কিন্তু সুলতান আইউবী এই ব্যতিক্রমী উদারতা কেন দেখালেন, ভেবে সবাই হতবাক্। দুশমনকে ক্ষমা করা তো তার স্বভাব নয়! সবিনয়ে ঘটনার রহস্য জানতে চান আলী বিন সুফিয়ান। জবাবে সুলতান শুধু বললেন
আলী! তোমাকে বলেছিলাম, আমি একটি জুয়া খেলতে চাই। এবার সেই জুয়ার বাজি-ই লাগালাম। বাজিতে যদি হেরে যাই, তাহলে ক্ষতি শুধু এতটুকু-ই হবে যে, তিনজন শত্রু গোয়েন্দা আমার হাতছাড়া হয়ে গেল।
বিস্তারিত জানতে চান আলী। কিন্তু সুলতান এ পর্যন্ত-ই কথার ইতি টেনে বললেন, ধৈর্য ধর আলী! সময়মত সব জানতে পারবে।
মুক্তিপ্রাপ্ত তিন গোয়েন্দা আনন্দচিত্তে এগিয়ে চলছে শোবক অভিমুখে। তাদের এই আনন্দ শুধু মুক্তির আনন্দ নয়। এ মুহূর্তে তাদের আনন্দের মূল কারণ, সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্য, যা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে তারা শোবকে।
.
কায়রো শহর ত্যাগ করে বহুদূর এগিয়ে গেছে সাতজনের কাফেলা। তিন গোয়েন্দার উট তিনটি পাশাপাশি চলছে। চার দেহরক্ষীর দুজন সামনে আর দুজন পিছনে।
পথ চলতে চলতে আলেম গোয়েন্দা মেয়েদের উদ্দেশে বলে, আমাদের খোদা ঈসা মসীহ মোজেজা দেখালেন। এতে প্রমাণিত হয়, আমাদের তিনি ভালবাসেন এবং আমাদেরকে বিজয় দান করবেন। এটি আমাদের ধর্মের সত্যতার লক্ষণ। খোদা সালাহুদ্দীন আইউবী ও আলী বিন সুফিয়ানের মত বিচক্ষণ লোকের বিবেক অন্ধ করে দিয়েছেন। যার ফলে এত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমাদের কানে দিয়ে তিনি আমাদেরকে মুক্তি দিয়ে দিলেন। এ তথ্য পেলে আমাদের সৈন্যরা আইউবীর বাহিনীকে খোলা মাঠে ঘিরে ফেলেই নিঃশেষ করে দেবে। বেটারা কার্ক পৌঁছার সুযোগই পাবে না। আমার আশা, আমাদের কমাণ্ডার যুদ্ধ আক্রমণ পর্যন্তই সীমিত রাখবেন না- মিসরেও চড়াও হবেন। পতন ঘটবে আইউবীর। অতি অনায়াসে প্রতিষ্ঠিত হবে আমাদের ক্রুশ।
আপনি অভিজ্ঞ আলেম। কিন্তু আপনি যাকে মোজেজা বলছেন, আমার কাছে তা বিপদ বলে মনে হচ্ছে। বিপদ হল এই চার দেহরক্ষী। বিচিত্র কি যে, সামনে কোথাও গিয়ে এরা আমাদেরকে হত্যা করে ফিরে যাবে। এমনও তো হতে পারে যে, আইউবী আমাদের সঙ্গে উপহাস করেছেন। জল্লাদের হাতে অর্পণ না করে তিনি আমাদেরকে তুলে দিয়েছেন এদের হাতে। নিরাপদ কোন স্থানে গিয়ে এরা মনভরে আমাদেরকে উপভোগ করবে। তারপর খুন করে ফিরে যাবে! বলল এক মেয়ে।
আর আমরা তো নিরস্ত্র। তোমার আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না। কোন রাষ্ট্রনায়ক তার গোয়েন্দাকে এভাবে ক্ষমা করতে পারেন না। তাছাড়া মুসলমান এতই যৌনবিলাসী জাতি যে, তারা তোমাদের মত সুন্দরী মেয়েদের নাগালে পেয়ে হাতছাড়া করতে পারে না। বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল আলেম গোয়েন্দা। যেন সব আনন্দ, সব স্বপ্নসাধ উড়ে গেছে তার মন থেকে। চেহারায় তার নিদারুণ হতাশার ছাপ। মেয়েটির কল্পিত বিপদের আশংকা আচ্ছন্ন করে ফেলেছে তাকেও।
আমাদের চোখ-কান খোলা রেখে সতর্কতার সাথে রাত কাটাতে হবে। রাতে যখন এরা ঘুমিয়ে পড়বে, তখন এদের অস্ত্র দিয়েই এদের খুন করতে হবে। আমাদের প্রয়োজন শুধু একটু সাহস। বলল অপর মেয়ে।
এতটুকু সাহস আমাদের করতেই হবে। কাজটা আজ রাতেই হয়ে গেলে ভাল হয়। সকাল পর্যন্ত আমরা অনেক পথ এগিয়ে যেতে পারব। বলল আলেম।
তিন গোয়েন্দার আগে-পিছে দুজন করে চার দেহরক্ষী গল্প-গুজবের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছে। তাদের ভাব-গতিতে মনে হচ্ছিল, দুটি হৃদয়কাড়া রূপসী যুবতী যে তাদের হাতের মুঠোয়, সে খবর-ই তাদের নেই।
.
বেলা শেষে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবি ডুবি করছে। ধীরে ধীরে ঘনিভূত হচ্ছে তিন গোয়েন্দার বিপদ-শংকা। মেয়ে দুটোর একজন আলেমকে বলে, আমরা এখন কোথাও থামব না। রাতের প্রথম প্রহরটি এভাবে অতিক্রম করেই কাটিয়ে দেব।
চলতে থাকে কাফেলা। মরুভূমির রাত আঁধারে ছেয়ে যায়। উট তিনটি কাছাকাছি এনে তিন গোয়েন্দা আরো ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করে। তারা দেহরক্ষীদের হত্যা করার পরিকল্পনা আঁটতে শুরু করে।
দীর্ঘক্ষণ পর এক সবুজ-শ্যামল স্থানে এসে পৌঁছে কাফেলা। থেমে যায় দেহরক্ষীগণ। তাবু ফেলে সেখানে। গোয়েন্দাদের আহারের ব্যবস্থা করে। নিজেরাও আহার করে। তারপর শোয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
চার মুসলিম দেহরক্ষীকে হত্যা করার পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে শুয়ে পড়ে তিন গোয়েন্দা। সুযোগের সন্ধান করছে তারা। দৃষ্টি তাদের দেহরক্ষীদের প্রতি নিবদ্ধ।
চার দেহরক্ষীর তিনজন শুয়ে পড়ে। টহল দিচ্ছে একজন। নিজেদের তাঁবুর চারদিকে পায়চারী করছে সে। হঠাৎ কেমন যেন একটা সন্দেহ জাগে তার মনে। দৌড়ে যায় গোয়েন্দাদের তাবুর দিকে। দেখে-শুনে ফিরে আসে আবার।
এভাবে দুঘন্টা কেটে যায়। তারপর সে অপর এক সঙ্গীকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে। নিজে শুয়ে পড়ে তার জায়গায়। নতুনজন চারদিক টহল দিতে থাকে। একবার পশুগুলোর কাছে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করে, আবার ঘুমন্ত লোকদের কে কি অবস্থায় আছে, লক্ষ্য করে দেখে। এবার আলেম গোয়েন্দা মেয়েদের ফিফিসিয়ে বলে, বোধ হয় আমরা সফল হতে পারব না। বেটারা পাহারা দিয়ে বেড়াচ্ছে। চিন্তা করে লাভ নেই। ঘুমিয়ে পড়; কপালে যা আছে, তা-ই হবে।
গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে তিন গোয়েন্দা।
