবাব পাচ্ছেন না তিনি। একটি মেয়ের কণ্ঠ শুনতে পান হাদীদ। মেয়েটি চীৎকার করে ডাকছে তাকে। সাথে একটি ঘোড়ার তীব্রগতিতে ছুটে চলার শব্দও শোনা গেল। হাদীদ বুঝতে পারেন, কোন ডাকাত এক মেয়েকে উটের পরিবর্তে তাদেরই ঘোড়ায় তুলে নিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত একটি ঘোড়ায় চড়ে বসেন হাদীদ। পলায়নপর ঘোড়ার অনুসরণ করেন তিনি।
বিদ্যুৎগতিতে ছুটে চলছে তার ঘোড়া। সমতল মরুভূমিতে কোন বাঁধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে না তাঁর।
কয়েক মাইল পথ অতিক্রম করার পর পলায়নপর ঘোড়ার ছায়া চোখে পড়ে। ধীরে ধীরে দুই ধাবমান ঘোড়ার মধ্যকার দূরত্ব কমতে থাকে। হঠাৎ হাদীদ অনুভব করে, পিছন দিক থেকে আরো একটি ঘোড়া ধেয়ে আসছে। আরোহী তারই সঙ্গী না দস্যু বুঝতে পারছেন না তিনি। পিছন থেকে আসা ঘোড়াটি কাছে এসে গেছে হাদীদের। হাদীদ নিজের ঘোড়ার গতি স্বাভাবিক রেখেই উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করেন, কে? কোন জবাব পান না তিনি। হাদীদ তার অশ্বের গতি আরো তীব্র করার চেষ্টা করেন।
