আলী বিন সুফিয়ান যখন তাঁকে অবহিত করেন যে, এক মসজিদের পেশ ইমাম প্রতি রাতে মসজিদে দস দিচ্ছেন এবং ইসলামী চিন্তাধারাকে বিকৃত করছেন, তখন আইউবী সঙ্গে সঙ্গেই তাকে গ্রেফতার করে আনার আদেশ দেননি। রিপোের্ট শুনে তিনি বলেছিলেন, আলী! ধর্ম নিয়ে ফের্কাবাজি শুরু হয়েছে। এই ইমামও কোন এক ফেরকার লোক হবেন হয়ত। এমনও হতে পারে যে, তিনি কুরআনের নিজস্ব ব্যাখ্যা ই পেশ করছেন। ধর্মের ব্যাপারে আমি হস্তক্ষেপ করতে চাই না। আমি শাসক, আলেম নই। লোকটিকে যদি তুমি কুচক্রী মনে কর, তাহলে গ্রেফতার করার আগে উত্তমরূপে যাচাই করে দেখ। একজন ইমামের মর্যাদা আমার চেয়ে অনেক উঁচু।
আলী বিন সুফিয়ান দ শুনতে নিজে সেই মসজিদে যাননি। তার সন্দেহ ছিল যে, যদি এই ইমাম সত্যি-ই দুশমনের নিয়োজিত কুচক্রী-ই হয়ে থাকে, তাহলে সে তাকে চিনে থাকবে নিশ্চয়। তাই তিনি কয়েকজন বিচক্ষণ গুপ্তচরকে মসজিদে প্রেরণ করেন। তারা দশ-বার বার মসজিদে যায় এবং যে দস শোনে, তা আনুপূর্বিক আলী বিন সুফিয়ানকে শোনায়। সর্বশেষ এক রাতে ইমাম জিহাদের উপর এক দর্স প্রদান করেন এবং জিহাদের ভিন্নধর্মী ব্যাখ্যা পেশ করেন। গুপ্তচররা আলী বিন সুফিয়ানের নিকট রিপোর্ট করে। আলী বিন সুফিয়ান রিপোর্টটি আইউবীকে শোনান এবং অভিমত পেশ করেন যে, এই লোকটি যদি ক্রুসেডারদের চর কিংবা সন্ত্রসী না-ও হয়, তবু তাকে গ্রেফতার করা কিংবা নিবৃত্ত করা জরুরী। কারণ, সে জিহাদের এমন দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করছে, যা কেবল সেই ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব, যে হয়ত শত্রুপক্ষের লোক অন্যথায় মাতাল।
সালাহুদ্দীন আইউবী বেশ মনোযোগ সহকারে রিপোর্টটি শ্রবণ করেন এবং বলেন, ঘটনা যা-ই হোক, বিষয়টি বড় স্পর্শকাতর। ধর্ম, মসজিদ ও ইমামের ব্যাপার। আমাদের ভেবে-চিন্তে পা ফেলতে হবে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, আলী বিন সুফিয়ানকে নিয়ে নিজেই ছদ্মবেশে ইমামের দরুস শুনতে যাবেন। জিহাদের সঙ্গে যৌনতার আলোচনার অভিযোগ আইউবীকে বেশী ভাবিয়ে তুলে। আলী বিন সুফিয়ানের সঙ্গে পরামর্শ করেই তিনি একটি ছদ্মবেশ নির্ণয় করেন।
.
গোয়েন্দাবৃত্তি করা এবং গোয়েন্দাবৃত্তি প্রতিরোধে আলী বিন সুফিয়ান একজন ঝানু, লোক। যে খৃষ্টান মেয়েকে দিয়ে তিনি ফয়জুল ফাতেমীকে গ্রেফতার করিয়েছিলেন এবং আহমাদ কামাল নামক এক কমাণ্ডারের হাতে যে মেয়ে মুসলমান হয়ে তার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিল, সেই মেয়ে খৃষ্টান গোয়েন্দাদের সাংকেতিক ভাষা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছিল আলী বিন সুফিয়ানকে। তারই দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী আলী বেশ কজন মুসলমানকে গ্রেফতারও করেছিলেন, যারা অর্থ আর রূপসী নারীর বিনিময়ে ঈমান বিক্রি করে খৃষ্টানদের পক্ষে গোয়েন্দাবৃত্তিতে লিপ্ত ছিল। ধরা পড়ার পর চাপের মুখে তারাও স্বীকার করেছিল, হ্যাঁ খৃষ্টান গোয়েন্দাদের মধ্যে এসব ভাষা ও সংকেত ব্যবহৃত হয়।
খৃষ্টান গোয়েন্দারা অপরিচিত লোককে নিজের দলের লোক কিনা যাচাই করার জন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, জানি না, আজকের আবহাওয়া কেমন থাকবে। কথাটা সে এমন নির্লিপ্তের মত বলবে, যেন এমনিতেই হঠাৎ তার আবহাওয়ার কথা মনে পড়ে গেছে। এখন অপরজন যদি তাদের দলের লোক হয়, তাহলে বলে বৃষ্টি আসবে। তারপর প্রথমজন বলে, আকাশ তো বিলকুল পরিষ্কার। দ্বিতীয়জন বলে, আমরা মেঘ নিয়ে আসব। বলেই সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। অট্টহাসিতে ফেটে পড়ার তাৎপর্য হলো, যেন পাশের মানুষও শুনতে পায় কিংবা অপর ব্যক্তি গোয়েন্দা না হলে সে বুঝবে যে, এ লোকটি ঠাট্টা করছে।
আলী বিন সুফিয়ানকে এ তথ্যও প্রদান করা হয়েছিল যে, তাদের এই সাংকেতিক সংলাপ যদি কখনো শত্রুদের কাছে ফাঁস হয়ে যায়, তখন-ই কেবল তা পরিবর্তন করা হবে। অন্যথায় এ সংকেত-ই ব্যবহার করা হবে।
আলী বিন সুফিয়ান আরো জানতে পেয়েছিলেন যে, খৃষ্টান গোয়েন্দারা কখনো একে অপরের নাম বলে না। তাদের হেডকোয়ার্টার ফিলিস্তীনের প্রত্যন্ত এক পল্লীতে। নাম তার শোবক। এই শোবক-ই ক্রুসেডারদের চরবৃত্তির প্রাণকেন্দ্র।
এসব তথ্যের উপর ভিত্তি করে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী ও আলী বিন সুফিয়ান ছদ্মবেশে কায়রোর সেই মসজিদে গমন করেন। তারা জিহাদ বিষয়ক বয়ানের আবদার জানালে ইমাম তাদের আবদার পূরণ করেন। দরূস শেষে নির্জনে বসে সেই গোপন সাংকেতিক সংলাপের মাধ্যমে ইমামকে কুপোকাত করে ফেলেন তারা। পরে তিনি বলেও ছিলেন যে, আমি অত কাঁচা গোয়েন্দা ছিলাম না যে, অপরিচিত মানুষের সামনে মনের সব গোপন কথা প্রকাশ করব।
আইউবী ও আলী বিন সুফিয়ানের সাংকেতিক সংলাপ-ই তাকে ফাঁদে ফেলেছে। কারণ, সেই সংলাপ ছিল উচ্চ পর্যায়ের গোয়েন্দাদের জন্য নির্দিষ্ট। সাধারণ গোয়েন্দারা তা জানত না। তাছাড়া এই সাংকেতিক সংলাপের শেষে অট্টহাসিতে ফেটে পড়াও ছিল বিশেষ তাৎপর্যবহ। যথাসময়ে এই হাসির অভিনয় করতে না পারলে খৃষ্টান গোয়েন্দারা গোপনীয়তা ফাস করত না অন্যের কাছে। সেজন্যেই সালাহুদ্দীন আইউবী সংলাপ শেষে অট্টহাসির অভিনয় করেছিলেন। সঙ্গে তিনি ছয়জন জানবাজ সৈন্যও নিয়ে গিয়েছিলেন, যাতে সময়ে তারা সাহায্য করতে পারে।
