মদোন্মত্ত হাতেম মাথা নেড়ে সমর্থন জানায়। বলে, এবার আমি ওখানে এমন ব্যবস্থা নেব যে, আপনার একজন লোকও আর ধরা পড়বে না।
মিসরে যদি আমরা এ অশান্তি সৃষ্টি করে না রাখতাম, তাহলে সালাহুদ্দীন আইউবী বহু আগেই আমাদের উপর হামলা করে বসত। তার শক্তিকে আমরা তারই লোকদের উপর ব্যয় করাচ্ছি, এটা আমাদের কম সাফল্য নয়। বলল এক খৃষ্টান কমান্ডার।
আইউবী ও আলী বিন সুফিয়ানকে দুনিয়া থেকে বিদায় করার কোন ব্যবস্থা : এখনো হয়নি? জানতে চায় কনরাড।
কয়েকবার চেষ্টা করেছি স্যার! কিন্তু কামিয়াব হইনি। ব্যর্থতার কারণ, লোক দুটো পাথরের মত শক্ত। না তারা মদ স্পর্শ করে, না নারীর প্রতি তাদের দুর্বলতা আছে। এ কারণে মদে কিছু মিশিয়েও তাদেরকে হত্যা করা যায় না, নারী দিয়েও কাবু করা যায় না। তবে আমরা নিরাশ নই। ব্যবস্থা একটা করে রেখেছি।
আইউবীর দেহরক্ষীদের মধ্যে চারজন-ই আমাদের ফেদায়ী। বড় বুদ্ধিমত্তার সাথে আমার তাদেরকে ঐ পর্যন্ত পৌঁছাতে হয়েছে। সুযোগ পেলেই ওরা তাদের দুজনকে, অন্তত একজনকে খতম করে ফেলবে। গোয়েন্দা প্রধান জবাব দেয়।
আচ্ছা, আমাদের এখানেও আইউবীর গোয়েন্দা আছে নাকি? জিজ্ঞেস করে লুজিনান।
অবশ্যই। যখন থেকে আমরা মিসর ও সিরিয়ায় আমাদের গুপ্তচরবৃত্তি এবং নাশকতামূলক কার্যক্রম শুরু করি, তখন-ই আইউবী আমাদের এদিকে চর পাঠিয়ে দিয়েছে। আমাদের হাতে দুজন ধরাও পড়েছে। কিন্তু নির্যাতনের মুখে ওরা জীবন দিয়েছে ঠিক, তৃতীয় কোন সহকর্মীর নাম বলেনি। গোয়েন্দা প্রধান জবাব দেয়।
তাদের সফলতার পরিমাণ কী? জানতে চায় লুজিননি।
স্যার! কার্কে আমাদের গুদামে আগুন লেগে যে অর্ধেক রসদ পুড়ে গিয়েছিল, জীবন্ত জ্বলে গিয়েছিল এগারটি ঘোড়া, তা আইউবীর এই সন্ত্রাসী গুপ্তচরদের-ই কাজ ছিল। আমি আপনাকে আরো জানাতে পারি যে, আমাদের যুদ্ধের ধরন ও কৌশলের পুংখানুপুংখ রিপোর্ট আইউবীর কানে পৌঁছে যায় যথাসময়ে। আমি আইউবীর গুপ্তচরদের প্রশংসা না করে পারছি না যে, ওরা জীবন বাজি রেখে পরম নিষ্ঠা ও আমানতদারীর সাথে দায়িত্ব পালন করে থাকে। জবাব দেয় অপর একজন।
দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত চলে এই সভা। মিসর ও সিরিয়ায় নাশকতামূলক কর্মতৎপরতা কিভাবে আরো জোরদার, আরো ধ্বংসাত্মক করা যায়, সে বিষয়ে চুলচেরা আলোচনা হয়। হাতেমুল আকবর সভাসদদের সামনে সুলতান আইউবীর সরকারের দুর্বলতা সবলতার দিকগুলোর প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে। অবশেষে হাতেমুল আকবরকে আরো কিছু লোক ও দু-তিনটি মেয়ে প্রদান করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
***
দু নায়েব এবং আলী বিন সুফিয়ানকে কার্ক আক্রমণের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করছেন সুলতান আইউবী। বিশদিন পর তার বাহিনী রওনা হবে বলে জানালেন। পাশের কক্ষ থেকে আলেম গোয়েন্দা এবং মেয়ে দুটো সব শুনে ফেলে। তারা আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জেনে ফেলে। আলেম গোয়েন্দা অনুশোচনা ব্যক্ত করে, এত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, অথচ শোবকে তা পৌঁছাতে পারছে না সে।
আমি সালাহুদ্দীন আইউবীকে বাগে আনার চেষ্টা করব। স্বল্প সময়ের জন্য হলেও যদি তিনি আমাকে নির্জনে তার সঙ্গে থাকার সুযোগ দেন, তাহলে আমি আমার মুক্তি আদায় করে নিতে পারব। তার বিবেক-বুদ্ধি কজা করতে পারব বলে আমি আশাবাদী। বলল এক মেয়ে।
তিনি আমাদেরকে কেন ডাকলেন, বুঝতে পারছি না। তবে মনে রাখবে, যদি তোমাদেরকে একজন একজন করে হাজির করা হয়, তাহলে তাকে পশুতে পরিণত করার আপ্রাণ চেষ্টা করবে। যদি মদ খাওয়াতে সক্ষম হও, তাহলে অচেতন করতে হলে কি পরিমাণ খাওয়াতে হবে, তা তোমাদের জানা আছে। তারপর পালাবার পদ্ধতিও তোমাদের অজানা নয়। পালিয়ে গিয়ে প্রথমে কার নিকটে পৌঁছতে হবে তা-ও তোমাদের জানা। মনে আছে তো? তার ঘর মসজিদের ঠিক বিপরীতে। বলল গোয়েন্দা।
আমি জানি- মাহদী আবাদান তার নাম। বলল মেয়েদের একজন।
হ্যাঁ, তোমরা যদি মাহদী পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পার, তাহলে তোমাদেরকে শোবকে পৌঁছিয়ে দেয়ার দায়িত্ব তার। আমার পালাবার প্রশ্নই আসে না। আইউবীর পরিকল্পনা সবই তোমরা শুনেছ। মুসলিম বাহিনীর রওনা হওয়ার তারিখটা মনে রেখ। তারা কোন্ পথে যাবে, তাও ভুলো না। তারা পথ চলবে রাতে। দিনের বেলা তারা নড়াচড়া করবে না। আমি আশা করি, আগেভাগে তথ্যগুলো পৌঁছিয়ে দিতে পারলে আমাদের বাহিনী আইউবীকে পথেই প্রতিরোধ করতে পারবে। আর এটিই আইউবীর একমাত্র ভয়। শোবকে গিয়ে বিশেষভাবে একথাও জানাবে যে, আইউবী মুক্ত মাঠে মুখোমুখি লড়াই করতে ইচ্ছুক নয়। কারণ, তার সৈন্য কম। বলল আলেম গোয়েন্দা।
বৈঠক সমাপ্ত হয়। যার যার মত চলে যান নায়েবগণ। টের পেয়ে দ্রুত আপন আপন জায়গায় গিয়ে বসে তিন গোয়েন্দা। আলেমের পরামর্শে মেয়ে দুটো দুই হাটুর মাঝে মাথা লুকিয়ে বসে থাকে, যেন তারা কিছুই শুনেনি। আশপাশের কোন খবরই তারা রাখে না যেন।
তারা কক্ষে কারো পায়ের আওয়াজ শুনতে পায়। তবু কেউ মাথা তুলছে না। আলী বিন সুফিয়ান আলেম গোয়েন্দার কাঁধে হাত রাখেন। বললেন, উঠ, আমার সঙ্গে চল।
এবার মাথা তুলে তাকায় গোয়েন্দা। মেয়ে দুটোকেও উঠিয়ে আনেন আলী। নিয়ে যান সুলতানের কক্ষে।
