সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টি করতে হবে। সাধারণ মানুষ আর সেনা সদস্যদের এক করে তিনি বড় সাফল্য অর্জন করেছেন। এ মুহূর্তে যদি তিনি জেরুজালেম জয় করার ঘোষণা দেন, তাহলে মিসরের সব মানুষ তার পিছনে ঝাঁপিয়ে পড়বে। বলল সবুজ পট্টিওয়ালার সঙ্গী।
কিন্তু, এমন ঘোষণা তিনি দেবেন না। তিনি বুদ্ধিমান। আবেগপ্রবণ লোকদের তিনি পছন্দ করেন না। তিনি একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিককে আবেগপ্রবণ অপ্রশিক্ষিত একশত লোকের উপর প্রাধান্য দেন। আইউবী একজন বাস্তববাদী মানুষ। অন্তঃসারশূন্য সস্তা শ্লোগানে তিনি জাতিকে ক্ষেপান না।
আমাদের কাজ, বাস্তবতা ও প্রশিক্ষণ থেকে এ জাতিকে দূরে রাখা এবং আরো আবেগপ্রবণ করে তোলা। হুঁশ বলতে তাদের কিছুই থাকবে না- থাকবে শুধু জোশ। জোশের বশবর্তী হয়ে তারা ভুলে যাবে বাস্তবতা আর বিবেক-বুদ্ধির কথা। দুশমনের প্রথম আঘাতেই তারা দমে যাবে। শুনেছ তো, দসে আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর কেমন প্রশংসা করলাম? এটা আমার কূট-কৌশলের-ই অংশ।
এসব কথা আমরা পরে বলব। আগে আমাদেরকে উন্ত্রী দুটো দেখান এবং বলুন, এখানে কখন কিভাবে আমরা আশ্রয় পেতে পারি, এখানে আপনার অন্য কোন লোক থাকে কি?
না, এখানে আর কেউ থাকে না। বললেন ইমাম।
আগন্তুকদের ব্যাপারে ইমাম এখন সন্দেহমুক্ত। গোপন সাংকেতিক শব্দ দ্বারা তিনি তাদের চিনে ফেলেছেন।
.
ইমাম কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। খানিক পরে ফিরে আসেন। সঙ্গে তার চোখ– ঝলসানো দুটি অনুপম রূপসী যুবতী। এরা-ই সেই দু মেয়ে, যাদেরকে তিনি নিজের স্ত্রী বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। এনেছিলেন আপাদমস্তক কালো বোরকায় ঢেকে। কিন্তু এখন সেই পর্দা নেই। দেহের অর্ধেকটা-ই এখন তাদের অনাবৃত। ইমাম আগন্তুকদের সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং আলমারী থেকে মদের বোতল বের করে আনেন। এক মেয়ে গ্লাস এনে তাতে মদ ঢেলে মেহমানদের সামনে রাখে।
এসব পরে হবে, আগে কাজের কথা বলে নিই। বলল সবুজ পট্টিওয়ালা ব্যক্তি।
আমাদের দু ব্যক্তিকে হত্যা করতে হবে। সালাহুদ্দীন আইউবীকে আর আলী বিন সুফিয়ানকে। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা তাদেরকে চিনি না। আপনি দেখিয়ে দেবেন। আপনি কি ওদের দেখেছেন কখনো? বলল অপরজন।
দেখেছি মানে? এত দেখেছি যে, ঘোর অন্ধকারেও আমি তাদেরকে চিনতে পারব। আমি যে অভিযান শুরু করেছি, তার সাফল্যের জন্য ওদেরকে চিনে রাখা ছিল অপরিহার্য। আলী বিন সুফিয়ান এতই বিচক্ষণ, এত-ই অভিজ্ঞ যে, কোন গোয়েন্দা পাঠিয়ে তিনি নিজেই আমার এখানে চলে আসতে পারেন। তবে আমার সামনে। ছদ্মবেশে এলেও আমি তাকে চিনে ফেলব। বললেন ইমাম।
আর সালাহুদ্দীন আইউবীর ব্যাপারে আপনার ধারণা কী? পট্টিওয়ালা জিজ্ঞেস করে।
তাকেও বেশ ভাল চিনি। বললেন ইমাম।
চোখে সবুজ পট্টিওয়ালা ব্যক্তি তার হাত দুখানা নিজের কান আর মাথার মধ্যখানে নিয়ে আসে। দাড়ি ধরে ঝটকা টান মারে নীচের দিকে। লম্বা কৃত্রিম দাড়ি আর ঘন গোঁফ চেহারা থেকে আলগা হয়ে যায়। চোখের উপর রাখা সবুজ পট্টিও খুলে ছুঁড়ে ফেলে। ফুটে উঠে তার আসল রূপ।
ইমাম যেখানে বসা ছিলেন, সেখানেই মূর্তির মত বসে রইলেন। বিস্ফারিত অপলক নেত্রে মুখ হা করে তাকিয়ে রইলেন মুখোশহীন আগন্তুকের প্রতি। মেয়ে দুটো কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তারা একবার লোকটির প্রতি, একবার ইমামের প্রতি দৃষ্টিপাত করছে। রক্ত শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে ইমামের দেহ। এবার দুনিয়া জোড়া বিস্ময় ও ভয়জড়িত ইমামের কাঁপা কণ্ঠ : সালাহুদ্দীন আইউবী!
হ্যাঁ, দোস্ত! আমি সালাহুদ্দীন আইউবী। সুনাম শুনে আপনার দরূন্স শুনতে এসেছিলাম।
আইউবী এবার তার সঙ্গীর দাড়ি মুঠি করে ধরে ঝটকা এক টান দেন। চেহারা থেকে পৃথক হয়ে আসে দাড়ি। বললেন, একেও বোধ হয় চিনেন?
হ্যাঁ চিনি। আলী বিন সুফিয়ান। ভয়ার্ত কণ্ঠে জবাব দেন ইমাম।
হঠাৎ মেয়ে দুটো এবং ইমাম পিছনে দৌড়ে গিয়ে আলমারী খুলে হাতে তরবারী তুলে নেয়। কিন্তু পিছনে মোড় ঘুরিয়েই তারা থমকে যায়। উদ্যত তরবারীগুলো আপসে অধঃনমিত হয়ে যায় তাদের। কারণ, ইতিমধ্যে আইউবী আর আলী বিন সুফিয়ানের জুব্বার ভিতরে লুকানো তরবারীও তাদের হাতে এসে গেছে। অসি চালনায় প্রশিক্ষণ দেয়া হলেও দুই পেশাদার যোদ্ধার মোকাবেলায় দাঁড়াতে পারল না মেয়ে দুটো। ছিনিয়ে নেয়া হল তাদের হাতের অস্ত্র।
আলী বিন সুফিয়ান বাইরে ছুটে যান। খানিক পর বাইরে অপেক্ষমান অপর ছয় সঙ্গীও উদ্যত তরবারী হাতে ভিতরে প্রবেশ করেন।
পরদিন মসজিদের সামনে এলাকাবাসীদের প্রচন্ড ভীড় জমে যায়। কয়েকজন সরকারী কর্মকর্তা পালাক্রমে তাদের নিয়ে যাচ্ছে ইমামের গোপন কক্ষে। জনতাকে ইমামের ঘর দেখান হল, দেখান হলো দেয়ালে ঝুলান ঈসা ও মরিয়মের প্রতিকৃতি আর সারি সারি সাজানো মদের বোতল। কর্মকর্তাগণ জনতার সামনে তুলে ধরেন ছদ্মবেশী ইমামের আসল রূপ।
***
খৃষ্টানরা সারা দেশে, বিশেষ করে কায়রোতে বিপুলসংখ্যক গুপ্তচর ও সন্ত্রাসী ছড়িয়ে দিয়েছিল। তার মোকাবেলায় সালাহুদ্দীন আইউবীর দিক-নির্দেশনায় আলী বিন সুফিয়ান দেশময় গোয়েন্দার জাল বিছিয়ে দেন। খৃষ্টানদের ইসলামী সভ্যতা ধ্বংসের অভিযান-ই আইউবীকে বেশী অস্থির করে তোলে।
