দীর্ঘদিন যাবত আমরা তোমাদের মূল চিন্তাধারাকে ধ্বংস করে আসছি। আমরা জানি, পৃথিবীতে মাত্র দুটি ধর্ম টিকে থাকবে। খৃষ্টবাদ ও ইসলাম। আর দুটির যে কোন একটি খতম না হওয়া পর্যন্ত তাদের পরস্পর লড়াই অব্যাহত থাকবে। আমরা জানি, তীর-তরবারী দ্বারা কোন ধর্মকে-ই বিলুপ্ত করা যায় না। প্রচারণার মাধ্যমেও নয়। এর একটি মাত্র পথ, যা আমরা অবলম্বন করেছি। মনে রেখ, এ অভিযানে আমি একা নই। আমরা বিশাল এক বাহিনী তোমাদের চিন্তাধারার উপর হামলা চালিয়ে আসছি।
আলী বিন সুফিয়ান বন্দী গোয়েন্দার সামনে পায়চারী করছেন। গভীর মনোযোগ সহকারে শুনছেন তার বক্তব্য। বুঝলেন, লোকটি সাধারণ গোয়েন্দাদের চেয়ে ব্যতিক্রম। এর মুখ থেকে তথ্য বের করা কঠিন ব্যাপার। তাই তিনি কৌশল পরিবর্তন করলেন।
.
গোয়েন্দার পায়ে বেড়ী, হাতে হাতকড়া। কয়েদখানার একজন রক্ষীকে ডাকলেন আলী। বন্দী গোয়েন্দার পায়ের বেড়ী আর হাতকড়া খুলে দিতে বললেন। বন্দীর খানাপিনার ব্যবস্থা করার আদেশ দেন।
আমার এই আচরণকে কথা নেয়ার কৌশল মনে কর না। আমরা আলেমদের কদর করি। হোক সে যে কোন ধর্মের। আমি আর কিছুই জানতে চাইব না তোমার কাছে। ইচ্ছে হলে তুমি কিছু বলতে পার। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
আমি তোমাকে ইজ্জত করি আলী! আমি তোমার অনেক প্রশংসা শুনেছি। তুমি যেমন যোগ্য, তেমনি আদর্শবান। এর চেয়ে বড় মর্যাদা আর কী হতে পারে যে, স্বয়ং খৃষ্টান রাজারা তোমাকে খুন করাতে চান? এর মানে তো এই-ই যে, তুমি আইউবী জঙ্গীর সমমর্যাদার লোক! শোন আলী! কোন জাতির ধর্ম আর তাহযীব-তামাদুন ধ্বংস করার জন্য সেনা অভিযান আর যুদ্ধ-বিগ্রহের প্রয়োজন পড়ে না। যৌনতার আগুন জ্বালিয়েই একটি জাতিকে নিঃশেষ করতে হয় তিলে তিলে। এ আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা। বিশ্বাস যদি না হয়, তাহলে তোমাদের মুসলিম শাসকদের অবস্থাটা একটু দেখে নাও। তোমাদের রাসূল বলে গেছেন, নিজের প্রবৃত্তিকে খুন কর; এটা সব অনিষ্টের মূল। কিন্তু তোমার জাতি কবে পর্যন্ত এর উপর আমল করেছে? রাসূল যে কদিন জীবিত ছিলেন, সে কদিন-ই তো? ইহুদীরা তাদের সুন্দরী মেয়েদের দিয়ে তোমার জাতিকে উত্তেজিত করেছে। তাই তোমার জাতি আজ প্রবৃত্তির দাস। তোমাদের যার হাতে সম্পদ আছে, নারীদের দিয়ে সে হেরেম পূর্ণ করে আগে। কি ধনী, কি গরীব প্রত্যেক মুসলমান ঘরে চারটি করে বউ রাখতে চায়। মাওলানা মৌলভীর রূপ ধরে ইহুদীরা তোমাদের চিন্তা-চেতনায় পাশবিকতা ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমি হলফ করে বলতে পারি, মুসলমানরা যদি তাদের নবীর আদর্শ অনুসরণ করত, তবে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার তিন চতৰ্থাংশ-ই হত মুসলমান। কিন্তু, তা হয়নি। যে কজন আছে, তারাও নামে মাত্র মুসলমান। তোমাদের রাজত্ব দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। আমার মত আলেমরা তোমাদের ধর্ম ও তাহযীব-তামাদুনের উপর যে হামলা চালিয়ে আসছে, এ তারই প্রতিফল।
শোন বন্ধু! এ হামলা কখনো বন্ধ হবে না। আমি ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি, একদিন এ পৃথিবীতে ইসলাম থাকবে না। থাকেও যদি, থাকবে পৌরাণিক এক সংস্কার হিসেবে। নারী আর মদে মাতাল হয়ে থাকবে তার অনুসারীরা। যে কেউ তো আর সালাহুদ্দীন আইউবী, নুরুদ্দীন জঙ্গী হতে পারে না! কাল-পরশু তাদেরকে মরতেই হবে। তারপরে যারা আসবে, আমরা তাদেরকে প্রবৃত্তিপূজায় মাতিয়ে তুলব। আমাকে তুমি হত্যা করতে পার আলী! কিন্তু আমার মিশনকে হত্যা করা তোমার সম্ভব নয়। মানুষের মৃত্যুতে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য মরে না। তোমার হাতে আমি খুন হলে আমার জায়গায় আরেকজন আসবে। বন্ধু! ইসলামকে বিলুপ্ত করে কিংবা মুসলমানদেরকে আমাদের তাবেদারে পরিণত করেই তবে আমরা ক্ষান্ত হব। আমার আর কিছু বলার নেই। এবার তুমি ইচ্ছে করলে আমাকে জল্লাদের হাতে তুলে দিতে পার।
আলী বিন সুফিয়ান গোয়েন্দাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করেননি। তিনি গভীর চিন্তায় নিমগ্ন। এক অপার্থিক গাম্ভীর্য তার চেহারায়। গোয়েন্দার বক্তব্যে কি এক কঠিন, কত স্পর্শকাতর চিত্র ফুটে উঠেছে তার সামনে। তা-ই বোধ হয় ভাবছিলেন তিনি। কল্পনার পাখায় ভর করে দেশময় ছুটে চললেন আলী। চোখ ঘুরিয়ে নতুন করে দেখে নিলেন দেশের মুসলমানদের বাস্তব চিত্রটা। খৃষ্টান গোয়েন্দার বক্তব্যের সত্যাসত্য যাচাই করলেন বাস্তবতার নিরিখে। না, গোয়েন্দার বক্তব্য একতিলও মিথ্যে নয়। বর্ণে বর্ণে সত্য তার প্রতিটি কথা। মুসলিম জাতির মধ্যে নৈতিক অধঃপতনের জীবাণু আসলেই ঢুকে পড়েছে। আরবের আমীর-উজীরগণ তো পুরোপুরি ধ্বংস হয়েই গেছে। যুদ্ধের ময়দানে খৃষ্টানদের পরাজিত করে ইসলামী সালতানাতকে আরো বিস্তৃত করার স্বপ্ন দেখছেন সালাহুদ্দীন আইউবী। কিন্তু খৃষ্টানরা এমন এক দিক থেকে আক্রমণ করে বসেছে, যা প্রতিরোধ করা সুলতান আইউবীর সাধ্যের অতীত বলে মনে হচ্ছে আমার।
আলেম গোয়েন্দার কুঠরী বন্ধ করিয়ে আলী বিন সুফিয়ান বন্দী মেয়ে দুটোর কক্ষের সামনে এসে দাঁড়ান। একটি কক্ষের দরজা খুলিয়ে ভিতরে প্রবেশ করেন তিনি। বিছানায় বসা ছিল মেয়েটি। আলী বিন সুফিয়ানকে দেখে দাঁড়িয়ে যায় সে। আলী চুপচাপ গভীরভাবে দেখে নেন মেয়েটিকে। তারপর কিছুই না বলে নীরবে বেরিয়ে যান কক্ষ থেকে। বন্ধ করে দেয়া হয় কক্ষের দরজা।
