.
তিনজনকে বন্দী করে রেখে তদন্ত শুরু করলেন আলী বিন সুফিয়ান। প্রথমে সেই এলাকায় গিয়ে খোঁজ নিলেন, লোকটি কিভাবে এই মসজিদের দখলদারিত্ব হাতে নিল এবং তার আগে সে যে ঝুপড়িতে বাস করত, তা তাকে কে দিয়েছিল?
স্থানীয় লোকদের বিবরণে আলী জানতে পারলেন যে, দুই স্ত্রীসহ লোকটি এ অঞ্চলে আসে। প্রথমে একজনের ঘরে মেহমান হয়ে থাকে কিছুদিন। ধীরে ধীরে মানুষ যখন বুঝতে পারল যে, লোকটি আসলে বড় একজন আলেম, তখন স্ত্রীদেরসহ বসবাসের জন্য তাকে ঐ ঝুপড়িটি দেয়া হয়। নামায পড়তে আসতেন তিনি এ মসজিদে। আস্তে আস্তে ভাব গড়ে তোলেন মসজিদের ইমামের সঙ্গে।
পনের-ষোলদিন পর মসজিদে নামাযের মধ্যে-ই ইমাম সাহেবের পেটব্যাথা শুরু হয়। ধীরে ধীরে ব্যাথা এত তীব্র আকার ধারণ করে যে, এখন আর মসজিদে আসতেই পারছেন না। ডাক্তাররা ঔষধ দেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। তৃতীয় দিনে প্রচন্ড ব্যাখ্যা নিয়ে-ই ইমাম সাহেব মারা যান।
এ সুযোগে উক্ত আলেম মসজিদের ইমামতির দায়িত্ব হাতে নেয়। অল্প কদিনের মধ্যে সে সমাজে এমন প্রভাব বিস্তার করে যে, মুসল্লিরা তার ভক্ত হয়ে যায় এবং স্ত্রীদের নিয়ে বাস করার জন্য একটি ঘর দিয়ে দেয়।
আলী বিন সুফিয়ানের প্রশ্নের জবাবে লোকেরা জানায়, তারা একাধিকবার তাকে পুরাতন ইমামের জন্য খাবার নিয়ে যেতে দেখেছে। আলী বিন সুফিয়ান বুঝে ফেললেন, লোকটি ইমাম সাহেবকে বিষ খাইয়েছে এবং পথের কাঁটা সরিয়ে নিজে মসজিদের দখলদারিত্ব হাত করেছে।
গোয়েন্দা ইমামের বাসভবনে তল্লাশী চালান হল। পাওয়া গেল বিপুলসংখ্যক অস্ত্র। অস্ত্রগুলো লুকিয়ে রাখা ছিল ভবনের বিভিন্ন জায়গায়। পাওয়া গেল পুটুলীভরা বিষ। বিষগুলো খাওয়ান হল একটি কুকুরকে। বিষ খেয়ে কুকুরটি অস্থির হয়ে পড়ে। উলট পালট করতে থাকে তিনদিন পর্যন্ত। তৃতীয় দিন সন্ধ্যায় কুকুরটি মারা যায়।
আলী বিন সুফিয়ান তদন্ত রিপোর্ট পেশ করলেন আইউবীর সামনে। রিপোর্ট শুনে আইউবী বললেন
বন্দীদশায় ওদেরকে অস্থির করে তোল, ভীত-সন্ত্রস্ত করে রাখ সারাক্ষণ। কিন্তু আমি ওদেরকে জল্লাদের হাতে দেব না, কয়েদখানায়ও ফেলে রাখব না।
কী করবেন তাহলে? জিজ্ঞেস করলেন আলী।
মুক্তি দিয়ে আমি ওদেরকে সসম্মানে ফেরত পাঠাব। বললেন আইউবী।
আলী বিন সুফিয়ান বিস্ময়ভরা অপলক নেত্রে তাকিয়ে রইলেন আইউবীর প্রতি।
আইউবী বললেন, আমি একটি জুয়া খেলতে চাই, আলী!
এখন আমাকে কিছু জিজ্ঞেস কর না। আমি ভাবছি, এই বাজি লাগাব কি না।
খানিক নীরবতার পর তিনি আবার বললেন, আগামীকাল দুপুরের আহারের পর নায়েব সালার, উপদেষ্টা ও উচ্চ পর্যায়ের কমাণ্ডার এবং প্রশাসনের প্রত্যেক বিভাগীয় কর্মকর্তাদেরকে আমার কাছে নিয়ে আসবে। তুমিও থাকবে।
***
দিন শেষে রাত এল। আলী বিন সুফিয়ান এই প্রথমবারের মত বন্দী আলেমকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। কিন্তু বুঝা গেল, লোকটি বড় কঠিনপ্রাণ। আলীর এক প্রশ্নের জবাবে আলেম বলল
মনোযোগ সহকারে আমার কথাগুলো শোন আলী বিন সুফিয়ান! আমরা দুজন একই ময়দানের সৈনিক। তুমি যদি আমার দেশে ধরা পড়, তাহলে আমার তো বিশ্বাস, তুমি জীবন দেবে, তবু দেশ ও জাতিকে ধোঁকা দেবে না! আমাকে তুমি একই রকম মনে কর। আমি জানি, আমার পরিণতি কী হবে। আমার কাছে তুমি যা কিছু জানতে চাও, যদি আমি সব বলেও দিই, তবু তোমরা আমাকে ক্ষমা করবে না। জল্লাদের হাতে হোক কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়ে হোক এই অন্ধকার কুঠরিতেই আমাকে মরতে হবে। তাহলে বল, জাতির সঙ্গে প্রতারণা কেন করব আমি?
আমার আশা, তুমি তোমার ইচ্ছার পরিবর্তন ঘটাবে। কেন, মেয়ে দুটোর সম্ভ্রম রক্ষার খাতিরেও কি তুমি মুখ খুলবে না?
সম্ভ্রম? ওদের সম্ভ্রম বলতে কিছু নেই। সম-সতীত্বের বিসর্জন দেয়ার প্রশিক্ষণ দিয়ে-ই ওদের মাঠে নামান হয়। আমরা জীবন আর সম্ভ্রম দূরে ছুঁড়ে ফেলে আসি। ওদের আছে শুধু রূপ আর পুরুষের মনকাড়া ছলনা। এ-ই ওদের সম্পদ। এ দিয়েই ওরা পাথরকে মোমে পরিণত করে। ওদের সঙ্গে তোমরা যা ইচ্ছে করতে পার। আমার চোখের সামনে ওদের অপমান করলেও আমি কিছু বলব না। ওরাও আপত্তি করবে না।
গোয়েন্দা মেয়েদেরকে আমরা মৃত্যুদন্ড দিয়ে থাকি- অপমান করি না। আমাদের ধর্ম আমাদেরকে নারী নির্যাতনের অনুমতি দেয় না। বললেন আলী বিন সুফিয়ান।
দোস্ত! মমতার লোভ দেখাও বা নির্যাতনের ভয় দেখাও, কোন অস্ত্র-ই তোমার সফল হবে না। আমাদের কারুর মুখ থেকে আমাদের সে সহকর্মীদের নাম-পরিচয় উদ্ধার করতে তুমি পরবে না, যারা তোমাদের শাসন ক্ষমতার শীর্ষস্থান দখল করে আছে। বন্দী মেয়েদের সঙ্গে তুমি সদ্ব্যবহারের ওয়াদা করেছ। এর বিনিময়ে আমি তোমাকে এতটুকু বলতে পারি যে, এটা তোমার-আমার লড়াই নয়। এ লড়াই ক্রুসেড বনাম চাঁদ-তারার লড়াই। আমি সাধারণ গোয়েন্দা নই যে, এদিকের খবর ওদিকে, ওদিকের খবর এদিকে আদান-প্রদান করব। আমি গোয়েন্দা বিভাগের একজন শীর্ষ অফিসার। আমি আলেম। খৃষ্ট ও ইসলাম উভয় ধর্মে সমান পারদর্শী। ইঞ্জীল ও কুরআন উভয় গ্রন্থের তলা পর্যন্ত হাতড়িয়েছি। আমি স্বীকার করি, তোমাদের ধর্ম শ্রেষ্ঠ ও সরল-সহজ। ইসলাম সব মানুষের ধর্ম। কোন জটিলতা, নেই এতে। আর ইসলামের গ্রহণযোগ্যতার কারণও এটাই। কিন্তু পাশাপাশি তোমাদেরকে আমি এ কথাও বলে দিতে চাই যে, শত্রুরা তোমাদের ধর্মের মৌলিকত্ব নষ্ট করে দিচ্ছে, যাতে এর গ্রহণযোগ্যতা বিনষ্ট হয়। মুসলমান আলেমের বেশ ধারণ করে ইসলামের মধ্যে বহু ভিত্তিহীন বর্ণনা ঢুকিয়ে দিয়েছে তোমাদের শত্রুরা। ইসলাম ছিল কুসংস্কারবিরোধী ধর্ম। কিন্তু এখন সবচেয়ে বেশী কুসংস্কারাচ্ছন্ন জাতি হল মুসলমান। চন্দ্রগ্রহণ, সূর্য গ্রহণের সময় মুসলমানদের আমি সেজদা করতে দেখেছি। দেখেছি এ সময় নজরানা দিতে। তাছাড়া এমন বহু বেদআত আছে, যাকে মুসলমানরা দ্বীনের অংশ বলে বিশ্বাস করে। বলল, গোয়েন্দা আলেম।
