রাতের শেষ প্রহর। এখনো আবছা অন্ধকার। তবে ভোর হলো বলে। রক্ষীরা জাগিয়ে তোলে গোয়েন্দাদের। শুরু হয় পুনরায় পথচলা। আগের নিয়মেই রওনা হয়। তারা। তিন গোয়েন্দা পাশাপাশি। রক্ষীদের দুজন সামনে দুজন পিছনে।
সূর্য উদিত হয়। ধীরে ধীরে প্রখর হতে থাকে রোদের কিরণ। কাফেলাও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে গন্তব্যপানে।
উঁচু-নীচু এক পার্বত্য এলাকায় ঢুকে পড়ে কাফেলা। এদিক-সেদিক মাটি আর বালির পাহাড়। দাঁড়িয়ে আছে বাঁকা দেয়ালের মত। দুই পাহাড়ের মধ্যখানে সরু গলিপথ। পথের উপর দুদিকের পাহাড়ের ভূতুড়ে ছায়া। ভয়ে মেয়েদের গা ছমছম্ করে উঠে। ভীতির ছাপ পরিষ্কার ফুটে উঠেছে তাদের চেহারায়। তাদের দৃষ্টিতে কু কর্ম আর খুন করার বড় উপযুক্ত স্থান এটি। ওসরের জন্যই বোধ হয় রক্ষীরা তাদের এ পথে নিয়ে এসেছে।
ওদেরকে আমাদের সাথে কথা বলতে বলুন। ওদের নীরবতা আর সম্পর্কহীনতার কারণে আমার ভয় লাগছে। বলুন, যদি ওরা আমাদেরকে খুন-ই করতে চায়, বিলম্ব না করে করে ফেলুক। মৃত্যুর অপেক্ষা করতে আমার কষ্ট হচ্ছে। বলল এক মেয়ে।
আলেম কথা বলছে না। মেয়েদের কোন সহযোগিতা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তারা তিনজনই এখন মুসলিম রক্ষীদের দয়ার উপর নির্ভরশীল।
বেলা দ্বি-প্রহর। সূর্য এখন মাথার উপর। থেমে যায় কাফেলা। টিলার ছায়ায় অবস্থান নেয় তারা। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে খেতে বসে সবাই। আহারের মাঝে এক পর্যায়ে আলেম গোয়েন্দা রক্ষীদের জিজ্ঞেস করে, আমাদের সাথে তোমরা কথা বলছ না কেন?
আমরা কর্তব্যের অতিরিক্ত কথা বলি না। তোমাদের বিশেষ কোন কথা থাকলে বলতে পার, আমরা শুনব, প্রয়োজনে জবাব দেব। বলল রক্ষীদের কমান্ডার।
তোমাদের কি জানা আছে, আমরা কারা? জিজ্ঞেস করে আলেম।
তোমরা তিনজন গুপ্তচর। মেয়ে দুটো কুলটা। যাদেরকে তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চাও, এরা তাদের ভোগের সামগ্রী। জানি না, মিসরের আমীর সালাহুদ্দীন আইউবী কেন তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন! তোমাদেরকে শোক দুর্গে পৌঁছিয়ে দেয়ার জন্য আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তোমরা আমাদের আমানত …। কিন্তু একথা জিজ্ঞেস করলে কেন? বলল রক্ষী কমান্ডার।
মন চাইছিল তোমাদের সাথে কথা বলি। আমরা ক্ষণিকের সহযাত্রী ঠিক; কিন্তু আমাদের গন্তব্য এক; তোমাদের গন্তব্য অন্য। দুদিন পর আমরা তোমাদের থেকে আলাদা হয়ে যাব। বলল কমান্ডার।
.
রক্ষীর জবাব যেন কানেই গেল না গোয়েন্দার। দূরের কি একটি বস্তু অবলোকন করছে যেন তার দু চোখ। চকিত নয়নে এক নাগাড়ে তাকিয়ে আছে ওদিকে। ধীরে ধীরে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠে গোয়েন্দা। চোখে-মুখে তার ভীতির ছাপ। ভয়ংকর কি যেন দেখেছে সে।
রক্ষী কমান্ডারও চোখ তুলে তাকান সেদিকে। শংকিত হয়ে উঠেন তিনিও। বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ।
দুশ গজ দূরে এক স্থানে দাঁড়িয়ে আছে দুটি উট। পিঠে দুজন মানুষ। মাথায় পাগড়ি। মুখমন্ডল কাপড়ে ঢাকা। সওয়ার নির্নিমেষ চক্ষে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে রক্ষী ও গোয়েন্দাদের কাফেলার প্রতি। তাদের গতিবিধি আর পোষাক-ই বলে দিচ্ছে, তারা কারা।
জান, ওরা কারা? রক্ষী কমান্ডার প্রশ্ন করে আলেমকে।
মরু ডাকাত। কি জানি, ওরা কজন! জবাব দেয় আলেম।
দেখা যাবে। বলেই রক্ষী কমান্ডার উঠে দাঁড়ান। এক সঙ্গীকে বলেন, আমার সঙ্গে এস।
ঘোড়ায় চড়ে দুই রক্ষী ডাকাতদের দিকে ছুটে যায়। তারা অস্ত্রসজ্জিত। সাথে তরবারী ছাড়াও আছে বর্শা। কাফেলা থেকে দুজন লোক ছুটে আসতে দেখে উষ্ট্ৰারোহীরা টিলার পিছনে অদৃশ্য হয়ে যায়।
বাকী দুই রক্ষী নিকটতম টিলায় উঠে পড়ে। আলেম মেয়েদের উদ্দেশে বলে, বোধ হয় তোমাদের আশংকা-ই সত্যে পরিণত হতে যাচ্ছে। ওরা ডাকাত নয় সালাহুদ্দীন আইউবীর পাঠানো লোক বলেই মনে হয়। না হলে রক্ষী দুজন এত বীরদর্পে তাদের কাছে গেল কেন! তোমাদেরকে চরমভাবে অপদস্ত করতে চায় আইউবী। তোমাদের বড় ভয়ানক শাস্তি ভোগ করতে হবে। আর আমার জন্য মৃত্যু তো অবধারিত।
তার মানে, আসলে আমরা মুক্তি পাইনি। এখনো আমরা আইউবীর কয়েদী। বলল, মেয়েদের একজন।
তা-ই তো মনে হয়। বলল অপরজন।
খানিক পর।
ফিরে আসে দুই মুসলিম রক্ষী। টিলা থেকে নেমে আসে সঙ্গীদ্বয়। তাদের চারপাশে জড়ো হয় সবাই।
রক্ষী কমান্ডারের নাম হাদীদ। হাদীদ জানায়
ওরা মরুদস্যু। আমরা তাদের সাথে দেখা করে এসেছি। সংখ্যায় ওরা কজন, জানতে পারিনি। যে দুজনকে আমরা উটের পিঠে দেখেছিলাম, তারা জানায়, আজ ভোর থেকেই তারা আমাদের পিছু নিয়েছে। তারা আমাকে বলে, তোমরা ফৌজের লোক। মুসলমান বলে মনে হয়। কিন্তু মেয়ে দুটো মুসলমান নয়। মেয়েদেরকে আমাদের হাতে তুলে দাও; তোমাদেরকে বিরক্ত করব না। আমি বললাম, মেয়ে দুটো যে ধর্মের-ই হোক; আমাদের হাতে আমানত। জীবন থাকতে আমরা ওদেরকে তোমাদের হাতে অর্পণ করতে পারব না। আমাকে তারা সাধের জীবনটা না খোয়াবার পরামর্শ নেয়। আমাকে বোঝাবার চেষ্টা করে। আমি ওদের সাফ বলে এসেছি, আগে আমাদেরকে খুন কর, পরে ওদেরকে নিয়ে নাও।
তোমরা কি অস্ত্র চালাতে জান? গোয়েন্দাদের জিজ্ঞেস করে রক্ষী কমান্ডার।
আমরা মেয়েদেরকে যে কোন অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। তোমাদের কাছে তো বর্শা-তীর-কামান সবই আছে। তার থেকে একটি একটি করে দাও না আমাদের! বলল আলেম।
