দাঁড়ালেন আরেকজন। কথা বলতে চাইলেন তিনি। কিন্তু সুলতান আইউবী হাতের ইশারায় তাকে বসিয়ে দিলেন এবং বললেন
আমি এমন কথা-ই শুনতে চেয়েছিলাম। আপানাদের যারা আমার কাছে থাকেন, তারা জানেন যে, আমার প্রথম লক্ষ্য ফিলিস্তীন। মিসরের শাসনক্ষমতা হাতে নেয়ার পর পরই আমি ফিলিস্তীন আক্রমণ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দু বছরেরও অধিক সময় কেটে গেছে। বিশ্বাসঘাতকরা আমাকে মিসরে এতই ব্যস্ত রেখেছে, যেন আমি পাকে আটকে গেছি। বিগত দুটি বছরের ঘটনাবলী নিয়ে একটু ভাবুন। সন্ত্রাসী খৃষ্টান ও গাদ্দারদের সঙ্গে আপনারা যুদ্ধ করেছেন। যারা সুদানীদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়েছে, তারা আমাদেরই লোক। সুদানী সৈন্যদের দিয়ে যে ব্যক্তি মিসর আক্রমণ করিয়েছে, সে ছিল আমাদের-ই কমান্ডার। সে সেই জাতীয় কোষাগার থেকে বেতন গ্রহণ করত, যে কোষাগারে জনগণের অর্থ আছে, আছে আল্লাহর নামে প্রদত্ত যাকাতের পয়সা। গুপ্তচর, গুপ্তচরদের আশ্রয় ও সাহায্যদাতা এবং ঈমান বিক্রেতাদের খতম করে ফিলিস্তীন আক্রমণ করব, এ আশায় আমি দুটি বছর কাটিয়েছি। কিন্তু আমার দু বছরের অভিজ্ঞতা, এই নাশকতার ধারা কখনো বন্ধ হবে না। আমরাই আমাদের মধ্যে গাদ্দার সৃষ্টি করার সুযোগ করে দিচ্ছি …।
আজ আমি আপনাদের একথা বলার জন্য একত্রিত করেছি যে, ফিলিস্তীন আক্রমণে আমি আর বেশী বিলম্ব করব না। আপনারা সৈন্যদের সামরিক মহড়া ও প্রশিক্ষণ জোরদার করুন। মুজাহিদদেরকে দীর্ঘ সময়ের অবরোধ পরিচালনার ট্রেনিং দিন। তুর্কী এবং সিরীয় বাহিনীর উপর আমি অধিক আস্থাশীল। মিসরী ও ওফাদার সুদানীদের মধ্যে আরো চেতনা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। প্রয়োজন তাদের আরো দক্ষ করে গড়ে তোলা। তাদের মনে শত্রু-বিরোধী ক্ষোভ সৃষ্টি করুন, আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করুন। তাদেরকে বুঝিয়ে বলুন যে, যেসব নারী ক্রুসেডারদের হিংস্রতার শিকার হচ্ছে, তারা তোমাদের-ই বোন-কন্যা। মসজিদের ইমামদেরকে বলুন, যেন তারা জনসাধারণের সামনে জিহাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং যুবকদের মধ্যে জিহাদী স্পৃহা সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন। কোন ইমাম বা খতীব যদি ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির ভুল ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে তাকে ইমামতের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিন। আমাদের নীতি-আদর্শ মজবুত থাকলে কোন যাদুমন্ত্র, কোন প্রতারণা আমাদেরকে বিভ্রান্ত করতে পারবে না। মানুষের মন-মস্তিষ্ককে বেকার থাকতে দেবেন না; তাদেরকে একটা না একটা মহৎ কাজে জড়িয়ে রাখুন। অন্যথায় শত্রুরা তাদেরকে ব্যবহার করার সুযোগ পাবে। খুব শীঘ্ৰ আপনারা বাকী নির্দেশনা পেয়ে যাবেন। সৈন্যরা কবে রওনা হবে, তাও অচীরে জানাব। আল্লাহ আপনাদের সহায় হোন।
***
সাতদিন পর।
সুলতান আইউবী আলেম গুপ্তচর এবং মেয়ে দুটোকে তলব করেন। হাজির করা হয় তাদেরকে আইউবীর সামনে। সুলতান তাদেরকে পাশের কক্ষে বসিয়ে রাখতে বললেন। তাদের পায়ে বেড়ী, হাতে শিকল।
সুলতান আইউবীর খাস কামরার পাশের কক্ষে তাদের বসিয়ে রাখা হল। দু কামরার মাঝে একটি দরজা। দরজার একটি কপাট সামান্য খোলা।
কক্ষে পায়চারী করছেন সুলতান আইউবী। মাথা ঝুঁকিয়ে পায়চারী করতে করতে সুলতান বললেন, আমি অতি শীঘ্র কার্ক আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
কার্ক ফিলিস্তীনের দুর্গসম একটি জনপদ। আরেক প্রসিদ্ধ নগরীর নাম শোবক। শোবকও একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ। ফিলিস্তীন দখলের পর শোবক এখন ক্রুসেডারদের প্রাণকেন্দ্র। খৃষ্টান রাজা ও উচ্চপদস্থ কমান্ডাররা শোবকেই একত্রিত হয়। এটাই ক্রুসেডারদের ইন্টেলিজেন্স-এর হেডকোয়ার্টার। গোয়েন্দাদের ট্রেনিংক্যাম্পও এটিই।
সুলতান আইউবী ফিলিস্তীন উদ্ধারের জন্য সর্বপ্রথম শোবক আক্রমণ করবেন, আইউবীর সেনাবাহিনী এবং প্রশাসন কর্মকর্তাদের এটাই ছিল বদ্ধমূল ধারণা। তাদের ধারণায় কৌশলগত দিক থেকে এটাই হবে সঠিক সিদ্ধান্ত। খৃষ্টানদের কোমর ভেঙ্গে দেয়ার জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ শক্ত ঘাঁটিটি ছিনিয়ে আনা-ই যথেষ্ট। কিন্তু সুলতান বলছেন, তিনি কিনা কার্ক আক্রমণ করবেন আগে, অথচ গুরুত্বের দিক থেকে কার্কের অবস্থান দ্বিতীয় পর্যায়ে।
মুখ খুললেন এক নায়েব সালার। বিনীত কণ্ঠে বললেন, মুহতারাম! আপনার আদেশ শিরোধার্য। কিন্তু আমার পরামর্শ, আগে শোবক আক্রমণ করা হোক। শত্রুর কেন্দ্রীয় কমান্ড আগে খতম করা জরুরী। শোবক হাত করার পর কার্ক দখল করা কঠিন হবে না। আমরা যদি সব শক্তি কার্কেই ব্যয় করে ফেলি, তাহলে শোবক দখল করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে।
আলেম গুপ্তচর পাশের কক্ষে উপবিষ্ট। সুলতান আইউবীর কক্ষের সব কথাবার্তা পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে গোয়েন্দার কক্ষ থেকে। কান খাড়া হয় গোয়েন্দার। পা টিপে টিপে এগিয়ে এসে দরজা ঘেঁষে বসে সে। সুলতানের পরিষ্কার কণ্ঠ শুনতে পেল গোয়েন্দা
আমি ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে চাই। শোবকের তুলনায় কার্ক সহজ শিকার। কার্ক দখল করে তাকেই আমি কেন্দ্র বানাব। কার্ক আক্রমণে অংশগ্রহণকারী সৈন্যদেরকে কিছুদিন বিশ্রামের সুযোগ দিয়ে অতিরিক্ত রিজার্ভ সৈন্য তলব করে পূর্ণ প্রস্তুতির পর আমি শোবক আক্রমণ করব। আমাদের গোয়েন্দাদের রিপোর্ট মোতাবেক শোবকের প্রতিরোধ ব্যবস্থা এত শক্ত যে, দীর্ঘদিন পর্যন্ত আমাদেরকে তা অবরুদ্ধ করে রাখতে হবে। আমার ধারণা, কার্কে আমাদের বেশী শক্তি ব্যয় হবে না। আগে আমাদের একটি ক্যাম্প প্রয়োজন। প্রয়োজন রসদ মজুদের এমন একটি নিরাপদ জায়গা, যেখান থেকে সময়মত রসদ সগ্রহ করতে আমাদের বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হবে না।
