.
পরদিন দুপুরের আহারের পর। সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের সকল কর্মকর্তা সালাহুদ্দীন আইউবীর সভাকক্ষে উপস্থিত। দুটি মেয়েসহ এক খৃষ্টান গোয়েন্দার গ্রেফতারীর সংবাদ তারা আগেই জেনেছেন। সভাকক্ষে বসে কানাঘুষা করছে তারা। ইত্যবসরে সালাহুদ্দীন আইউবী কক্ষে প্রবেশ করেন। গভীর দৃষ্টিতে এক নজর দেখে নিলেন গোটা কক্ষটি। যেন কাউকে খুঁজছেন তিনি।
নির্দিষ্ট আসনে বসলেন আইউবী। বললেন
বন্ধুগণ! আপনারা শুনে থাকবেন যে, একটি মসজিদ থেকে আমরা এক খৃষ্টান গুপ্তচরকে গ্রেফতার করেছি। লোকটি সেই মসজিদে নিয়মিত ইমামতি করত।
লোকটাকে কিভাবে ধরা হল, আইউবী তার বিবরণ দেন। গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে সে আলী বিন সুফিয়ানকে কী বলেছে, তাও বর্ণনা করেন।
সালাহুদ্দীন আইউবী বললেন
আপনারা গুপ্তচর ও সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন, এ উপদেশ দেয়ার জন্য আমি আজ আপনাদেরকে সমবেত করিনি। আজ আমি আপনাদেরকে একথাও বলব না যে, যারা ইসলামের দুশমনদের সাথে বন্ধুত্ব করে, তারা জাহান্নামে যাবে। শুধু একথাটি বলার জন্য আমি আপনাদের কষ্ট দিয়েছি যে, কাফিরদের সাথে যারা বন্ধুত্ব করে, তাদের জন্য দুনিয়াটাকে আমি জাহান্নামে পরিণত করব। এখন আর কোন গাদ্দারকে আমি মৃত্যুদন্ড দেব না, মৃত্যু তো মুক্তির-ই একটি মাধ্যম। এখন থেকে গাদ্দারের শাস্তি হবে, তাদের গলায় রশি বেঁধে সামনে একটি পিছনে একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে প্রতিদিন বাজারে বাজারে ঘুরিয়ে পরে চৌরাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হবে। সাইনবোর্ডে লিখা থাকবে আমি গাদ্দার। এভাবে তাদের প্রত্যহ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চৌরাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হবে। ক্ষুৎপিপাসায় কাতর হয়ে ধুকে ধুকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার পর তার লাশ নিক্ষেপ করা হবে শহরের বাইরে কোন এক নর্দমায়। কাউকে জানাযা-দাফন করতেও দেয়া হবে না …।
কিন্তু বন্ধুগণ! এতে দুমশনের তেমন কোন ক্ষতি হবে না। তারা নতুন গাদ্দার তৈরি করে নেবে। যতদিন তাদের কাছে রূপসী নারীর অশ্লীলতা, অর্থ-কড়ি, সোনা-দানার প্রাচুর্য আর আমাদের কাছে ঈমানের কমতি থাকবে, ততদিন পর্যন্ত তারা গাদ্দার সৃষ্টি করতেই থাকবে। আপনার দুশমন আপনার মসজিদে বসে, আপনার কুরআন হাতে নিয়ে আপনার নবীর আদর্শকে বিকৃত করছে। একি আপনার আত্মমর্যাদার প্রতি চ্যালেঞ্জ নয়? ক্রুসেডাররা যেসব মেয়েকে গুপ্তচরবৃত্তি আর আমাদের চরিত্র ধ্বংসের জন্য এদেশে পাঠায়, তাদের অনেকে মুসলমানের-ই সন্তান। মা-বাবার কোল থেকে ছিনিয়ে এনে অপকর্মের লজ্জাকর প্রশিক্ষণ দিয়ে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে তাদের। ফিলিস্তীন এখন কাফেরের কজায়। সেখানকার মুসলমানরা চরম নির্যাতনের শিকার। কঠিন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে তারা। তাদের ঘর-বাড়ি লুটে নিচ্ছে ক্রুসেডাররা। প্রতিবাদ করলে তাদের নিক্ষেপ করা হয় কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। অপহরণ করা হচ্ছে কিশোরীদের। সুন্দরীদের বেছে বেছে তাদের চিন্তা চেতনা থেকে ইসলাম ও দেশপ্রেম বিলুপ্ত করে অশ্লীলতার প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। আঙ্গুলের ইশারায় পুরুষদের নাচাতে শিখে তারা। তারপর গুপ্তচরবৃত্তি আর নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য পাঠান হয় আমাদের দেশে।
ক্রুসেডারদের ফিলিস্তীন কজা করার পর সেখানকার মুসলমানদের জীবন এখন বিপন্ন। বেঁচে থাকার অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত। খৃষ্টানরা পাইকারীহারে হত্যা করে মুসলমানদের। লুটে নেয় তাদের সহায়-সম্পদ। মসজিদগুলোকে পরিণত করে গীর্জা আর ঘোড়ার আস্তাবলে। যুবতী মেয়েদেরকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে যারা অধিক রূপসী, নাশকতা আর বেহায়পনার প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের ঢুকিয়ে দেয়া হয় আমাদের আমীর-উজীরদের হেরেমে। তাদের ব্যবহার করা হয় আমাদের বিরুদ্ধে। মুসলিম মেয়েদের গলায় ক্রুশ পর্যন্ত ঝুলিয়ে দেয় তারা। নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে পলায়নপর মুসলিম ভাইদেরকেও হত্যা করে পথে। আমাদের বোন-কন্যাদের ইজ্জত লুণ্ঠন করে।
আমার কালেমায় বিশ্বাসী বন্ধুগণ! সেই ধারা এখনো বন্ধ হয়নি। ফিলিস্তীনে এখনো সমানগতিতে চলছে মুসলিম নির্যাতনের স্টীমরোলার। ক্রুসেডারদের একটি-ই লক্ষ্য মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করা। তারা চায়, মুসলিম মেয়েরা খৃষ্টান সন্তান জন্ম দিক।
কিন্তু আমরা এখনো চুপ করে বসে আছি। ক্রুসেডারদের বর্বরতার শিকার হয়ে। শাহাদাত বরণকারী ভাইদের কথা আমরা ভুলে গেছি। এর চেয়ে বড় পাপ আর কী হতে পারে। কোন আদেশ করার আগে আমি আপনাদের জিজ্ঞেস করতে চাই, এ পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী? আপনাদের মধ্যে অভিজ্ঞ সৈনিক আছেন, আছেন প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দও। বলুন, আমরা কী করতে পারি।
আমীরে মেসের! আপনার আদেশের প্রয়োজন-ই বা কি। এতো আল্লাহর-ই নির্দেশ যে, প্রতিবেশী দেশের মুসলমান নির্যাতনের শিকার হলে তাদের উদ্ধার করার জন্য জালিমের সঙ্গে লড়াই করা ফরজ। কালবিলম্ব না করে এক্ষুণি আমাদের ফিলিস্তীনে অভিযান প্রেরণ করা উচিত। প্রবীণ এক কমাণ্ডার বললেন।
নায়েব সালার পর্যায়ের অপর এক ব্যক্তি উঠে উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, কাফিরদের বিরুদ্ধে অভিযান প্রেরণের আগে আপনি ঐসব মুসলিম শাসক ও আমীরদের শায়েস্তা করুন, যারা নেপথ্যে থেকে কাফিরদের হাত শক্ত করছে। আমাদের জন্য লজ্জাকর বিষয় যে, আমাদের সারিতে গাদ্দারও আছে। ফয়জুল ফাতেমীর মত উচ্চপদের মানুষ যদি গাদ্দার হতে পারে, তাহলে নিমপদের লোকদের উপর ভরসা কি? একটি মুসলিম কিশোরীর শ্লীলতাহানীর প্রতিশোধের জন্য সমগ্র জাতি জীবন বিলিয়ে দেয়া দরকার। অথচ এদেশে আমাদের গোটা জাতির শ্লীলতাহানী চলছে আর আমরা কিনা এখনো ভাবছি, আমাদের কর্তব্য কী? ক্রুসেডাররা আমাদের মেয়েদেরকে অপকর্মের প্রশিক্ষণ দিয়ে আমাদের দিয়েই তাদের সঙ্গে কুকর্ম করাচ্ছে। মুহতারাম আমীরে মেসের! আমি যদি আবেগপ্রবণ না হয়ে গিয়ে থাকি, তাহলে আমাকে এ প্রস্তাব পেশ করার অনুমতি দিন যে, ফিলিস্তীন আমাদের উদ্ধার করতেই হবে। ক্রুসেডাররা আমাদের প্রথম কেবলাকে কুকর্মের আস্তানায় পরিণত করেছে, এর চেয়ে যন্ত্রণার বিষয় আর কি হতে পারে!
