.
দরজা ঘেঁষে বসে সুলতান আইউবীর প্রতিটি শব্দ শুনছে আলেম গোয়েন্দা। মেয়ে দুটোও তার কাছে এসে বসে। সুলতান আইউবীর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পৌঁছে যাচ্ছে শত্রু গোয়েন্দার কানে।
কিন্তু আলী বিন সুফিয়ানের সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই। সম্ভবত গোয়েন্দাদের শোবক পর্যন্ত পৌঁছার সম্ভাবনা ক্ষীণ ছিল বলেই আলী বিন সুফিয়ান কোন সাবধানতা অবলম্বন করেননি। যাদের আজীবন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ধুকে ধুকে মরতে হবে কিংবা জল্লাদের হাতে জীবন দিতে হবে, শত্রুর গুপ্তচর হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে গোপন তথ্য জানতে দেয়ায় ক্ষতি কি।
ইস্, কত মূল্যবান তথ্য! আমরা কেউ যদি এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে আইউবীর এ পরিকল্পনার কথা কার্ক ও শোবকে পৌঁছিয়ে দিতে পারতাম!! সংবাদটা আগেভাগেই জানিয়ে দিতে পারলে কার্কের পথেই গতিরোধ করে মুসলিম বাহিনীর শক্তি নিঃশেষ করে দেয়া যেত। কার্ক পৌঁছার আগেই পরাজিত করা যেত তাদের। কানে কানে ফিসৃফিসিয়ে মেয়েদেরকে বলল গোয়েন্দা।
আমাদের পরিপূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। আগেই যদি ক্রুসেডাররা আমাদের আক্রমণের খবর পেয়ে যায়, তাহলে আমরা কার্ক পৌঁছুতে ব্যর্থ হব। পথেই তারা আমাদের গতিরোধ করবে। ক্রুসেডারদের তুলনায় আমাদের সৈন্যসংখ্যা কম। অস্ত্র-ঘোড়ায়ও আমরা তাদের তুলনায় দুর্বল। তাদের আছে লোহার শিরস্ত্রাণ। আছে বর্ম। যার কারণে আমাদের তীরন্দাজ বাহিনী ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে একাধিকবার।
ক্রুসেডারদের অজান্তেই আমরা কার্ক পৌঁছে যেতে চাই, যাতে তারা খোলা ময়দানে আমাদের মুখোমুখি হতে না পারে। যদি তারা খোলা মাঠে আমাদের মোকাবেলায় আসার সুযোগ পায়, তাহলে পিছনে এসে তারা আমাদের রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দিবে। তখন পরাজয়বরণ ছাড়া আমাদের আর উপায় থাকবে না। কার্ক পৌঁছার জন্য আমি জারিরের টিলা হয়ে অতিক্রম করা পথটি অবলম্বন করব। জারির একটি প্রশস্ত এলাকা। আমার ভয় শুধু একটি-ই যে, ক্রুসেডাররা পথে এসে আমাদের প্রতিরোধ করে বসে কিনা। বললেন, সালাহুদ্দীন আইউবী।
এর মোকাবেলায় আমাদের বাহিনীকে আমরা তিন চারটি দলে বিভক্ত করে নেব। পথ চলব শুধু রাতে। দিনের বেলা নড়াচড়া করব না; লুকিয়ে থাকব নিরাপদ স্থানে। পথে অপরিচিত কোন ব্যক্তি বা কাফেলা চোখে পড়লে, আটকে ফেলব এবং কার্ক পৌঁছা পর্যন্ত সঙ্গে রাখব। শত্রুর গোয়েন্দাবৃত্তির বিরুদ্ধে আমাদের এ পদক্ষেপ সুফল বয়ে আনবে বলে আশা করি। বললেন গোয়েন্দা প্রধান আলী বিন সুফিয়ান।
.
বন্দী খৃষ্টান গুপ্তচর আর মেয়ে দুটো যখন সুলতান আইউবীর মুখ থেকে অতি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ এ তথ্যগুলো শুনছিল, ঠিক সে সময়ে চলছিল শোবক দুর্গে খৃষ্টান রাষ্ট্রপ্রধান ও সেনা কমান্ডারদের জরুরী সভা। সভাসদদের সকলের মুখে বিষণ্ণতার ছাপ। হাতেমুল আকবর নামক এক মিসরী মুসলমানও সভায় উপস্থিত।
সভার কার্যক্রম শুরু হল। বিস্তারিত রিপোর্ট পেশ করছে হাতেম
ক্ষমতাচ্যুতির পর খলীফা আজেদ মারা গেছেন। মিসর এখন বাগদাদের খলীফার অধীনে। খৃষ্টানদের ওফাদার মুসলমান নায়েব সালার রজবও প্রাণ হারিয়েছে রহস্যময়ভাবে। শোবক থেকে রজব যে তিনটি মেয়ে নিয়ে গিয়েছিল, খুন হয়েছে তারাও। খৃষ্টানদের আরেক ওফাদার মুসলিম সেনানায়ক ফয়জুল ফাতেমীও জল্লাদের হাতে মারা পড়েছে। সর্বোপরি দুটি মেয়েসহ যে আলেম গোয়েন্দাকে কায়রো পাঠান হয়েছিল, মেয়েদেরসহ সেও ধরা পড়েছে। তাদের ধরা পড়ার ঘটনা ঠিক এমন সময়ে ঘটল, যখন তাদের মিশন সফল হওয়ার পথে। থামল হাতেম।
সালাহুদ্দীন আইউবীর গোয়েন্দা বিভাগ বড় অভিজ্ঞ ও চৌকস। তাদের হাতে বন্দী মেয়েগুলোকে মুক্ত করে আনা অসম্ভব। আমাদের ভাল ভাল মেয়েগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বলল, কনরাড। কনরাড খৃষ্টানদের বিখ্যাত এক রাষ্ট্রনায়ক ও সেনা কমাণ্ডার।
ক্রুশের স্বার্থে এ ত্যাগ আমাদের দিতেই হবে। জীবন দিতে হবে আমাদেরও। আমাদের যারা এ যাবত ধরা পড়েছে, তাদেরকে ভুলে যাও। তাদের স্থলে নতুন লোক পাঠাও। বলল অপর এক খৃষ্টান রাষ্ট্রনায়ক ও সেনা কমাণ্ডার গাই অফ লুজিনান।
আচ্ছা, এই যে মুসলমানদের হাতে দুটি মেয়ে ধরা পড়ল, এরা কারা? আর ঐ রজবের সঙ্গে মারা যাওয়া মেয়ে তিনটি এসেছিল কোথা থেকে? প্রশ্ন করে লুজিনান।
তাদের দুজন ছিল খৃষ্টান। তারা ইটালীর মেয়ে। অপর তিনজন মুসলমান। শৈশবে তাদের অপহরণ করে আনা হয়েছিল। তারা বেশ রূপসী মেয়ে ছিল। তারা যে মুসলিম বাবা-মার সন্তান, তা তারা ভুলেই গিয়েছিল। শিশুকাল থেকেই তাদের গোয়েন্দাবৃত্তির প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল। কাজেই এক সময়ে মুসলমান ছিল বলে তারা আমাদেরকে ধোঁকা দিয়েছে, এমন সন্দেহ করার কোন অবকাশ নেই। গোয়েন্দা প্রধান জবাব দেয়।
ছিল-ই বা মুসলমান, তাতে কি? বলল কনরাড। হাতেমুল আকবরের প্রতি ইঙ্গিত করে কনরাড বলল, এই যে আমাদের প্রিয় বন্ধু হাতেমও তো মুসলমান। নিজ ধর্মের প্রতি অনুরাগ নেই কি তার? তারপরও তো সে আমাদের আপন!
হাতেমের হাতে মদের গ্লাস ধরিয়ে দিয়ে কনরাড আরো বলে, আমাদের হাতেম জানে যে, সালাহুদ্দীন আইউবী মিসরকে দাসত্বের শৃংখলে আটকাতে চায় এবং ইসলামের নামে তামাশা করছে। আমরা মিসরকে স্বাধীন করতে চাই। তার প্রথম পদক্ষেপ হল, আমরা সালাহুদ্দীন আইউবীকে মিসরে এক মুহূর্তের জন্য সুস্থির হয়ে বসতে দেব না।
