বন্দী গোয়েন্দাদের শৃংখল খুলে দেয়ার আদেশ দেন সুলতান। কর্মকার আনার জন্য আলী বাইরে বেরিয়ে পড়েন। সুলতান বসতে বললেন তিনজনকে। তারপর আলেম গোয়েন্দার উদ্দেশে বললেন
আমি তোমার ইলম ও বিচক্ষণতাকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু তুমি তোমার বিদ্যাকে শয়তানী কাজে ব্যবহার করছ। এই অপকর্মের স্থলে যদি তুমি এদেশে এসে নিজ ধর্ম প্রচার করতে, তাহলে এই ভেবে আমি মনের গভীর থেকে তোমাকে শ্রদ্ধা করতাম যে, তুমি নিজ ধর্ম ও নবীর খেদমত করছ। বল তো, তোমার ধর্ম কি তোমাকে অন্য ধর্মের ইবাদতখানায় বসে সেই ধর্মে মিথ্যার সংমিশ্রণ ঘটানোর বৈধতা স্বীকার করে? তোমার হৃদয়ে কি তোমার পবিত্র ক্রুশ, নবী ঈসা ও কুমারী মাতা মরিয়মের প্রতি সামান্যতম শ্রদ্ধাবোধও আছে? যদি থাকে, তাহলে মিথ্যা ও শয়তানী কর্মকান্ডের মত। কবীরা গুনায় লিপ্ত হয়ে তুমি তাদের ইবাদত কর কিভাবে?
এ মিথ্যাচার আমার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। আমি যা কিছু করেছি, ক্রুশের জন্যই করেছি। বলল গোয়েন্দা।
তোমার দাবী অনুযায়ী তুমি গভীরভাবে ইঞ্জীল ও কুরআন অধ্যয়ন করেছ। বল, এই দুই আসমানী কিতাবের একটিতেও কি এই অনুমতি দেয়া আছে যে, এ রকম উদ্ভিন্ন-যৌবনা যুবতীদেরকে কুকর্মের পথে নিক্ষেপ করবে এবং পর পুরুষের কাছে পাঠিয়ে উদ্দেশ্য হাসিল করবে? ইঞ্জীল কি তোমাদের বলেছে যে, ক্রুশের খাতিরে তোমরা জাতির সুন্দরী মেয়েগুলোর ইজ্জত অন্যের হাতে তুলে দাও? তুমি কি কোন মুসলমান মেয়েকে কুরআন ও ইসলামের নামে নিজের ইজ্জত পরপুরুষের হাতে তুলে দিতে দেখেছ কখনো? বললেন আইউবী।
ইসলামকে আমি খৃষ্টবাদের প্রতিদ্বন্দ্বি মনে করি। যখন-ই যে বিষ হাতে পাব, তা-ই আমি ইসলামের শিরায় শিরায় মিশিয়ে ছাড়ব। বলল গোয়েন্দা।
মধুর বিষ দিয়ে তোমরা গুটিকতক মুসলমানের চরিত্র হনন করতে পারবে জানি; কিন্তু তোমরা ইসলামের বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না। শান্ত-সমাহিত কণ্ঠে বললেন আইউবী।
এবার মেয়ে দুটোর প্রতি দৃষ্টিপাত করে সুলতান বললেন
তোমরা কোন্ বংশের মেয়ে জানা আছে তোমাদের? বল, তোমাদের আসল পরিচয় কি?
দুজন-ই নীরব। কারো মুখে রা নেই।
নৈতিক ও চারিত্রিক পবিত্রতা তো সব শেষ করেছ। এখন কোন সম্রাপ্ত পরিবারের কারুর স্ত্রী হয়ে জীবন অতিবাহিত করার ইচ্ছা আছে তোমাদের জিজ্ঞেস করেন আইউবী।
প্রশ্নটা লুফে নেয় এক মেয়ে। আইউবীকে টোপ দেয়ার জন্য এমন একটি মোক্ষম প্রশ্ন-ই দরকার ছিল তার। বলল, আমি সম্মানিত স্ত্রী হয়ে বাকী জীবন কাটাতে চাই। আপনি কি আমায় গ্রহণ করবেন? আপনি যদি গ্রহণ না করেন, তাহলে আমাকে অন্য একজন সম্ভ্রান্ত স্বামীর ব্যবস্থা করে দিন। ইসলাম কবুল করে অতীতের সব পাপ থেকে আমি তাওবা করব।
স্মিত হাসলেন আইউব। তারপর খানিক ভেবে বললেন
আমি চাই না, এ আলেমের ইলম জল্লাদের তরবারীর খুনে ভেসে যাক্। আমি এ ও চাই না যে, তোমাদের দুজনের রূপ-যৌবন আমার বন্দীদশার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে গলে-পঁচে নিঃশেষ হোক। শোন মেয়ে! সত্যিই যদি অতীতের পাপাচার থেকে তাওবা করতে চাও, তাহলে আমি তোমাদের মুক্তি দিয়ে তোমাদের জন্মভূমিতে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তবে মনে রেখ, ঐ দেশ তোমাদের নয়- আমাদের। একদিন না একদিন আমি তোমাদের রাজাদের হাত থেকে আমার দেশকে উদ্ধার করব-ই। যাও; দেশে গিয়ে একজন ভদ্র পুরুষের স্ত্রী হয়ে পবিত্রতার সাথে বাকী জীবনটা কাটিয়ে দাও। আমি তোমাদের তিনজনকেই মুক্তি দিলাম।
হঠাৎ চমকে উঠে তিন গোয়েন্দা। যেন সুঁই ফুটানো হয়েছে তাদের গায়ে। ইত্যবসরে কক্ষে প্রবেশ করেন আলী বিন সুফিয়ান। সঙ্গে তার এক কর্মকার। শৃংখল খুলে দেয়া হয় তিনজনের। সুলতান বললেন, আলী! আমি এদেরকে মুক্তি দিয়েছি। শুনে আলী জ্ৰপ বিস্মিত হলেন। দীর্ঘক্ষণ অপলক নেত্রে তাকিয়ে থাকেন সুলতানের মুখের দিকে। সুলতান বললেন, এদেরকে তিনটি উটে তুলে দাও। চারজন দক্ষ, বিচক্ষণ ও সাহসী অশ্বারোহী সশস্ত্র রক্ষী সঙ্গে দাও। তারা এদেরকে শোবক দুর্গে রেখে ফিরে আসবে। জরুরী পাথেয়-সামানও সঙ্গে দিয়ে দাও আর আজই এদের বিদায় করে দাও।
আলেম গোয়েন্দার উদ্দেশে সুলতান বললেন
ওখানে গিয়ে এ ভুল প্রচার করো না যে, সালাহুদ্দীন আইয়ুবী গোয়েন্দাদের ক্ষমা করে দেয়। গোয়েন্দাদেরকে চাক্কিতে দানা পেষার মত পিষে পিষে নিঃশেষ করা-ই আমার নিয়ম। তুমি একজন আলেম বলেই আমি তোমাকে মুক্তি দিলাম। আমি তোমাকে ইলমের আলো ছড়ানোর সুযোগ দিলাম।
***
সূর্য এখনো অস্ত যায়নি। তিনটি উটে সাওয়ার হয়ে চারজন দেহরক্ষীর সঙ্গে রওনা হয় তিন গোয়েন্দা। দেহরক্ষী চারজন মুসলিম সেনাবাহিনীর বাছাইকরা লোক। সুশ্রী, সুঠাম, বলিষ্ঠ, সাহসী ও ব্যক্তিত্ববান সৈনিক তারা। সুলতানের নির্দেশে আলী বিন সুফিয়ান দেখে-শুনেই এদের নির্বাচন করেছেন। তার কারণ দুটি। প্রথমতঃ পথে– তাদের পদে পদে দুস্য-ডাকাতের মোকাবেলা করতে হবে। এর জন্য শক্তি-সামর্থ ও সাহসের প্রয়োজন। দ্বিতীয়তঃ গোয়েন্দাদের পৌঁছিয়ে দেয়ার জন্য তাদের খৃষ্টান সেনাকমান্ডারদের মুখোমুখি হতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। সঙ্গে দেয়া উট-ঘোড়াগুলোও অতি উন্নত।
